বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের করমর্দনের  ভিডিওটি এআই নির্মিত

223
বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের করমর্দনের  ভিডিওটি এআই নির্মিত
বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের করমর্দনের  ভিডিওটি এআই নির্মিত

‘ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমানকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর জেনারেল ও উপ-সেনাপ্রধান পদে নিযুক্তির সুপারিশ করায় এবং বঙ্গবন্ধু তা সানন্দে গ্রহণ করার দুর্লভ মুহুর্ত’ দাবিতে ৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এখানে সামরিক পোশাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ এবং বেসামরিক পোশাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখা যায়। সাবেক সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহর হাত থেকে বঙ্গবন্ধু কোনো একটি কাগজ গ্রহণ করেন, এবং জিয়াউর রহমানের সাথে করমর্দন করেন। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, অনুরূপ একটি ছবি অনলাইনে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে এবং পুরোনো সেই ছবির মাধ্যমেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এই ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। তবে এসব পোস্টে জিয়াউর রহমান এর পদোন্নতি সম্পর্কে যে দাবি করা হয়েছে ,ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে তার স্বপক্ষে প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সার্বিক বিবেচনায় এ সকল ভিডিওকে ফ্যাক্টওয়াচ বিকৃত সাব্যস্ত করছে।

গুজবের উৎস

ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও দেখতে পাবেন এখানে,এখানে,এখানে,এখানে,এখানে

এসব ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ‘তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ বঙ্গবন্ধুর কাছে ব্রিগেডিয়ার জিয়াকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর জেনারেল ও উপ-সেনাপ্রধান পদে নিযুক্তির সুপারিশ করলেন ও বঙ্গবন্ধু তা সানন্দে গ্রহণ করায় ব্রিগেডিয়ার জিয়ার উৎফুল্লতা প্রকাশের সেই দুর্লভ মুহুর্তটি।যারা জিয়াউর রহমানকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের সাথে তুলনা করে তাদের জন্য এই ভিডিওটা…..’

অনুসন্ধান

দেখা যাচ্ছে এই ভিডিওর বাম কোণায় Vidnoz Gen শব্দ দু’টি এবং লোগো রয়েছে।  অনসন্ধানে দেখা গেল, এটি একটি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করার ওয়েবসাইট। এই ওয়েবসাইটে কোনো ছবির সাহায্যে ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। ভিডিওগুলোর সময়কাল ৫ সেকেন্ড অথবা ৮ সেকেন্ড হয় এবং প্রতিটি ভিডিওর নিচে Vidnoz Gen এর নাম ও লোগো থাকে।

বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য , বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জিয়াউর রহমান ও কে এম সফিউল্লাহ এর ছবি অনলাইন থেকে সংগ্রহ করে এটা ব্যবহার করে তাদের করমর্দনের ভিডিও তৈরি করার চেষ্টা করা হল।  তৈরি ভিডিওটা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সাথে প্রায় সম্পূর্ণভাবে মিলে যায় ।


ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে
নেওয়া স্ক্রিনশট 

ফ্যাক্টওয়াচের বানানো এআই ভিডিও
থেকে  নেওয়া স্ক্রিনশট


এই ছবিটির মূল উৎস সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া ছবিটি কবে তোলা হয়েছিল কিংবা এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে জিয়াউর রহমান এবং কে এম শফিউল্লাহর কি বিষয়ে সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেটিও জানা সম্ভব হয়নি । দৈনিক প্রথম আলোতে ১৫ আগস্ট ২০১৮ তারিখে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব হত্যা শীর্ষক প্রবন্ধে এই ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ছবির ক্যাপশনে ছিল –বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জিয়াউর রহমান ও কে এম সফিউল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইটে সকল সেনাপ্রধানের (অর্থাৎ চিফ অফ আর্মি স্টাফ) নাম এবং দায়িত্ব গ্রহণ ও ত্যাগের দিন-তারিখ সম্বলিত একটি তালিকা রয়েছে। তবে উপ-সেনাপ্রধানদের(ডেপুটি চিফ অফ আর্মি স্টাফ) এমন কোনো তালিকা দেখা যাচ্ছেনা।

সাবেক সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু একটা মস্ত বড় ভুল করেছিলেন, সেটা হচ্ছে আমাকে সেনাপ্রধান করে আর জিয়াউর রহমানকে উপপ্রধান করে।’

তিনি আরো বলেন, আমি কিন্তু সেনাপ্রধান হতে চাইনি। জেনারেল ওসমানী ৫ এপ্রিল ডেকে বললেন, “তুমি আর্মি টেক ওভার করো।” আমি বললাম, আমার সিনিয়র আছে। আমার তিনজন সিনিয়রের নাম বললাম। কর্নেল রব, দত্ত ও জিয়াউর রহমান। আমরা একই ব্যাচের হলেও জিয়াউর রহমান আমার চেয়ে ১ নম্বরের সিনিয়র ছিলেন। তখন আমি বললাম, এটা ঠিক হবে না। আমি বললাম, স্যার, এ সময়ে কী কাজটা করা ঠিক হবে? আমাদের মধ্যে তো একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। অফিশিয়াল সিদ্ধান্ত হোক আর যাহোক, এটা ঠিক হচ্ছে না।’

এই ঘটনার আরেকটু বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়, ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আদালতে জেনারেল শফিউল্লাহর সাক্ষ্য থেকে। দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ১৯ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসূলের আদালতে তিনি সাক্ষ্য দেন । তার বক্তব্যে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘’যখন আমাকে ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়,আমি প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে।’’ কারন হিসেবে তিনি বলন, জিয়াউর রহমান তার চেয়ে সেনা একাডেমিতে সিনিয়র ছিলেন।

তিনি বলেন, “দুই ঘণ্টার আলোচনা শেষে, বঙ্গবন্ধু মন্তব্য করেন, ‘আমি তোমার কথা শুনেছি। এখানে একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার আছে।'” উত্তরে সাক্ষী (কে এম শফিউল্লাহ) বলেন, “স্যার, আজ থেকে আমি এখন এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতির শিকার হব।” কিন্তু বঙ্গবন্ধু বললেন, “তুমি বড় বড় কথা বলছো। এখন যাও এবং আগামীকাল জেনারেল ওসমানী (তৎকালীন সেনাপ্রধান) থেকে তোমার দায়িত্ব নিয়ে নাও।”

সাবেক সেনাপ্রধান  বলেন, ”তিনি তখন বঙ্গবন্ধুর অফিস থেকে সরাসরি ৪৬ ব্রিগেডে চলে গিয়েছিলেন এবং কুমিল্লায় জিয়াউর রহমানকে ফোন করে পুরো ঘটনা খুলে বলেন।তিনি বলেন, “জিয়া আমার কথা শুনে বললেন, ‘ঠিক আছে শফিউল্লাহ, এখন বিদায়।'” এক সপ্তাহ পর, সেনাবাহিনীর উপপ্রধান পদের একটি নতুন পদ তৈরি করা হয় এবং জিয়াউর রহমানকে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়। জিয়াউর রহমান কুমিল্লা থেকে এসে সেই পদে যোগ দেন, তবে তিনি কিছুটা ক্ষুব্ধ ছিলেন, যা তিনি অন্যদের কাছে প্রকাশ করেছিলেন।

মেজর জেনারেল মইনুল হাঁসান চৌধুরী (অবঃ) বীরবিক্রমের লেখা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক’ শীর্ষক বইয়েও কে এম শফিউল্লাহর সেনাপ্রধান ও জিয়াউর রহমানের উপ-সেনাপ্রধান হওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। বইটির ৪০-৪১ পৃষ্ঠায় জানানো হয়েছে, জেনারেল জিয়া জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তাকে আর্মিতে রেখে জেনারেল শফিউল্লাহ কে সেনাবাহিনী প্রধান করা হয়। এর কিছুদিন পরে ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমানকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।  

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ওয়েবসাইটে জিয়াউর রহমান এর পাতায় তার জীবনীতে লেখা রয়েছে,, ১৯৭২ সালের জুন মাসে তাকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ (অর্থাৎ উপ-সেনাপ্রধান) পদে উন্নীত করা হয়।

এ সকল আলোচনায় কেউই ‘জেনারেল শফিউল্লাহ ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমানের জন্য উপ সেনাপ্রধান এর পদ সুপারিশ করেছিলেন’ এমন কোনো দাবি করেননি। বরং এ সকল আলোচনায় প্রতীয়মান হচ্ছে যে জিয়াউর রহমান তার যোগ্যতাবলেই এই পদ অর্জন করে নিয়েছিলেন।

তবে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এ আই নির্মিত ভিডিওগুলো এবং তার ক্যাপশনে এই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সার্বিক বিবেচনায় ফ্যাক্টওয়াচ ভিডিওটিকে  বিকৃত চিহ্নিত করছে।

Claim:
‘ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমানকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর জেনারেল ও উপ-সেনাপ্রধান পদে নিযুক্তির সুপারিশ করায় এবং বঙ্গবন্ধু তা সানন্দে গ্রহণ করার দুর্লভ মুহুর্ত’ দাবিতে ৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এখানে সামরিক পোশাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ এবং বেসামরিক পোশাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখা যায়। সাবেক সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহর হাত থেকে বঙ্গবন্ধু কোনো একটি কাগজ গ্রহণ করেন, এবং জিয়াউর রহমানের সাথে করমর্দন করেন।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
Mostly false

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh