ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকায় বিমান বাহিনীর একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়। গতকাল সোমবার (২১ জুলাই) দুপুরে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় বলে জানিয়েছে আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআর। এই ঘটনার পর ফেসবুকে এক তরুণীর দুটি ছবি দিয়ে পেশাদার প্রশিক্ষিত পাইলটের বক্তব্য দাবিতে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। ওই পোস্টে দাবি করা হয়, 'একজন পাইলট হিসেবে দিয়াবাড়ি বিমান দুর্ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যায় না, এটি ‘একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’। এই "দুর্ঘটনা" আসলে একটি নিখুঁত পরিকল্পিত “Military-PR Operation” - যার মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানো হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। পোস্টদাতা নিজেকে একজন ‘এভিয়েশন ট্রেইন্ড পাইলট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।' ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, যে তরুণীর ছবি ব্যবহার করে এসব দাবি করা হচ্ছে, তিনি একজন ভারতীয় তরুণী, তার নাম রোকেয়া দেশাই। তিনি বাংলাদেশের গতকালের বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি বলে ফ্যাক্টওয়াচকে জানিয়েছেন।
ফেসবুকে প্রচারিত পোস্টগুলোর সূত্রে এই দাবিতে প্রচারিত সম্ভাব্য প্রথম পোস্টটি খুঁজে পাওয়া যায় ‘নাফিসা তামিম (Nafisa Tamim)’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে। এতে গতকাল সোমবার (২১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পোস্টটি করা হয়। অ্যাকাউন্টটি খোলা হয়েছে গত ৮ মে। অ্যাকাউন্টটিতে দুটি লোকেশন ঢাকা ও চট্টগ্রাম উল্লেখ রয়েছে। ইন্ট্রোতে একই অর্থাৎ ‘নাফিসা চৌধুরী তামিম (nafisa_chowdhury_tamim)’ নামে খোলা একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের লিংকও রয়েছে।
উত্তরার দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনাকে ‘একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করা এই পোস্টেও ওই তরুণীর ছবি দুটি পাওয়া যায়। ছবি দুটি রিভার্স ইমেজ সার্চে ‘rukaiyahx’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পাওয়া যায়। ছবি দুটির একটি ২০২৩ সালের ৫ মার্চ এবং আরেকটি ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর পোস্ট করা হয়।
অনুসন্ধানে একই ছবি ‘নাফিসা তামিম (Nafisa Tamim)’ নামের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও পাওয়া যায়। ‘rukaiyahx’ নামের অ্যাকাউন্টটিতে যে ছবিটি ২০২৩ সালের ৫ মার্চ পোস্ট করা হয়, সেই ছবি ‘নাফিসা চৌধুরী তামিম (nafisa_chowdhury_tamim)’ নামের অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা হয় ওই বছরের ১৯ মার্চ।
একই ছবি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দুটি অ্যাকাউন্টে
‘rukaiyahx’ ও ‘নাফিসা চৌধুরী তামিম (nafisa_chowdhury_tamim)’ নামের ইনস্টাগ্রাম দুটি অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ‘rukaiyahx’ নামের অ্যাকাউন্টটিতে পোস্ট করা ছবি কিছুদিন ব্যবধানে ‘নাফিসা চৌধুরী তামিম (nafisa_chowdhury_tamim)’ অ্যাকাউন্টে পাওয়া যায়।
এ ছাড়া নাফিসা তামিম (Nafisa Tamim)’ অ্যাকাউন্টটিতে পোস্ট করা ছবির রেজুলেশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এগুলো ‘rukaiyahx-এ দেওয়া ছবির তুলনায় খারাপ।
এসব থেকে একটি বিষয় ধারণা করা যায়, নাফিসা তামিম (Nafisa Tamim)’ অ্যাকাউন্টটি rukaiyahx-এ দেওয়া আগের পোস্ট সংগ্রহ করে পরে পোস্ট করে থাকতে পারে এবং এটি একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট।
পরবর্তীতে ‘rukaiyahx’ অ্যাকাউন্টধারীর সঙ্গে ইনস্টাগ্রামে যোগাযোগ করে ফ্যাক্টওয়াচ। এই অ্যাকাউন্টধারী জানান, এটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট। তিনি নাফিসা তামিম নামের অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করেন না। তার ফলোয়াররাও তাকে এই ব্যাপারে আগে ম্যাসেজ করে জানিয়ে ছিলেন।
পেশায় এয়ারক্রাফট মেইনটেইনেন্স ইঞ্জিনিয়ার (ট্রেইনি) ভারতের মুম্বাইয়ের বাসিন্দা রোকেয়া দেশাই ফ্যাক্টওয়াচকে আরও জানান, তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটি নিশ্চিত যে, ভারতীয় এয়ারক্রাফট মেইনটেইনেন্স ইঞ্জিনিয়ার (ট্রেইনি) তরুণীর ছবি ব্যবহার করে পেশাদার প্রশিক্ষিত পাইলট দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।
বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে ফেসবুক পোস্টে উল্লিখিত দাবিগুলোর সত্যতা
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকায় বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে ‘একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করা পোস্টগুলোতে উল্লিখিত তথ্যগুলো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারণ, একটি বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার পর সেটি কেন, কিভাবে দুর্ঘটনায় পতিত হলো এসব উদঘাটন দীর্ঘ তদন্তের দাবি রাখে।
এ ছাড়া পোস্টটি সম্ভাব্য প্রথম নাফিসা তামিম নামের যে অ্যাকাউন্টটিতে পাওয়া যায়, সেটি খোলার পর থেকে প্রায় তিন মাসের পোস্ট, ভিডিও বিশ্লেষণ করে অ্যাকাউন্টটির সঙ্গে বিমান নিয়ে বিশেষায়িত তেমন কোনো পোস্ট দেখা যায়নি বরং এসব পোস্টের অধিকাংশই রাজনৈতিক। পাশাপাশি ইতিমধ্যেই অ্যাকাউন্টটিতে যে নারীর ছবিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তিনিও ভিন্ন এক তরুণী এবং বাংলাদেশি নন।
এসব প্রমাণের ভিত্তিতে ফ্যাক্টওয়াচ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকায় বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ভারতীয় নারীর ছবি ব্যবহার করে ভিত্তিহীন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তাই ফ্যাক্টওয়াচ দাবিগুলোকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করছে।
উল্লেখ্য, কন্সপিরেসি থিওরি বা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ মূলত কোন ঘটনার সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া গভীর ষড়যন্ত্রের এক দৃশ্যপট তৈরি করাকে বোঝায়।
Claim: ফেসবুকে এক তরুণীর দুটি ছবি দিয়ে পেশাদার প্রশিক্ষিত পাইলটের বক্তব্য দাবিতে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। ওই পোস্টে দাবি করা হয়, 'একজন পাইলট হিসেবে দিয়াবাড়ি বিমান দুর্ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যায় না, এটি ‘একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’। এই "দুর্ঘটনা" আসলে একটি নিখুঁত পরিকল্পিত “Military-PR Operation” - যার মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানো হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। পোস্টদাতা নিজেকে একজন ‘এভিয়েশন ট্রেইন্ড পাইলট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।'
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh