আগস্ট ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে দাবি করেন যে, জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগল তাকে নিয়ে করা যেকোন অনুসন্ধানের ফলাফলে ইতিবাচক খবরের লিংক বাদ দিয়ে কেবলমাত্র নেতিবাচক খবর দেখাচ্ছে। 

প্রেসিডেন্ট জনাব ট্রাম্প আরও দাবি করেন, গুগলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম লিখে অনুসন্ধান চালালে ফক্স নিউজের সংবাদকে আগে না দেখিয়ে তার মতে ‘ভুয়া’  সিএনএনের সংবাদগুলিকে আগে দেখানো হয়।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দাবি কতটা সত্য?

ট্রাম্পের টুইটের জবাবে গুগল একটি ইমেইলে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে,

“সার্চের ব্যাপারটিকে কখনোই রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের পন্থা হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। আমরা আমাদের অনুসন্ধানের ফলাফল কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ মোতাবেক সাজাই না।
“প্রতি বছর আমরা আমাদের অ্যালগরিদমে শত শত পরিবর্তন আনি যাতে ব্যবহারকারীরা অনুসন্ধানের ফলাফলে ভালো মানের কন্টেন্ট পায়।”
“আমরা গুগল সার্চকে আরও উন্নত করতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। আমরা কখনোই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে অনুসন্ধানের ফলাফলকে বদলাই না।” – গুগলের মুখপাত্র

গুগল সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন দাবির সত্যতা যাচাইয়ে আমরা “trump news” লিখে গুগলের পাশাপাশি জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন বিং এবং ডাকডাকগো-তে অনুসন্ধান চালাই। গুগল এবং বিং বিশ্বজুড়ে সমান জনপ্রিয়, তবে ব্যবহারকারীর অবস্থান অনুযায়ী তারা ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল প্রদর্শন করে। অন্যদিকে ডাকডাকগো ব্যবহারকারী বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, সবাইকে একই ফলাফল দেখায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প গুগলের বিপরীতে নেতিবাচক সংবাদ “প্রোমোট” করার অভিযোগ আনায় আমরা কেবলমাত্র অনুসন্ধানের ফলাফলে সবচেয়ে উপরে থাকা সংবাদগুলিকে নিয়েই কাজ করেছি।
গুগল সার্চে “trump news” লিখে অনুসন্ধান চালালে শুরুতেই আসে দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং হাফপোস্টের সংবাদ।

বিং-এর ক্ষেত্রে, সবচেয়ে উপরে থাকা সংবাদমাধ্যমগুলি হলো ফক্স নিউজ, এমএসএন, হাউস্টোন ক্রোনিক্যাল এবং সিয়াটলপিআই।

অন্যদিকে, ডাকডাকগো-তে অনুসন্ধানের ফলাফলের একেবারে উপরে থাকা সংবাদমাধ্যমগুলি হলো ফক্স নিউজ, ফক্স ১৩ মেমফিস এবং সিবিএস নিউজ।

একই জিনিস লিখে অনুসন্ধান চালানো হলেও ভিন্ন ভিন্ন ফলাফলের কারণ কী?

অনুসন্ধানের ফলাফলে ভিন্নতার পেছনে দায়ী করা যায় সার্চ ইঞ্জিনগুলিতে ব্যবহৃত ভিন্ন ভিন্ন অ্যালগোরিদমকে। একেবারে উপরে থাকা ফলাফলগুলিকে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গুগল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একেবারে নতুন এবং ভিন্নধর্মী সংবাদগুলিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। পাশাপাশি অনুসন্ধানের উপরে থাকা ফলাফলগুলিকে বাছাইয়ে সংবাদের উৎসের বিশ্বস্ততা এবং মানের দিকে নজর দেয়।

অন্যদিকে, বিং অনুসন্ধানের ফলাফলে কোনোপ্রকার সংবাদ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে একটি নিউজ গাইডলাইন অনুসরণ করে। যেটিকে তৈরি করা হয় সংবাদের মান, নতুনত্ব, উৎস এবং সেটি কতটা পাঠযোগ্য তার উপর নির্ভর করে। পাশাপাশি বিং একইসাথে বিভিন্ন রকমের ফলাফল প্রদর্শন করার চেষ্টা করে, যাতে ব্যবহারকারীরা সেসব পড়তে আগ্রহী হয়।

ডাকডাকগো ঠিক কীভাবে কাজ করে সেটি স্পষ্ট না হলেও ধারণা করা হয় এটি গুগল এবং বিং-এর ডেটা একত্রে মিলিয়ে পুরো বিশ্বজুড়ে যেকোনো অনুসন্ধানের জন্যে একইরকমের ফলাফল প্রদর্শন করে।

গুগল অনুসন্ধানে ফক্স নিউজের সংবাদ কেন আসে না?

অ্যালেক্সার ওয়েব র‍্যাংকিংয়ের সংবাদ ক্যাটাগরিতে ফক্স নিউজের অবস্থান সাত নম্বরে। সিএনএন রয়েছে তিন নম্বরে। সিএনএনের ঠিক পরেই চার ও পাঁচ নম্বরে রয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং দ্যা গার্ডিয়ান। জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে গুগল সার্চের ফলাফলে ফক্স নিউজের আগে অপেক্ষাকৃত বেশি জনপ্রিয় এসব সংবাদমাধ্যমের সংবাদগুলি থাকাটাই স্বাভাবিক।

গুগল, সিএনএন এবং ট্রাম্প

সিএনএনের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক বরাবরই খারাপ। ২০১৭ সালের ২রা জুন, ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে একটি ভিডিও আপলোড করেন যেখানে তিনি ডব্লিউডব্লিউই-তে একজনকে আঘাত করছিলেন। যাতে আঘাত করছিলেন তার মাথার জায়গায় এডিট করে সিএনএনের লোগো বসিয়ে দেওয়া হয়। ভিডিওর সাথে তিনি হ্যাশট্যাগ লেখেন #FraudCNNNews। ট্রাম্পের টুইটের বিপরীতে সিএনএন জবাব দেয় এটা লিখে যে, “সিএনএন মিথ্যা বলে না। তবে ক্ষমতায় থাকা মানুষজন মিথ্যা বললে সিএনএন সেটা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে।”

তবে এবারই প্রথমবার ট্রাম্প গুগলের সমালোচনা করলো। অনুসন্ধানের ফলাফল পরিবর্তনের পাশাপাশি ট্রাম্প গুগলের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করেছেন যে গুগল তাদের হোমপেইজে ট্রাম্পের উদ্বোধনী বক্তৃতা দেখায়নি। তিনি দাবি করেন যে, ওবামার উদ্বোধনী বক্তৃতা গুগল তাদের হোমপেইজে দেখিয়েছে। ট্রাম্পের এই দাবির জবাবে গুগল জানায় যে, ২০০৯ সালে বারাক ওবামার উদ্বোধনী বক্তৃতাও গুগল তাদের হোমপেইজে দেখায়নি।

সবশেষে এটাই বলা যায় যে গুগলের অ্যালগোরিদম অনুযায়ী অনুসন্ধানের সাথে সংবাদের সম্পৃক্ততা এবং উৎসের বিশ্বস্ততার উপর ভিত্তি করে তারা প্রথম দিকের ফলাফলগুলি প্রদর্শন করে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীর অবস্থান এবং ওয়েব ট্রাফিক বা জনপ্রিয়তাকেও গুগল আমলে নেয়। অন্যদিকে বিং একই রকমের একটি গাইডলাইন অনুসরণ করলেও তারা চেষ্টা করে একটু ভিন্নধর্মী একটি ফলাফল প্রদর্শনের। ফলে সেখানে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক সকল ধরনের সংবাদ আসে। অন্যদিকে, জনপ্রিয়তার দিক থেকে ফক্স নিউজের র‍্যাংকিং সিএনএন বা নিউ ইয়র্ক টাইমসের চেয়ে নিচে হওয়ায় গুগল শুরুতেই র‍্যাংকিংয়ের উপর থাকা ওয়েবসাইটগুলিকে দেখায়।

সিএনএনের সাথে বিরূপ সম্পর্ক থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প গুগল অনুসন্ধানের শুরুতে সিএনএনের সংবাদ দেখে কেন চটেছেন, সেটি বেশ স্পষ্ট। তবে তার মানে এই না যে, গুগল তাদের অনুসন্ধানের ফলাফল আসলেই পরিবর্তিত করে প্রদর্শন করছে। গুগলের অনুসন্ধান কীভাবে কাজ করে সেটি বিশ্লেষণের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির কোনো সত্যতা খুঁজে পায়নি ফ্যাক্ট-ওয়াচ।

 

  • Read in English

Total
11
Shares

Leave a Reply

fact-watch