আজহারীর ডিপফেক ভিডিও দিয়ে পণ্য বিক্রির ভুয়া বিজ্ঞাপন

29
আজহারীর ডিপফেক ভিডিও দিয়ে পণ্য বিক্রির ভুয়া বিজ্ঞাপন
আজহারীর ডিপফেক ভিডিও দিয়ে পণ্য বিক্রির ভুয়া বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ফেসবুকে একাধিক বিজ্ঞাপনে ইসলামি বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারীর ভিডিও ব্যবহার করে বিভিন্ন হার্বাল ও যৌন উত্তেজক পণ্য বিক্রির প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের ভিডিওগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, ড. আজহারী নিজে এই পণ্যগুলো ব্যবহার করেন এবং কিনতে সুপারিশ করছেন। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিডিওগুলো ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এবং ড. আজহারীর সাথে এই পণ্যগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।

বিজ্ঞাপনে প্রচারিত ভিডিওগুলো দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে । 

অনুসন্ধানের শুরুতে ‘আজহারী পণ্য’, ‘Azhari shop’, ‘আজহারী হার্বাল’ এবং ‘As-Sunnah Azhari Lab’ এমন কিছু কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে ফেসবুকে এবং মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে খোঁজ করা হয়। খোঁজে একই ধরনের নামে পরিচালিত একাধিক ফেসবুক পেজ এবং সেগুলো থেকে চালানো বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। বিজ্ঞাপনের ভিডিওগুলোতে ড. আজহারীকে বিভিন্ন হার্বাল ও চিকিৎসা পণ্য সুপারিশ করতে দেখা যাচ্ছে।

অনুসন্ধানের সুবিধার্থে এ পর্যায়ে ১০টি পেজ নিয়ে কাজ শুরু করে ফ্যাক্টওয়াচ টিম। পেজগুলো হল:

পেজগুলোর মধ্যে কয়েকটি লক্ষণীয় মিল রয়েছে। প্রথমত, সব পেজের নামে ‘আজহারী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং সাথে ‘শপ’, ‘ল্যাব’, ‘স্টোর’, ‘ফাউন্ডেশন’ যোগ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পেজগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আগে ভিন্ন নামে তৈরি ছিল — যেমন ‘Fitness Zone BD’, ‘Organic Lifestyle’, ‘Good health’, ‘Natural House’ — পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে ‘আজহারী’ যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, পেজগুলো ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে তৈরি বা নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। চতুর্থত, সবগুলো পেজ বাংলাদেশ থেকে পরিচালনা করা হচ্ছে বলে ফেসবুকের পেজ ট্রান্সপারেন্সি টুল থেকে জানা যায়। এ থেকে বোঝা যায়, এক বা একাধিক সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই বিজ্ঞাপন প্রচার করছে।

ডিপফেক ভিডিওর বিশ্লেষণ

অনুসন্ধানের এ পর্যায়ে বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ড. আজহারী সরাসরি কথা বলছেন এবং নির্দিষ্ট পণ্যের নাম উচ্চারণ করে সেগুলো কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে ভিডিওর বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য অসঙ্গতিপূর্ণ।

ভিডিওতে ঠোঁটের নড়াচড়া এবং কণ্ঠস্বরের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়। এসব ডিপফেক প্রযুক্তির একটি সাধারণ চিহ্ন। এছাড়া মুখমণ্ডলের চারপাশে অস্বাভাবিক আলো এবং ঘাড় ও মাথার নড়াচড়া অস্বাভাবিক দেখায়। ড. আজহারীর সাথে পরিচিত যেকোনো দর্শকের কাছেই কণ্ঠস্বর ও বলার ধরন অস্বাভাবিক মনে হয়। তার কণ্ঠস্বরের সাথে পরিচিত এমন তিনজন ফ্যাক্টচেকারদের দাবিকৃত ভিডিওগুলোর শব্দ শোনালে তারা প্রতেক্যেই বলেন, এ কণ্ঠস্বর আজহারীর নয়।

ভিডিওগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ভিডিওগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড বা ফ্রেমের অংশবিশেষ ড. আজহারীর বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিওর কি-ফ্রেম থেকে নেওয়া হয়েছে। আজহারীর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল থেকে ভিডিওগুলো পর্যবেক্ষণ করলে পাওয়া যায় তার কথা বলার ভঙ্গি ও ছন্দ দাবিকৃত ভিডিওগুলোর থেকে আলাদা। তার মূল চ্যানেলের ভিডিও দেখুন এখানে। 

তার আসল ভিডিওগুলোর সঙ্গে দাবিকৃত পণ্য বিক্রির কোনো সম্পর্ক নেই।

স্টার নিউজ প্রকাশিত ‘আজহারীর ‘ডিপফেক’ ভিডিও বানিয়ে যৌন উত্তেজক পণ্য বিক্রি, দুইজন রিমান্ডে’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ড. মিজানুর রহমান আজহারী ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমবার এই ধরনের ভুয়া ভিডিও সম্পর্কে সচেতন হন এবং তার যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে একটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি জানান, এই ভিডিওগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া এবং কোনো পণ্যের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। পরবর্তীতে তার পক্ষে বিল্লাল হোসেন নামের একজন প্রতিনিধি ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পল্টন মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দাখিল করেন।

ফ্যাক্টওয়াচ যাচাই করেছে, এই ঘটনায় ইতিমধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে একাধিক ফেসবুক পেজ, অ্যাকাউন্ট ও ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ২৩ ও ২৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম ও ঢাকায় পরিচালিত অভিযানে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, পেনড্রাইভ, সিম কার্ড এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ যৌন উত্তেজক ওষুধ উদ্ধার করা হয়।

এই বিজ্ঞাপনগুলো মেটার একাধিক নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। মেটার ভুয়া পরিচয় নীতি অনুযায়ী, কোনো বাস্তব ব্যক্তির পরিচয় অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। প্রতারণা ও জালিয়াতিবিরোধী নীতি অনুযায়ী, মিথ্যা দাবি করে পণ্য বিক্রি অনুমোদিত নয়। এছাড়া বিজ্ঞাপন মানদণ্ড অনুযায়ী, বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা বিষয়বস্তু সম্পন্ন বিজ্ঞাপন চালানো যাবে না। তবুও এই পেজগুলো থেকে নিয়মিত বিজ্ঞাপন চালানো হচ্ছে।

সব তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, AI ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড. মিজানুর রহমান আজহারীর মুখ ও কণ্ঠস্বর নকল করে ভুয়া পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছে। সংঘবদ্ধ একটি চক্র একাধিক ফেসবুক পেজ পরিচালনা করে এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনের পণ্যগুলোর সাথে ড. আজহারীর কোনো সম্পর্ক নেই এবং তিনি নিজেই এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাই ফ্যাক্টওয়াচ এই বিজ্ঞাপনগুলোকে “মিথ্যা” হিসেবে চিহ্নিত করছে।

প্রতিবেদনটি লিখেছেন ফ্যাক্টওয়াচের ফ্যাক্টচেকার শিবলী সাদিক সিফাত।  

Claim:
সম্প্রতি ফেসবুকে একাধিক বিজ্ঞাপনে ইসলামি বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারীর ভিডিও ব্যবহার করে বিভিন্ন হার্বাল ও যৌন উত্তেজক পণ্য বিক্রির প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের ভিডিওগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, ড. আজহারী নিজে এই পণ্যগুলো ব্যবহার করেন এবং কিনতে সুপারিশ করছেন।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh