জ্বালানি তেল সংকটের মাঝে একাধিক এআই ছবি দিয়ে ভুয়া প্রচারণা

47
জ্বালানি তেল সংকটের মাঝে একাধিক এআই ছবি দিয়ে ভুয়া প্রচারণা
জ্বালানি তেল সংকটের মাঝে একাধিক এআই ছবি দিয়ে ভুয়া প্রচারণা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও কিছু পড়েছে। জ্বালানি তেলের জন্য বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে গাড়ি ও মোটরসাইকেলকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। আবার অনেক স্থানে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুদ করার ঘটনাও উন্মোচিত হচ্ছে। অসংখ্য সত্য ঘটনার মাঝে এই সম্পর্কিত কিছু গুজব এবং এডিট করা ছবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এমন দুটি এআই দিয়ে বানানো ছবি নিয়ে এই প্রতিবেদন।

পেট্রোল পাম্পের সামনে ঘুমন্ত বাইকারগণ 

একটি পেট্রোল পাম্পের সামনে খোলা জায়গায় জ্বালানি সংগ্রহের অপেক্ষায় শত শত মোটরবাইক এবং তারই ফাঁকে কিছু ঘুমন্ত মানুষের একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হচ্ছে, আরো কয়েক ঘণ্টা পরে জ্বালানি সরবরাহের কথা থাকলেও সিরিয়াল অনুযায়ী জ্বালানি সংগ্রহের জন্য এই বাইকাররা আগেভাগেই ভিড় করেছেন এবং সিরিয়ালে নিজেদের বাইক রেখে ফাঁকা জায়গায় ঘুমিয়ে নিচ্ছেন। চলমান পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পগুলোতে বিভিন্ন নৈরাজ্যকর ঘটনা ঘটলেও আলোচিত এই পেট্রোল পাম্পের কোনো নাম ঠিকানা এসব পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া যে ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্বারা তৈরী বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে। 

এসব পোস্টে বলা হয়েছে, “গভীর রাতের তেল আসার সংবাদ পেয়ে শত শত বাইকের সিরিয়াল, কর্তৃপক্ষ বলেছে তেল আসতে এখনো ৩-৪ ঘন্টা সময় লাগবে। তাই ফিলিং স্টেশনেই অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ২০০ টাকার তেলের জন্য কতটা সেক্রিফাইস, ঘর সংসার ফেলে রেখে ফিলিং স্টেশনেই রাত্রি যাপন করছে তারা’’। (বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

গত কয়েক দিনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ছবি থেকে বোঝা যাচ্ছে, জ্বালানি সংকটে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে অস্বাভাবিক ভীড় বেড়েছে। জাগোনিউজে গত ৮ মার্চ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘’দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় ‘প্যানিক বায়িং’য়ের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে মাঝরাতেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিচ্ছেন।
শনিবার (৭ মার্চ) রাত ৩টার দিকে সরেজমিনে রাজধানীর কয়েকটি পাম্প ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিনরাত ভিড় থাকছেই। তবে সন্ধ্যার তুলনায় এখন (অর্থাৎ মাঝরাতে) ভিড় কিছুটা কম।’’

 দৈনিক খোলা কাগজ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় পাম্পে তেল নিতে ভোর থেকেই ভিড় জমাচ্ছেন মোটরসাইকেল চালক, প্রাইভেটকার মালিক এবং গণপরিবহন চালকরা।

দৈনিক প্রথম আলোর ২৯ মার্চের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এই পাম্পের সামনে থেকে গাড়ির সারি জুলাই স্মৃতি জাদুঘর (গণভবন) মোড় পর্যন্ত দেখা গেছে। এ সময় সারিতে ৮৮টি প্রাইভেট কার ছিল।দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে অনেক চালককে গাড়ির মধ্যেই ঘুমাতে দেখা গেছে। কিছু কিছু চালককে ফুটপাতে গাছের ছায়ায় বসে গল্প করতে দেখা যায়।

জনৈক ফেসবুক ব্যবহারকারী ‘ট্রাভেলার সাদ্দাম’ এর একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ২৭ মার্চ সকালে কক্সবাজার থেকে ফেনী পর্যন্ত কোনো পেট্রোল পাম্পেই জ্বালানি পাওয়া যায়নি, এবং এই পথের বিভিন্ন জায়গায় তিনি বাইকারদের বাইকের উপরেই ঘুমাতে দেখেছেন।

ফেসবুকভিত্তিক ট্রাফিক জ্যামের আপডেট সংক্রান্ত গ্রুপ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহারকারীরা কখন কোন পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে এবং ভিড় কেমন, সেটার খোঁজখবর রাখছেন। অর্থাৎ কেবলমাত্র একটি পাম্পের উপরেই নির্ভরশীল হয়ে শত শত বাইকারের ৪/৫ ঘন্টা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়াটা বাস্তবসম্মত নয়। এছাড়া, ছড়িয়ে পড়া ছবিতে ‘পেট্রোল পাম্প বন্ধ’ কথাটি স্পষ্ট পড়া গেলেও তার নিচের ২টি লাইনে অর্থবহ কোনো শব্দ দেখা যাচ্ছে না।

