দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একটি শিশু তার বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছেন, এবং তারেক রহমান ও জাইমা রহমান উক্ত শিশুটির দায়িত্ব নিয়েছেন- এমন একটি খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অনুসন্ধানে এমন কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যে ২৭ জন নিহত হয়েছেন, তাদের তালিকা বিশ্লেষণ করেও কোনো বাচ্চাসহ স্বামী-স্ত্রী যুগল দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে শিশুটির যে ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে,সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বানানো।
এসব পোস্টে বলা হয়েছে, ‘’দৌলোদিয়া ফেরিঘাটে বাস তলিয়ে যাওয়ার কারণে বাচ্চাটার বাবা-মা দুজনেই পানিতে তলিয়ে মা*রা গেছে তাই বাচ্চাটির সব দায়িত্ব নিলেন প্রিয় তারেক রহমান এবং জাইমা রহমান ‘’ (বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)
এই পোস্টের সাথে যে ছবি যুক্ত করা হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে একটি ফেরিঘাট এলাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাইমা রহমান একজন শিশুর চোখ মুছে দিচ্ছেন। তাদের পিছনে একটি ফেরি দেখা যাচ্ছে। দুর্ঘটনার কোনো আলামত বা উদ্ধার কর্মসূচি চোখে পড়ছে না। এছাড়া, দৌলতদিয়ায় বাসডুবির ঘটনাটি ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ঘটলেও এখানে দিনের পরিবেশ দেখা যাচ্ছে।
২৫ মার্চের বাসডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং সবার নাম-পরিচয় সনাক্ত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ১১ জন পুরুষ, ৮ জন নারী ও ৮ জন শিশু ।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, কমপক্ষে ৪ টি ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) ডেন্টাল ইউনিটের ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জোহরা অন্তি ও তার স্বামী কাজী সাম্য সাইফ নিহত হয়েছেন। তবে তাদের কোনো সন্তান ছিল না।
দিনাজপুরের নাসিমা বেগম (৪০),তার ভাগ্নী নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩১) এবং নাজমিরার ছেলে আব্দুর রহমান (৪) একই সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন।
রাজবাড়ীর রেহেনা আক্তার (৬১), তার ছোট ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া আহনাফ তাহমিদ খান রায়হান (২৫) এবং তার নাতি তাজবীর (৭) এই বাসে মৃত্যুর শিকার হয়েছেন।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া দাবির সবচেয়ে কাছাকাছি বিবরণ মিলে যায় শিশু আলিফের সঙ্গে। তার মা জ্যোৎস্না বেগম (৩৫) নিহত হলেও মায়ের চেষ্টাতেই ১০ বছর বয়সী আলিফ বেঁচে যায়। এই আলিফের বাবার সাথে তার মায়ের পূর্বেই ছাড়াছাড়ি হয়েছিল এবং এই গাড়িতে তিনি ভ্রমণ করছিলেন না। ফলে, আলিফ এই বাসডুবিতে বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছে- এমন দাবি করা যাচ্ছে না।
সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি এবং গলায় তাবিজ পরিহিত এই আলিফের ছবিটির সাথেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাইমা রহমানের ছবিটি যুক্ত করে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই ছবিতে প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশে কোনো নিরাপত্তারক্ষী দেখা যাচ্ছেনা, যা এই ধরনের পরিবেশের সাথে একেবারেই মানানসই নয়। ছবিতে প্রধানমন্ত্রীর পাশে মাত্র ৫ জন সাধারন মানুষ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তাকে স্বচক্ষে দেখার কৌতূহলে প্রচুর জনসমাগম হওয়ার কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ আই সনাক্তকারী কয়েকটি টুল এর সাহায্যে ছড়িয়ে পড়া এই ছবিটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বানানো। হাইভ মডারেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ছবিটি এআই নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯% । সাইট ইঞ্জিন, ডিপ এআই ইত্যাদি টুলের বিশ্লেষণেও অনুরূপ ফলাফল পাওয়া গিয়েছে।
২৫ মার্চ মধ্যরাতে এক প্রেস বার্তায় সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছিলেন ‘’রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়ার বাসের উদ্ধারকাজ মনিটরিং করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছেন।’’
এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে কোনো শিশু বা কোনো পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন- এমন কোনো সংবাদ গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে না।
তার অফিসিয়াল ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ PMO Bangladesh – প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং Tarique Rahman এর গত কয়েকদিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, বাসডুবির ঘটনার পর থেকে তিনি ঢাকার বাইরে কোনো সফরে যাননি, বা বাস দুর্ঘটনায় নিহতদের কারো পরিবারের সাথেও সাক্ষাৎ করেননি। জাইমা রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বা কোনো মূলধারার গণমাধ্যমেও এমন কোনো কর্মকান্ড বা ঘোষণা দেখা যাচ্ছে না।
সার্বিক বিবেচনায় ফ্যাক্টওয়াচ এই ছবিগুলোকে ‘বিকৃত’ সাব্যস্ত করছে।
Claim: দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একটি শিশু তার বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছেন, এবং তারেক রহমান ও জাইমা রহমান উক্ত শিশুটির দায়িত্ব নিয়েছেন- এমন একটি খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: Invalid rating
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh