গত কয়েকবছর ধরে অনলাইনে ক্যান্সারের চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু খবর ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রত্যেকটা খবরে একটা নামে চোখ পরে। সেটি হলো কিউবা। ধারণা করা হচ্ছে, ক্যান্সারের জটিল ধাঁধার সমাধান অবশেষে করতে সক্ষম হয়েছে কিউবা।

ক্যান্সার হলে বেঁচে ফেরা সম্ভব নয়, এমনটাই ছিলো মানুষের ধারণা। তবে কিউবায় ক্যান্সারের চিকিৎসা আবিষ্কৃত হবার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে এই ধারণায়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকা রোগীরা দেখছেন বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন। বিবিসি নিউজের একটি প্রতিবেদনে বলা হয় এমনই একজন নারীর গল্প।

রোগীরা যে শুধু চিকিৎসার জন্যে কিউবায় যাচ্ছেন তাই নয়, অনেকে সুস্থ হয়ে ফিরেও আসছেন। এমনই একজন পেগি হাউই। স্তন ক্যান্সারকে ঠিকই হারিয়ে দিতে পেরেছিলেন পেগি হাউই, কিন্তু তার ভাইদেরকে হারিয়েছেন ব্রেন টিউমার ও কোলনের ক্যান্সারে। নিজের ক্যান্সারের ব্যাপারে যেদিন সে জানলেন, সেদিনই মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, ক্যান্সারের কাছে কিছুতেই হার মানবেন না।

শুরুতে একটি মাসটেক্টোমি (mastectomy) এবং তারপর কেমোথেরাপি (chemotherapy) নিতে হয় পেগিকে। ক্যান্সারের প্রচলিত চিকিৎসা বলে পরিচিত দুটোই। মাসটেক্টোমিতে আক্রান্ত স্তন ফেলে দিতে হয় আর কেমোথেরাপিকে কোষ বিভাজন আটকাতে ওষুধ নিতে হয়, যার ফলাফলস্বরূপ একটা পর্যায়ে শরীরে ক্যান্সারের কোষগুলি ধ্বংস হয়ে যায়।

মাসটেক্টোমির পর কেমোথেরাপির দরকার না থাকা সত্ত্বেও পেগি কেমোথেরাপি করায়। কিন্তু ক্যান্সার কোষ ধ্বংস হবার বদলে উল্টো তার হাতেও ছড়িয়ে পড়ে। হাতের ছোট ক্যান্সারের অংশটাকে অপারেশন করে অপসারণ করা হয়। হাল ছাড়তে নারাজ পেগি রেডিয়েশন থেরাপি নিতে শুরু করে। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয় না। বরং এবার হাত থেকে লিভার এবং ফুসফুসে ছড়িয়ে পরে। চিকিৎসকরা যখন তার আয়ূষ্কাল মাত্র ২ মাস বলে জানান তখন নিজের শেষকৃত্য নিয়ে চিন্তা করা ছাড়া আর কিছু করার বাকি ছিলো না তার। পেগি এটা দেখেই অবাক হচ্ছিলেন যে এতো এতো ওষুধ ক্যান্সার কমানো তো দূরের কথা, বরং বাড়িয়েই চলছিলো। এমন সময়েই স্টেজ ফোর ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি খোঁজ পান ক্যান্সারের একটি বিকল্প চিকিৎসা সম্পর্কে, বিশেষ এক জাতের বিচ্ছুর বিষ দিয়ে চলে এই চিকিৎসা!

ক্যান্সারের চিকিৎসা নিয়ে পেগি হাউই-র বক্তব্য:

বিশেষ জাতের এই বিচ্ছুর বৈজ্ঞানিক নাম রোফালারাস জানসিয়াস (Rhopalurus junceus)। এটির দেখা মেলে কিউবা, হাইতি এবং ভেনিজুয়েলায়। আরেক নাম ব্লু স্করপিয়ন বা নীল বিচ্ছু। কিউবায় ক্যান্সারের চিকিৎসায় এই বিচ্ছুর বিষ ব্যবহারের চিকিৎসাটি প্রথম ১৯৮০ সালে কিউবার একজন জীববিজ্ঞানী মিশেল বর্ডিয়ার চিভাস আবিষ্কার করেন। বিচ্ছুর বিষ ব্যবহার করে তিনি ইঁদুর এবং কুকুরের শরীরে টিউমারের আকার ছোটো করতে সক্ষম হন। তারপর ১৯৯২/৯৩ সালে বর্ডিয়ার ১৫ বছর বয়সী নিউর্স মঞ্জনের চিকিৎসা করে তাকে সুস্থ করতে সক্ষম হন। অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে ভোগা নিউর্স পেগির মতই একাধিক কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি এবং সার্জারির মধ্য দিয়ে যান। ডাক্তাররা নিউর্সের বাঁচার আশা ছেড়ে দিলে তার বাবা শেষ চেষ্টা হিসেবে বর্ডিয়ার স্মরণাপন্ন হন। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে মঞ্জন একটি বিচ্ছুর ফার্ম দেয়।

কিউবার সরকারী একটি ফার্মাসিউটিক্যাল লেবিওফাম ব্লু স্করপিয়নের বিষকে মানুষের জন্যে পুরোপুরি নিরাপদ বলে চিহ্নিত করেছে। এই বিচ্ছুর বিষ ব্যবহার করে ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি শুরু করেছে তারা। তবে চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে তারা এই বিষের একটি হোমিওপ্যাথি সংস্করণও তৈরি করেছে। “ভিডাটক্স” নামক এই ওষুধের মূল্য কিউবানদের জন্যে চার সেন্ট এবং বিদেশীদের জন্যে ২২০ ডলার। গবেষকদের দাবি, ভিডাটক্স স্তন, লিভার, প্লীহা, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, জরায়ূ, প্রোস্টেট ও অন্যান্য সকল ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের আয়ূষ্কাল বাড়াতে ভূমিকা রাখে। ইউরোপ, আমেরিকা এবং কিউবার অসংখ্য রোগীর চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোনোপ্রকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ভিডাটক্স এখনো কিউবার রেগুলেটরি ব্যুরো ফর হেলথ প্রোটেকশন দ্বারা স্বীকৃতি পায়নি। তবে লেবিওফামের দাবি, ওষুধটি ইতোমধ্যে ১০০০ জনের বেশি রোগীকে সুস্থ করেছে। যদিও তাদের কোনোপ্রকার বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন প্রদান করেনি প্রতিষ্ঠানটি। লেবিওফামে বিচ্ছুর বিষ নিয়ে গবেষণা করেন ডক্টর অ্যালেক্সিস ডিয়াজ। তিনি মনে করেন রোগীরা একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে বিচ্ছুর বিষ ব্যবহার করে। ততদিনে ক্যান্সার তাদের শরীরে পুরোপুরি ছড়িয়ে যায় বিধায় সঠিক কোনো প্রকার বৈজ্ঞানিক ফলাফল তৈরি করা জটিল হয়ে যায়।

বিচ্ছুর বিষ দিয়ে তৈরি এস্কোজিন, এস্কোজুল এবং ভিডাটক্স নামক ওষুধগুলো কিউবায় তৈরি হয় এবং কিউবা ছাড়া অন্য কোনো দেশের স্বীকৃতি পায়নি এগুলি। তবে সিমাভ্যাক্স-ইজিএফ নামক কিউবায় তৈরি আরেকটি ওষুধ ব্যবহৃত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কলম্বিয়া, প্যারাগুয়ে এবং পেরুতে ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে সিমাভ্যাক্স। তবে এটির উপাদানে বিচ্ছুর বিষ আছে কিনা সে বিষয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বসওয়েল পার্ক ক্যান্সার ইন্সটিটিউট ২০১৬ সালের শেষের দিকে সিমাভ্যাক্সের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করে।

রসওয়েল পার্ক ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের দাবি, সিমাভ্যাক্স আসলে ক্যান্সারের টীকা। তবে প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি টীকা নয়। সিমাভ্যাক্স-ইজিএফ রোগীর দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্যান্সার কোষ ধ্বংসে বাড়তি শক্তি যোগায়, যাতে করে ক্যান্সারের কোষগুলি পরবর্তীতে আর বৃদ্ধি না পায়।

ক্যান্সারের চিকিৎসায় পেগি হাউই যে ওষুধটি নিয়েছিলেন তার নাম এস্কোজিন (Escozine)। এস্কোজিনের বিজ্ঞাপনে বলা হয় যে এটি কেমোথেরাপির বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (যেমন: চুল পড়া, ক্লান্তি, সহজেই শরীর কেটে যাওয়া বা রক্ত পড়া, ইনফেকশন, অ্যানেমিয়া, বমি, ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য) থেকে মুক্তি দেয়।

এস্কোজেনের মতন এস্কোজুল (Escozul) ভিডাটক্সের মতন কিউবায় তৈরি আরেকটি ক্যান্সার নিরাময়ের ওষুধ।

তাদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এস্কোজুল গ্রহণ করা বেশ কিছু রোগী ক্যান্সার থেকে নিরাময় পেয়েছেন, অন্যান্য রোগীদের ক্ষেত্রে তাদের আয়ূষ্কাল বেড়েছে। এটি একটি ইম্যুইনোমড্যুলেটর। শরীরের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে সক্ষম বিভিন্ন উপাদানকে ইম্যুইনোমড্যুলেটর বলা হয়। এস্কোজুল শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও ভালো করতে সক্ষম। বর্ডিয়ার মনে করেন, এইডসের চিকিৎসাতেও ব্যবহার করা সম্ভব এস্কোজুল। তিনি আরও দাবি করেন, ইতোমধ্যে দশজন এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সফল চিকিৎসা করেছেন তিনি। এস্কোজুলের তিনমাসের ডোজের পেছনে খরচ হতে পারে ১০০০ ডলার পর্যন্ত।

কিউবায় আবিষ্কার হওয়া বিচ্ছুর বিষ ক্যান্সারের নিরাময়ে কতটা ভূমিকা রাখবে সেটা বলা একটু কঠিন। ফ্যাক্ট-চেক নির্ভর জনপ্রিয় ওয়েবসাইট স্নুপস এক প্রতিবেদনে “মিশ্র” রেটিং প্রদান করেছে সংবাদটিকে। ক্যান্সারের চিকিৎসা প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রেই ভিন্ন ভিন্ন হয়। তবে সকল তথ্য প্রমাণ বিশ্লেষণের পর এটা বলাই যায় যে পুরোপুরি ক্যান্সারের নিরাময় হোক বা না হোক ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের আয়ূষ্কাল বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে সক্ষম কিউবার ক্যান্সার চিকিৎসা পদ্ধতি।

  • Read in English

Total
9
Shares

Leave a Reply

fact-watch