ছবিটি পুনরায় পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল, এখানে ১২ বা ১৩ জন বাইকার মেঝেতে পাটি পেতে কাঁথা বা চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। এদের বাইরে শত শত বাইক অলসভাবে পার্ক করা রয়েছে। কোনো বাইকের উপরেই অন্য কোনো আরোহীকে দেখা যাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে, ঘুমন্ত লোকদের সারিতে আরো লম্বা থাকার কথা, কিন্তু তাদেরকে দেখা যাচ্ছে না। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI) শনাক্তকারী কয়েকটি টুলের সাহায্যে এই ছবিটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি। ‘hive moderation’ এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা ৯৯.৮%। জিরোজিপিটির বিশ্লেষণে এটি ৯৩% এআই। সাইট ইঞ্জিনের বিশ্লেষণে এটি এআই হওয়ার সম্ভাবনা ৯২%। 


বিছানার তলে জ্বালানি তেলের সংগ্রহশালা 

জ্বালানি তেল নিয়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যে কয়েকটি জেলায় তেল মজুতের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের জরিমানার পাশাপাশি কারাদণ্ডও দিয়েছেন। চট্টগ্রামের পতেঙ্গার একটি টিনশেড গুদাম, গোপালগঞ্জের গঙ্গা মোটর্স, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের রাজ স্টোর, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মেহেদী এন্টারপ্রাইজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ মজুদদারির অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে। 

দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাইরে আবাসিক বাসাতেও তেল মজুদের ঘটনা ঘটছে। বিবিসির এই প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, শেরপুরের একটি আবাসিক ভবন থেকে বৃহস্পতিবার ১৮ হাজার লিটার তেল এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৯ হাজার ৭৮৩ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় আজ শনিবার একটি গোয়ালঘর থেকে ড্রামভর্তি পেট্রোল উদ্ধার করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।গত বৃহস্পতিবার রাতে ময়মনসিংহের শেরপুরে একটি আবাসিক ভবনের নিচতলায় ২৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেল মজুত রাখার দায়ে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

তবে নিজের শোবার ঘরে খাটের তলায় জ্বালানি তেল মজুদের কোনো ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ দাবি করছেন, জনৈক ব্যবসায়ীর বাসায় বিছানার নিচে বোতলভর্তি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এমন দাবিযুক্ত কয়েকটি পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

এসব পোস্টে বলা হয়েছে, “দেশে পেট্রোল সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা জামাত শিবিরের। লুঙ্গির তলের এক শিবির লেতার বাসায় তল্লাশি করে খাটের তলায় পাওয়া গেলো  নতুন এক পেট্রোল পাম্প এ সমস্ত কর্মকাণ্ড করে দেশকে উশৃঙ্খলার পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে জামায়াত মুনাফেকি শিবিরের নেতা কর্মিরা।’’(বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

এসব পোস্টে ব্যবহৃত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি রুমের মধ্যে একটি খাটের ভেতরের অংশে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সাজানো অসংখ্য বোতল দেখা যাচ্ছে। এসব বোতলের সাথে ভোজ্য তেল এবং কোমল পানীয় বোতলের সাদৃশ্য রয়েছে। তবে বোতলগুলোর ভেতরের তরল পদার্থের রঙ একই নয়, পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বিশেষত, সবুজ রঙের বোতলের লেবেলে Sprite নামক কোমল পানীয় ব্র্যান্ডের নাম সুস্পষ্টভাবে পড়া যাচ্ছে। এছাড়া ভেতরকার পানীয়ের রঙও স্প্রাইট এর রঙের মতই দেখা যাচ্ছে। অপরাপর বোতলগুলোর ক্ষেত্রে অধিকাংশই ভোজ্য তেল, বিশেষত সয়াবিন তেলের রঙের মত দেখা যাচ্ছে। পেট্রোলের মত ঘন বর্ণের কোনো তরল এখানে দেখা যাচ্ছে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI) শনাক্তকারী টুল জিরোজিপিটির সাহায্যে এই ছবিটি যাচাই করে জানা গেল, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৭%। এছাড়া গুগল জেমিনির বিশ্লেষণেও জানা যাচ্ছে যে এই ছবিটি গুগলের এআই দিয়ে তৈরি, ফলে ছবিটিতে  একটি ডিজিটাল মার্ক লুকানো রয়েছে, যেটি জেমিনির এআই শনাক্তকরণ টুল – সিন্থ আইডি ধরতে পেরেছে।

সঙ্গত কারণে ফ্যাক্টওয়াচ এই সকল ছবিকে ‘বিকৃত’ সাব্যস্ত করছে। 

Claim:
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও কিছু পড়েছে। জ্বালানি তেলের জন্য বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে গাড়ি ও মোটরসাইকেলকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। আবার অনেক স্থানে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুদ করার ঘটনাও উন্মোচিত হচ্ছে। অসংখ্য সত্য ঘটনার মাঝে এই সম্পর্কিত কিছু গুজব এবং এডিট করা ছবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh