ছবি: রয়্যালটি ফ্রি, গেটিইমেজ

অনেক আগে থেকেই আমরা শুনে আসছি যে চাঁদ থেকে খালি চোখে দেখা যায় চীনের মহাপ্রাচীর। চাঁদে মানুষ যাবার আগে থেকেই এটি জনপ্রিয় গুজব হিসাবে পাওয়া যায়। কিন্তু এটি আদৌ সত্য নয়।

মানুষ সর্বপ্রথম মহাশূন্যে যাবার বহু আগে থেকেই মহাশূন্য বা চাঁদ থেকে চীনের মহাপ্রাচীর খালি চোখে দেখা যাবে বলে একটি দাবি করা হতো। ১৯৬৯ সালে চাঁদে যাবার পর দাবিটি অবশেষে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হলেও এখনো অনেক জায়গায় টিকে রয়েছে দাবিটি। মাঝে মধ্যে একটু পরিবর্তন করে এটাও বলা হয় যে, মহাশূন্য থেকে মানুষের তৈরি কোনোকিছু দেখা গেলে সেটি হবে চীনের মহাপ্রাচীর।

টুইটার থেকে

প্রথমত, মহাশূন্য থেকে চীনের প্রাচীর দেখার দাবিতে স্পেস বা মহাশূন্য বলতে আসলে কতটা উচ্চতা থেকে পৃথিবীকে দেখার কথা বলা হয়েছে সেটি মোটেও স্পষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের কক্ষপথ পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০৮ কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন নিজের কক্ষপথে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে থাকা অবস্থায় যে সকল ছবি তুলেছে তাতে দেখা যায় মানুষের তৈরি বিভিন্ন মহাসড়ক, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য বিভিন্ন বড় আকৃতির নির্মাণ। স্পেস স্টেশনে কাজ করতে যাওয়া নাসার বিজ্ঞানীরাও বলেছেন তেমনটাই।

জনপ্রিয় ওয়েবসাইট স্নুপসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাসার মহাকাশ বিজ্ঞানী জে অ্যাপট বলেন, “আমরা মহাশূন্য থেকে চিনের মহাপ্রাচীর দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঐ উচ্চতা থেকে বিমানবন্দরের রানওয়ের মতন বেশ কিছু নির্মাণ দেখা সম্ভব হলেও চীনের মহাপ্রাচীর দেখতে আমাদের বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে।” মানুষের তৈরি বিশাল আকৃতির এই দেয়ালটি ঠিকভাবে দেখতে না পাবার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “আশেপাশের মাটি আর দেয়ালে ব্যবহৃত উপাদানের রং প্রায় একই রকমের হওয়ায় মাত্র ১৮০ মাইল উচ্চতা থেকেও চীনের মহাপ্রাচীরকে খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না বলা চলে।” মাত্র ২৮৯ কিলোমিটার দূর থেকেই যে জিনিসটি ঠিক ভাবে দেখা যায় না সেটিকে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরত্বে থাকা চাঁদ থেকে দেখা যাবে, এমনটা ভাবাও যায় না।

স্নুপসকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে মহাকাশচারী অ্যালান বিন বলেন, “চাঁদ থেকে পৃথিবীকে একটি সুন্দর গোলক হিসেবে দেখা যায়। সেই গোলকের বেশিরভাগই সাদা। কিছু স্থানে সমুদ্রের নীল, কিছু স্থানে মরুভূমির হলদে আবছায়া আর গাছপালার সবুজ রংয়ের দেখা মেলে। চাঁদ থেকেতো দূরের কথা, পৃথিবীর বায়ূমণ্ডল ত্যাগ করে কয়েক হাজার মাইল দূরত্বে যাবার পরপরই মানুষের নির্মিত কোনোকিছুই আর দেখা যায় না।”

ফেসবুকে ভাইরাল পোস্ট

পৃথিবীকে কেন্দ্র করে অবিরত ঘুরে চলা স্যাটেলাইটগুলি থেকে তোলা কোনো সাধারণ ছবিতেও দেখা পাওয়া যায় না চীনের মহাপ্রাচীরের। তবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তোলা বিভিন্ন রাডার ছবিতে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। খালি চোখে মহাপ্রাচীর দেখার দাবিটি টেকে না এখানেও।

খালি চোখে মহাশূন্য থেকে চীনের মহাপ্রাচীর দেখতে পারার দাবিটি প্রথমবার কোথায় করা হয়েছে সেটি বের করা বেশ মুশকিল। তবে ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত রিচার্ড হ্যালিবার্টন নামক একজন আমেরিকান লেখকের “সেকেন্ড বুক অফ মারভেলস, দ্য অরিয়েন্ট” বইতে বলা হয়েছিলো যে, “মহাকাশবিজ্ঞানীরা বলেছেন চীনের মহাপ্রাচীর মানুষের নির্মিত একমাত্র বস্তু যেটিকে চাঁদ থেকে খালি চোখে দেখা যাবে।”। এ বইতে এ রকম একটি দাবি যে পুরোপুরি যাচাই-বাছাই ছাড়াই করা হয়েছিলো সেটি সহজেই বোঝা যায়। কারণ তখন এ রকম বিবৃতির সত্যতা যাচাইয়ের মতন কোনো প্রযুক্তি ছিলো না। অতো আগে পৃথিবীর ছবি তোলার উপযোগী কোনো মহাকাশযান ওড়ানো হয়নি আকাশে।

পৃথিবীর ছবি তোলার ব্যাপারটি এখন বেশ জনপ্রিয় হলেও দীর্ঘ সময় ধরে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ভূ-পৃষ্ঠের ৬৫ মাইল উচ্চতা থেকে প্রথমবার পৃথিবীর সাদাকালো ছবি তোলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই। ১৯৪৬ সালের ২৪ অক্টোবর ছবিটি তোলেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের একটি দল।

উচ্চতার দিক থেকে বিবেচনা করলে প্রথমবার মহাশূন্য থেকে ছবি তোলা হয় ১৯৬২ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশবিজ্ঞানী ওয়ালি স্কিরা মার্কারি এটলাস মিশনে যাবার সময় সাথে করে একটি হ্যাসেলব্লাড ক্যামেরা নিয়ে যান। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরার সময় পৃথিবীর বেশ কিছু ছবি তোলেন তিনি। তবে চীনের মহাপ্রাচীর সংক্রান্ত কোনো বিতর্কের উত্তর দিতে পারেনি এসব ছবি।

  • Read in English

Total
19
Shares

Leave a Reply

fact-watch