পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের বিশাল অঞ্চলজুড়ে বন্যা শুরু হয়েছে। দেশটির শতদ্রু, রাভি ও চেনাব নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সৃষ্ট এ বন্যায় প্রাণহানিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির কর্তৃপক্ষ পানির চাপ কমাতে চেনাব নদীর কাদিরাবাদ বাঁধের তীররক্ষা অংশে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই বিস্ফোরণের ঘটনা প্রচার করতে গিয়ে একটি ছবি প্রচার করা হচ্ছে। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি। কোনো ধরণের ডিসক্লেইমার ছাড়াই ছবিটি শেয়ার করা হচ্ছে।
পাকিস্তানে বাঁধে বিস্ফোরণ ঘটানোর ঘটনায় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ছবিটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাঁধে বিস্ফোরণের সময় ঠিক পাশেই বাঁধের ওপর মানুষ স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে। বিস্ফোরণে দেখা যাচ্ছে, বাঁধের বড় বড় পাথর সদৃশ বস্তু ওপরে উড়ছে, এমন পরিস্থিতিতে বাঁধের ওপর মানুষের এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা অস্বাভাবিক। এমন অস্বাভাবিকতা সাধারণত এআই জেনারেটেড কনটেন্টে দেখা যায়।
পাকিস্তানে বাঁধ বিস্ফোরণের ঘটনায় সংবাদমাধ্যমে এআই ছবি প্রচার
পরবর্তীতে ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিকস টাইমসে পাওয়া যায়। পাকিস্তানে বাঁধে বিস্ফোরণ ঘটানোর ঘটনা নিয়ে গতকাল বুধবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে ছবিটির ক্যাপশনে লেখা এটি এআই জেনারেটেড বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি।
এই সূত্রে ছবিটি এআই ছবি সনাক্তকারী একাধিক টুলের সাহায্যে যাচাই করে দেখা হয়। এসব বিশ্লেষণে প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি বলে প্রতীয়মান হয়।
পাকিস্তানে বাঁধ বিস্ফোরণের ঘটনায় সংবাদমাধ্যমে এআই ছবি প্রচার
উল্লেখ্য, পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক একাধিক সংবাদমাধ্যমে কাদিরাবাদ বাঁধের তীররক্ষা অংশে বিস্ফোরণের ফুটেজ ও ছবি পাওয়া যায়। এমন কিছু প্রতিবেদন দেখুন এখানে, এখানে।
পাঞ্জাবের আঞ্চলিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও এ বিস্ফোরণের একটি ফুটেজ তাদের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে টুইট করেছে। যার সঙ্গে আলোচিত ছবিটির মিল পাওয়া যায়নি।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে এটি নিশ্চিত হওয়া যায়, পাকিস্তানে বাঁধে বিস্ফোরণ ঘটানোর ঘটনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ছবিটি এআই জেনারেটেড। তাই ফ্যাক্টওয়াচ ছবিটিকে বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করছে।
প্রসঙ্গত, বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও দেশে সংবাদমাধ্যমে এআই জেনারেটেড ছবি ব্যবহারের নীতিমালা রয়েছে। বার্তা সংস্থা এপি তাদের নীতিমালায় লিখেছে, ‘যদি কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত ছবি, চিত্র বা শিল্পকর্ম কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের বিষয় হয়, তবে সেটি ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে শর্ত হলো, ক্যাপশনে তা স্পষ্টভাবে এআই দিয়ে তৈরি বলে উল্লেখ থাকতে হবে।’
এপি আরও লিখেছে, জেনারেটিভ এআই মানুষের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোকে আরও সহজ করে তুলছে। এর মধ্যে এমন কনটেন্টও থাকতে পারে, যা দেখতে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। যেন ভুলবশত এ ধরনের কনটেন্ট ব্যবহার না হয়, সেজন্য সাংবাদিকদের স্বাভাবিকভাবেই যেমন সতর্কতা ও সন্দেহপ্রবণতা অবলম্বন করা উচিত, তেমনি অবলম্বন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে মূল কনটেন্টের উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা করা, ছবির উৎস যাচাই করতে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা, এবং বিশ্বস্ত গণমাধ্যম থেকে একই ধরনের তথ্যের প্রতিবেদন আছে কিনা তা পরীক্ষা করা।
বিবিসি নিউজ এআই নিয়ে তাদের নীতিমালায় লিখেছে, বিবিসি যখনই কনটেন্ট তৈরি, উপস্থাপন বা বিতরণের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করবে, তা অবশ্যই স্বচ্ছ ও দর্শকের কাছে স্পষ্ট হতে হবে। প্রেক্ষাপট অনুযায়ী দর্শকদের এ বিষয়ে জানাতে হবে, এবং শুধু যে এআই ব্যবহার করা হয়েছে তা-ই নয়, বরং কীভাবে এবং কেন এটি ব্যবহার করা হয়েছে প্রয়োজনে সেটিও ব্যাখ্যা করতে হতে পারে।
সংবাদমাধ্যমে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে ইউক্রেনের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, কালচার অ্যান্ড ইনফরমেশন পলিসি মন্ত্রণালয় ও ন্যাশনাল টেলিভিশন ও রেডিও ব্রডকাস্টিং কাউন্সিল প্রণীত নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি কোনো কনটেন্ট—যেমন ছবি, চিত্র, লেখা বা অন্য কোনো শিল্পকর্ম—প্রকাশের ক্ষেত্রে সেটিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। সংবাদমাধ্যম বিভিন্ন উপায়ে স্বচ্ছভাবে দর্শকদের জানাতে পারে যে, কনটেন্টটি এআই দ্বারা তৈরি: ওয়াটারমার্ক, লেবেল বা অন্যান্য চিহ্ন ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্ট স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যেতে পারে।’
উদাহরণস্বরূপ, এআই দ্বারা তৈরি ছবি বা শিল্পকর্ম সম্পর্কিত প্রতিবেদনে বা এআই-নির্মিত উপকরণে ক্যাপশনে “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি উপকরণ” লেখা যেতে পারে।
এ ছাড়া ফেসবুকেরও এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট প্রচারের ক্ষেত্রে ‘এআই লেবেল‘ ব্যবহারের নীতিমালা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে এমন ব্যবহার খুব একটা দেখা যায় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন ব্যবহার দেখা যায়। যেমন, সম্প্রচার মাধ্যম বাংলা ভিশন পাকিস্তানে বাঁধে বিস্ফোরণ ঘটানোর ঘটনায় আলোচিত ছবিটি দিয়ে তৈরি ফটোকার্ডে এটি যে এআই জেনারেটেড সেটি উল্লেখ করে দিয়েছে। তাদের ফেসবুক পোস্টটি দেখুন এখানে।
Claim: পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের বিশাল অঞ্চলজুড়ে বন্যা শুরু হয়েছে। দেশটির শতদ্রু, রাভি ও চেনাব নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সৃষ্ট এ বন্যায় প্রাণহানিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির কর্তৃপক্ষ পানির চাপ কমাতে চেনাব নদীর কাদিরাবাদ বাঁধের তীররক্ষা অংশে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই বিস্ফোরণের ঘটনা প্রচার করতে গিয়ে একটি ছবি প্রচার করা হচ্ছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: Mostly false
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh