ঈদ ও রমজান উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে টাকা দেওয়া হবে, এ ধরনের অনেক পোস্ট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব পোস্টের সঙ্গে তারেক রহমান, জোবাইদা রহমান এবং জাইমা রহমানের আদলে কিছু ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো ভিডিও। পোস্টগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব পোস্টের উদ্দেশ্য পেজের ফলোয়ার বাড়ানো এবং বিকাশ নম্বর সংগ্রহ।
উল্লেখ্য, চলতি বছরে ঈদের আগে সরকারের উদ্যোগে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এর মাধ্যমে দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তিদের দুই হাজার পাঁচশত টাকা প্রদান করা হয়। মূলত এই সূত্র ধরেই তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানের পক্ষ থেকে টাকা প্রদান সম্পর্কিত বক্তব্যের এআই ভিডিওগুলো প্রচার করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
অধিকাংশ ভিডিওগুলোর ক্যাপশনে ‘বিকাশ নাম্বার’ ও ‘ঈদ উপহার’ এমন শব্দের উল্লেখ রয়েছে। ভিডিওকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে এআই দিয়েই যুক্ত করা হয়েছে টাকা, উপহার ও চেকের দৃশ্য। তবে মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এমন ভিডিওবার্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নমুনা ১ঃ
ট্রেন্ডিং বাঙালি পেজে প্রকাশিত দশটির অধিক ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঈদের উপহার হিসাবে ২৫০০ টাকা দেবেন। দর্শকদের বিকাশ নাম্বার দিতে আহ্বান করা হচ্ছে। এমন কিছু ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে, এখানে।
ভিডিওগুলোর কণ্ঠস্বর যান্ত্রিক, মুখ ও ঠোঁটের নড়াচড়া এবং ভঙ্গিমায় অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। একই ভিডিওতে কয়েকবার প্রেক্ষাপট ও স্বর পরিবর্তন হতে দেখা যায়। এই পেজ থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তারেক রহমান সদৃশ একজন বলছেন, “ঈদ উপলক্ষে বড় উপহার, এখন থেকে যে এই পেজটি ফলো করবে সেই পাবে নগদ বারো হাজার টাকা, তাড়াতাড়ি ফলো এবং শেয়ার করে বিকাশ নাম্বার দিন।” প্রচারিত ভিডিওটির পিছনে পতাকা, ছবি ও জাতীয় প্রতীকে গড়মিল দেখা যায়।
তারেক রহমানের ছবি ব্যবহার করে এআই এর সহায়তায় ভিডিওগুলো বানানো হয়েছে বলে ধারণা পাওয়া যায়। এআই ভিডিও শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশনের মাধ্যমে যাচাই করে ভিডিওগুলোকে কৃত্রিম হিসেবে ফলাফল পাওয়া যায় ।
ট্রেন্ডিং বাংলা ও জনতার ইনকিলাবের মতো টেম্পলেট ব্যবহার করে Zaima Rahman BNP নামক একটি পেজে প্রকাশিত ভিডিওটিতে দাবি করছে, তারেক রহমান বিকাশ নম্বর চেয়েছেন। ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, “ঈদ উপলক্ষে বড় উপহার, এখন থেকে নিয়ে যে এই পেজটি ফলো করবে।”
অনুসন্ধানে ভিডিওটিতে উপস্থিত ব্যক্তিদের কৃত্রিমতা লক্ষ্য করা যায়। ভিডিওটি বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কিছু অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়। যেমনঃ টেবিলের টাকা, চেহারার ভঙ্গিমা ও পতাকার নড়াচড়াতে কৃত্রিমতা রয়েছে। যা সাধারণত এআই-নির্মিত কন্টেন্টে দেখা যায়। এআই শনাক্তকারী প্রযুক্তি হাইভ মডারেশনের মাধ্যমে ভিডিওটি পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
নমুনা ৩ঃ
জাইমা রহমান নামের পেজ থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে তারেক রহমানকে বলতে শোনা যায়, “আগামীকাল শেষ দিন। এখনো যারা ঈদের টাকা পাননি তারা পেজটি ফলো করুন।” ভিডিওটির কি-ফ্রেম রিভার্স সার্চে আজকের পত্রিকার একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ভিডিওটির সাথে তারেক রহমানের পোশাক, ব্যাকগ্রাউন্ড এবং তার চুল ও চশমার মিল পাওয়া যায়। “আমার ছোট বেলা থেকে খুব ইচ্ছা ছিল কি-বোর্ড বাজানোর: তারেক রহমান” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ সালের। প্রতিবেদনে সঙ্গীত শিক্ষা ও তার নিজের গানের ইচ্ছা সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে। ঈদের টাকা সম্পর্কে কোন বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায় না।
পরবর্তীতে ভিডিওটি বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কিছু অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়, যা সাধারণত এআই-নির্মিত ভিডিওতে দেখা যায়। হাইভ মডারেশনের মাধ্যমে ভিডিওটি পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, বক্তব্যটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
‘রাষ্ট্র নায়ক তারেক রহমান🇧🇩’ গ্রুপে Auwal Tv পেজ থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, একজন যুবক টাকার বান্ডেল হাতে নিয়ে বলছেন, তিনি পেজটিতে লাইক শেয়ার ও কমেন্ট করেছেন তাই তারেক পরিবার তাকে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দিয়েছেন। দর্শকদেরও এমনটা করতে আহ্বান করা হয়। ক্যাপশনে বলা হয়, কাগজপত্র কিছুই লাগবে না।
আলোচিত ভিডিওটি আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তায় নির্মিত একটি ভিডিওকে আসল দাবিতে প্রচার করা হয়েছে৷
উক্ত দাবিতে প্রচারিত পোস্টগুলো পর্যালোচনা করে দাবিটির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যম কিংবা সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত কোনো সূত্রেও এ বিষয়ে কোনো সংবাদ বা তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
পরবর্তীতে ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করলে কিছু অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন- টাকাগুলো দেখতে অবাস্তব, ব্যক্তিটির মুখ ও কথা যান্ত্রিক। এছাড়া পিছনে থাকা তারেক পরিবারকে কার্টুনের মত দেখা যায়। যা সাধারণত এআই-নির্মিত ভিডিওতে দেখা যায়। হাইভ মডারেশনের মাধ্যমে ভিডিওটি পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
নমুনা ৫ঃ
ধানের শীষ অনুদান ফান্ড প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান ‘ঈদ ঘনিয়ে আসছে’ ক্যাপশন দিয়ে কমেন্টে সবাইকে জেলার নাম লিখতে বলছেন। তাকে বলতে শোনা যায় যারা কমেন্ট করবেন তাদের সাথেই যোগাযোগ করা হবে।
একই পদ্ধতিতে অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওটি আসল নয়। এটিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নির্মিত একটি ভিডিও।
নমুনা ৬ঃ
একই ভাবে Ovi Creations পেজ থেকে প্রকাশিত এই ভিডিওটিতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান ঈদের সালামি দেওয়ার জন্য লাইক কমেন্ট চেয়েছেন ।
ভিডিওটিতে তাকে বলতে শোনা যায়, ঈদের সালামি পেতে শুধুমাত্র লাইক কমেন্ট করে অংশ নিন।
পোস্টগুলো পর্যালোচনা করে দাবিটির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যম কিংবা সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত কোনো সূত্রেও এ বিষয়ে কোনো সংবাদ বা তথ্য প্রকাশিত হয়নি। এছাড়া, জাইমা রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও এমন কোনো বক্তব্য বা ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এটিও এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
১০ টি পেজের একাধিক কৃত্রিম ভিডিওতে এ ধরনের বক্তব্য সংবলিত পোস্টের কমেন্টে অসংখ্য ফেসবুক ব্যবহারকারীকে তাদের বিকাশ ও নগদ নম্বর শেয়ার করতে দেখা গেছে। রোজা ও ঈদ উপলক্ষে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার দাবিতে এআই ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে। অন্তত ১০টি আলাদা ফেসবুক পেজ থেকে একযোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ডিপফেক ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।
এসব পোস্টে থাকা এআই নির্মিত ভিডিওগুলোকে বিকৃত বলে চিহ্নিত করা হলো।
একই বিষয়ে ফ্যাক্টওয়াচের আরেকটি প্রতিবেদন পড়ুন এখানে।
Claim: ঈদ ও রমজান উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে টাকা দেওয়া হবে, এ ধরনের অনেক পোস্ট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব পোস্টের সঙ্গে তারেক রহমান, জোবাইদা রহমান এবং জাইমা রহমানের আদলে কিছু ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো ভিডিও। পোস্টগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব পোস্টের উদ্দেশ্য পেজের ফলোয়ার বাড়ানো এবং বিকাশ নম্বর সংগ্রহ।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh