মাছ, বিশেষ করে গোল্ডফিশের স্মৃতিশক্তি নিয়ে মানুষের আগ্রহের যেন শেষ নেই। কেউ কেউ মনে করে, গোল্ডফিশ তিন সেকেন্ড পর সব কিছু ভুলে যায়। আবার অনেকের মতে, সেকেন্ডের পরিমাণটা একটু বেশি। কেবল গোল্ডফিশ নয়, জনপ্রিয় ধারনা হলো, স্মৃতিশক্তির দিক দিয়ে সব মাছই বেশ দূর্বল।

বিভিন্ন মাছ, বিশেষ করে গোল্ডফিশের স্মৃতিশক্তি খারাপ বলে একটা ধারণা কম-বেশি সবার মধ্যেই আছে। অল্পতেই সব ভুলে যায় এমন মানুষজনকে আমরা প্রায়ই গোল্ডফিশের সাথে তুলনা করে বসি।

গোল্ডফিশসহ বিভিন্ন মাছের স্মৃতিশক্তি নিয়ে এমন অদ্ভুত ধারণার শুরুটা কোথায় হয়েছে, সেটা জানা না গেলেও মানুষের ভেতরে এই ধারণাটি যে আছে সেটি বোঝা যায় ফেসবুক, টুইটারের বিভিন্ন পোস্ট দেখলেই। বিভিন্ন পোস্টে ভিন্ন ভিন্ন সময়কালের কথা বলা হলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারণাটি হলো, তিন সেকেন্ড পরে আগের সব ঘটনা ভুলে যায় গোল্ডফিশ। কিন্তু আসলেই কি তাই?

গোল্ডফিশের এই স্মৃতিভ্রমের ব্যাপারটিকে নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। স্কুলপড়ুয়া বাচ্চারা ঘরে বা তাদের ক্লাস প্রোজেক্ট হিসেবে যেমন গোল্ডফিশ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে তেমনি বড় বড় বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন মাছের স্মৃতিশক্তি নিয়ে।

ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে উঠে আসা প্রথম পরীক্ষাটি চালিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডেলেইডে শহরের ১৫ বছর বয়সী এক স্কুল ছাত্র। খুব সহজ এই পরীক্ষাটি সে চালায় একটি অ্যাকুরিয়ামে রাখা কিছু গোল্ডফিশ নিয়ে। প্রতিদিন সে একটি লাল রংয়ের লেগো সেট সেই অ্যাকুরিয়ামে ফেলে এবং সেটির আশেপাশে গোল্ডফিশগুলিকে খেতে দেয়। প্রথম প্রথম লেগো সেট দেখে মাছগুলো ভয় পেয়ে গেলেও, একটা পর্যায়ে তাদের ভয় কেটে যায় এবং তারা লেগো সেট পানিতে ফেলামাত্রই খাবার দেওয়া হচ্ছে বুঝতে পেরে খাবার খেতে চলে আসে।

পরীক্ষার পরের ধাপে এসে এক সপ্তাহের জন্যে লেগো সেট অ্যাকুরিয়ামে ফেলা মুলতবি রাখা হয়। এক সপ্তাহ পর যখন আবারও সেটিকে পানিতে দেওয়া হয় তখন সাথে সাথে মাছগুলি আবার সেখানে ছুটে আসে। সহজ এই পরীক্ষা থেকে বোঝা যায় যে, গোল্ডফিশের স্মৃতিশক্তি যে কেবলমাত্র তিন সেকেন্ডের চেয়ে অনেক বেশি তাই নয়, তারা আগে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাগুলিকে স্পষ্টভাবে মনে রেখে সেই অনুযায়ী কাজও করতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ম্যাকোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ ফেলো হিসেবে থাকা কুলাম ব্রাউন জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে বলেন, মাছ নিয়ে তার আরেকটি গবেষণার ব্যাপারে। এই গবেষণায় তিনি কয়েকটি মাছকে জাল ছিড়ে বের হয়ে যাওয়া শেখান। জালের এক প্রান্তে একটা গর্ত করা ছিলো। পাঁচ বারের চেষ্টায় তিনি মাছগুলিকে শেখাতে পারেন যে জালের গর্তটি কোথায়। এক বছর পর মাছগুলিকে সেই একই জাল দিয়ে ধরার চেষ্টা করে তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করেন যে, মাছগুলি জালের গর্তটি কোথায় তা এক বছর পরে মনে রেখেছে এবং জাল থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে উঠে আসা তৃতীয় গবেষণাটি করেছে ইসরাইলের হাইফায় অবস্থিত টেকনিওন ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির একদল গবেষক। অল্পবয়সী কয়েকটি মাছকে তারা অ্যাকুরিয়ামে আটকে রেখে একটি প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণে তাদেরকে খাবার দেবার আগে প্রতিবার একটি নির্দিষ্ট শব্দ করা হয়। প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হবার পর মাছগুলিকে জলাশয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পাঁচ মাস পর মাছগুলি বড় হয়ে গেলে বিজ্ঞানীরা সেই জলাশয়ের এক পাশে একই শব্দের পুনরাবৃত্তি ঘটানো মাত্রই মাছগুলি সব সেদিকে চলে আসে। এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করে মাছ খাওয়ার উপযুক্ত হবার পর তাদেরকে বড় জলাশয়েও ধরা সহজ হবে বলে মনে করছেন ইসরাইলের এই বিজ্ঞানীরা।

বিভিন্ন গবেষণায় গোল্ডফিশসহ অন্যান্য সকল মাছের স্মৃতিশক্তি যে তিন সেকেন্ডের চেয়ে অনেক বেশি সেটা স্পষ্ট। তবে, কোন মাছের স্মৃতিশক্তি আসলে কতটুকুন সেটা বিজ্ঞানীরা এখনো বের করতে পারেননি। উপরের গবেষণা থেকে ইসরাইলের বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মাছ কমপক্ষে পাঁচ মাস পর্যন্ত সবকিছু মনে রাখতে পারে। আবার অস্ট্রেলিয়ার কুলাম ব্রাউনের গবেষণায় থাকা মাছগুলি এক বছর পরেও জাল থেকে পালানোর পথ কোনদিকে সেটা মনে রাখতে পেরেছিলো।

  • Read in English

Total
8
Shares

Leave a Reply

fact-watch