বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারণায় এআই, প্রভাব ফেলতে পারে জনমত তৈরিতে
বগুড়ায় ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি না হওয়ায় বাবাকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে বগুড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সাধারণ সম্পাদক জিতু ইসলামের বিরুদ্ধে। গত ১৪ জুন এ ঘটনা ঘটে। এটিকে কেন্দ্র করে ১৯ জুন “জেন জি” নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে “তারুণ্যর প্রথম ভোট ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে হোক (আর্কাইভ)” ক্যাপশনে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটিতে কয়েকজন তরুণ নিজেদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বগুড়ার এই ঘটনা তুলে ধরে বলেন, খুনিদের প্রতি তাদের কোনো সমর্থন নেই। তারা এসব অন্যায়ের জবাব ভোটের মাধ্যমে দেবেন।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ট্রেন্ড টেম্পুস্ট্যান্ড। এই ট্রেন্ড দিয়ে বিএনপি কর্মীদের চাঁদাবাজিকে ইঙ্গিত করা হয়। গত ২১ জুন “পলিটিক্যাল মিম (আর্কাইভ)” নামের পেজ থেকে “কেন টেম্পোস্ট্যান্ড ও চাঁদাবাজদের ভোট দিবোনা” ক্যাপশনে এমন একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটিতে হিজাব পরিহিত এক নারীকে বলতে শোনা যায়, টেম্পুস্ট্যান্ড বা কোনো চাঁদাবাজকে ভোট দিলে তাদের অপকর্মের দায় আপনাকেও নিতে হবে।


একই দিনে “ইসলামের সৈনিক শ্রমিক (আর্কাইভ)” নামের পেজ থেকে ৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটির ওপর লেখা, “বিএনপি দল হিসেবে কেমন?”-ভিডিওটিতে এক নারীকে একজন এই প্রশ্নটি করেন। উত্তরে এই নারী বলেন, ” বিএনপি এমন একটা দল, যে ক্ষমতার আসার আগেই পতন চায় জনগণ।”
ভিডিওগুলো যাচাইয়ে দেখা যায়, এগুলোর সবই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি। তবে কেবল বিএনপি নয়, এমন প্রচারণা দেখা যায় আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপিকে নিয়েও। গত ২০ জুন “কাঠের কেল্লা (আর্কাইভ)” নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে একটি পোস্ট করা হয়। পোস্টে এক তরুণ বলেন, “জামায়াতে ইসলামী কোন রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি এমএলএম ব্যবসা। ডেসটিনির ব্যবসা শেষ, জামায়াতের বাংলাদেশ।”
গত বছরের অক্টোবরে ফেনীর একটি ইসলামী সম্মেলনে হেফাজত আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, “আমরা জামায়াতে ইসলামকে ইসলামি দল মনে করি না। জামায়াতে ইসলাম মদিনার ইসলাম চায় না, তারা মওদুদীর ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়।” তার এই বক্তব্যের সূত্রেও তৈরি করা হয়েছে এআই ভিডিও (আর্কাইভ)। যেখানে একজন আলেম বলছেন, “মুহিব্বুল্লাহ বাবু নগরী বলেছেন — জামায়াত মদিনার ইসলাম নয়। তারা মওদুদির ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই জামায়াত ও মওদুদির ফেতনা থেকে দূরে থাকুন।”
টিকটকে প্রচারিত একটি ভিডিওতে একদল তরুণ-তরুণীকে (আর্কাইভ) বলতে শোনা যায়, “নৌকা আর ধানের শীষ, দুই সাপের এক বিষ।”


এসব ভিডিও তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড পলিটিক্সের গবেষক জেইভ স্যান্ডারসন অলাভজনক সংবাদ সংস্থা এনপিআরকে বলেন, এই ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মূলত মানুষের মত পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাদের পছন্দের প্রার্থীকে দেশপ্রেমিক বা মহৎ হিসেবে উপস্থাপন করতে, কিংবা বিরোধীপ্রার্থীকে খলনায়ক বা দুষ্টু হিসেবে দেখাতে ব্যবহৃত হয়।
নির্বাচন, সংস্কার, ভোট, রাজনৈতিক দলগুলোর নাম ও নির্বাচনী প্রতীক ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কি-ওয়ার্ড ধরে ফেসবুক ও টিকটকে খুঁজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি নির্বাচনী প্রচারণাভিত্তিক এমন শতাধিক ভিডিও কনটেন্ট নজরে এসেছে ফ্যাক্টওয়াচের। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের বিভিন্ন অসঙ্গতি যাচাই, ডিপফেক ভিডিও যাচাইয়ের টুল হাইভ মডারেশন, ডিপফেক ও মিটার দিয়ে বিশ্লেষণ করে এসব ভিডিওর ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
কি আছে নির্বাচনী প্রচারণাভিত্তিক এসব কনটেন্টে
প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা
বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-২ আসন থেকে তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে চেয়ে ফেসবুকে গত ১৯ জুন ৫২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। “কেফায়েত উল্লাহ (আর্কাইভ)” নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা ভিডিওটি বুধবার (২৫ জুন) দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ৩ লাখ ২৪ হাজার বার দেখা হয়েছে। পোস্টটিতে রিয়েকশন পড়েছে ২৭ হাজার।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, কৃষক, দিনমজুর, নৌকার মাঝি, মুদি দোকানদার, গৃহিণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়াকে কেন এই আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চান- এ নিয়ে মতামত দিচ্ছেন। ভিডিওটি ডিপফেক ও মিটার দিয়ে যাচাই করে দেখা যায়, এটির এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ। ভিডিওটিতে veo লেখা একটি জলছাপ দেখা যায়।


Veo হল গুগল ডিপ মাইন্ডের উন্নত একটি এআইভিত্তিক টেক্সট‑টু‑ভিডিও জেনারেশন মডেল, যা এখন সর্বশেষ Veo 3 সংস্করণ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই মডেলটি লেখা (prompt) পড়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও তৈরি করে।
অর্থাৎ এটি গুগলের এআই মডেল ভিও মডেলের সাহায্যে তৈরি। তবে পোস্টটির কমেন্টবক্সের ৫ শতাধিক কমেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, খুব কমেন্টই রয়েছে, যারা বলেছেন এটি এআই দিয়ে তৈরি।
এমন প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা দেখা যায় অন্যান্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের পক্ষে কুমিল্লা-১১ আসন থেকে ভোট চেয়ে গত ২৩ জুন একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। এতে দেখা যায়, কাঁচা বাজারে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করছেন, কুমিল্লা-১১ আসনে ভোট কাকে দিব? (আর্কাইভ) এই প্রশ্নের উত্তরে আরেক দল লোক বলছেন, “আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিব, ইনশাআল্লাহ।” এই ভিডিওটিও এআই দিয়ে তৈরি।
ভোট বা মনোনয়ন চেয়ে আরও যেসব ব্যক্তিদের নিয়ে এমন প্রচারণা পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে আছেন- জামায়েত ইসলামীর প্রার্থী কুমিল্লা-১০ আসনের মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত, চাঁদপুর-৪ মাওলানা বিল্লাল হোসাইন মিয়াজি, চট্টগ্রাম-১৫ শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী, ফেনী-৩ ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, কুমিল্লা-৯ ড. সৈয়দ সরওয়ার উদ্দিন সিদ্দিকী, কুষ্টিয়া-২ (ভেড়ামারা- মিরপুর) আসন থেকে বিএনপির ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী, কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মোঃ কামরুল হুদা, সিলেট-২ আসনে বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সিলেট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিনী তাহসিনা রুশদীর লুনা, যশোর-৪ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও কৃষক দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব, সাতক্ষীরার তালা-কলোরোয়া আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ, সিলেট-৫ আসনের বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন), রংপুর-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আমীর এটিএম আজম খান, যশোর-৩ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আসলাম চৌধুরী, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব ফকির মাহবুব আনাম স্বপন, খুলনা-২ আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু, কুমিল্লা-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. মোবারক হোসাইন, নরসিংদী-৪ আসনে বিএনপি নেতা বিএনপির সহ-স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, কুমিল্লা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, রাজশাহী-৪ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আবদুল বারী সরদার।
এসব প্রচারণা এই রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নিজেরাই চালিয়েছেন নাকি কোনো সমর্থক দ্বারা চালানো হয়েছে, সেটি এই প্রতিবেদনে যাচাই করা হয়নি। আবার এসব ভিডিওর কোনো কোনোটিতে এগুলো যে এআই দিয়ে তৈরি, তা উল্লেখ করতেও দেখা গেছে।
এ আই দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার ভিডিওতে নারী ও সংখ্যালঘুদের উপস্থিতি
চলতি মাসের শুরুতেই সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের দাবিতে ২৮ জুন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই সমাবেশের প্রচারণায় টিকটকে গত ১৭ জুন “২৮ জুনের মহাসমাবেশ – ইসলামের ডাকে সম্প্রীতির জয় (আর্কাইভ)” ক্যাপশনে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়।


ভিডিওটিতে দেখা যায়, পাঞ্জাবি টুপি পরিহিত এক তরুণ বয়স্ক এক ব্যক্তিকে বলছেন, “দাদা, ২৮ তারিখ ঢাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসমাবেশের দাওয়াত রইলো। আইলে খুশি হমু।” উত্তরে রুদ্রাক্ষ মালার সদৃশ মালা পরিহিত ওই বয়স্ক ব্যক্তি বলেন, “আইচ্ছা বাবা, চেষ্টা করমু।”
ভিডিওটির ক্যাপশন ও উপস্থাপনা থেকে অনুমেয়, এখানে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
“সবার মুখেই জামায়াতে ইসলামী আলহামদুলিল্লাহ! (আর্কাইভ)” ক্যাপশনে টিকটকে চলতি মাসের মাঝামাঝিতে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, এক নারী উপস্থাপিকা মাথায় সিঁদুর পরিহিত এক নারীকে জিজ্ঞাসা করছেন, “দিদি, এবার ভোট কাকে দিবেন?” উত্তরে ওই নারী বলেন, “সব দলকেই তো দেখা হলো, এবার জামায়াতকে সুযোগ দেওয়া দরকার।”
“কেন আপনি জামায়াতকে ভোট দিবেন। (আর্কাইভ)” এমন ক্যাপশনে ফেসবুকে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী গার্মেন্টস কর্মী কাজ করতে করতে বলছেন, “আমার ঘামের কোনো দাম নেই, আমি মর্যাদার সাথে একটি জীবন চাই। সেজন্যই আমার ভোট জামায়াতকে।”
ফেসবুকে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওটিতে দেখা যায়, একদল তরুণী মাঠে বসে নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। (আর্কাইভ) তারা বলছেন, সামনে নির্বাচন। কাকে ভোট দিব? এই সময় তাদের মধ্যে থাকা এক তরুণী বলছেন, “সব দলকে দেখা হয়েছে। এবার জামায়াতের দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিব।” এরপর সবাই সমস্বরে বলছেন, ঠিক।
একই ধরনের একটি ভিডিও প্রচার হতে দেখা যায় টিকটকে। এই ভিডিওতে দেখা যায়, চারজন তরুণী রেস্টুরেন্টে বসে নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন (আর্কাইভ)। তাদের মধ্যে দুইজন বলছেন, “আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা দেশকে উন্নত করবেন, দুর্নীতি মুক্ত করবেন। আর তাই এবারের ভোট দাঁড়িপাল্লায় হোক।”
যাচাইয়ে দেখা যায়, এই সবগুলো ভিডিওই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি।
এআই ভিডিওতে দলীয় প্রচারণা
নির্বাচন ঘিরে এআই দিয়ে যে কেবল ব্যক্তি কেন্দ্রিক প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা নয় বরং এমন অনেক ভিডিও পাওয়া যায়, যেগুলোতে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দলীয় প্রচারণাও চালানো হয়েছে। এমন ভিডিও প্রচারণার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে দলীয় প্রতীক, বিভিন্ন ট্যাগ লাইন ও কর্মসূচি যেমন, বিএনপির ৩১ দফা কেন্দ্রিক প্রচারণা, বিভিন্ন স্লোগান, যেমন, “তরুণদের প্রথম ভোট, ধানের শীষের পক্ষে হোক”, “শান্তি, ন্যায়ের মার্কা, দাঁড়িপাল্লা”, “তারুণ্যের প্রথম ভোট, এনসিপির হোক”, “এবারের ভোট দিব শান্তির প্রতীক হাতপাখায়”, “তরুণ প্রজন্মের প্রথম ভোট, দাঁড়িপাল্লার পক্ষে হোক”, “সব দলকে দেখা হয়েছে, এবার জামায়াতকে সুযোগ দেওয়া উচিত”, “ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক দেশ গঠনের লক্ষ্যে, এবারের নির্বাচনে আমি ভোট দিব ইসলামের পক্ষে”, “সব মার্কা দেখা শেষ, ট্রাক মার্কার বাংলাদেশ”, “এতদিন অনেক তন্ত্র দেখেছি, এবার ইসলামী আন্দোলনকে দেখতে চাই” ইত্যাদি।
দলীয় প্রচারণার এমন একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক রিকশাচালক রিকশায় বসে ঘাম মুছছিলেন। এ সময় এক নারী উপস্থাপিকা এসে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি আসন্ন নির্বাচনে কাকে ভোট দিবেন? উত্তরে রিকশাচালক বলেন, “ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিব, ইনশাআল্লাহ।”


ভিডিওটি (আর্কাইভ) গত ১৯ জুন তানভীর কবির নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়। ডিপ ফেক শনাক্তের টুল দিয়ে এটি যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি।
টিকটকে (আর্কাইভ) প্রচারিত আরেকটি ভিডিওটিতে দেখা যায়, এক কাপল হাটতে হাটতে একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করছেন, “তোমার এলাকার তরুণ প্রজন্মের ভোট এবার কার পক্ষে যাবে?” উত্তরে আরেকজন বলছেন, “তরুণ প্রজন্মের ভোট, এবার ধানের শীষের পক্ষে যাবে।”
একই প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, এনসিপির (আর্কাইভ) ব্যানার পেছনে রেখে এক ব্যক্তি বলছেন, “আগামী নির্বাচন দেশ পরিবর্তনের নির্বাচন, তাই আপনার রায় শাপলা প্রতীকে হোক।”
প্রসঙ্গত, নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি নির্বাচন কমিশনে তাদের দলীয় প্রতীক হিসেবে শাপনা চেয়ে আবেদন করেছে।
টিকটকে (আর্কাইভ) প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বয়োবৃদ্ধ ও এক তরুণ মুখোমুখি বসে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়া প্রসঙ্গে কথা বলছেন। কথা প্রসঙ্গে দুইজনেই সম্মত হন যে, তারা গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক মার্কায় ভোট দিবেন।
ফেসবুকের আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন আলেম সমাবেশে বক্তৃতা দিচ্ছেন। এ সময় তিনি বলছেন, “সবাই শুনুন, এবার আমরা মামুনুল হকের সাহেবের রিকশা মার্কায় ভোট দিব ইনশাআল্লাহ (আর্কাইভ)।”


ভিডিও চারটিতেই গুগল ডিপ মাইন্ডের এআইভিত্তিক টেক্সট‑টু‑ভিডিও জেনারেশন মডেল ভিওর জলছাপ রয়েছে। অর্থাৎ এগুলো এআই দিয়ে তৈরি। টুলের বিশ্লেষণেও একই ফলাফল পাওয়া যায়।
মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ কোনঠাসা হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব প্রচারণায় আওয়ামী লীগের উপস্থিতি দেখা যায়। যেমন, একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুইজন ব্যক্তি চা খেতে খেতে ভোট নিয়ে কথা বলছেন। কথার এক পর্যায়ে বলছেন, নৌকা না থাকলে তারা ভোট দিবেন না (আর্কাইভ)। নির্বাচন বয়কট করবেন। টিকটকে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক রিকশাচালক বলছেন, আওয়ামী লীগ না এলে তিনি ভোট দিবেন না (আর্কাইভ)।
টুলের বিশ্লেষণ ও ভিডিওগুলো পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এসব এআই দিয়ে তৈরি।
নির্বাচন বিরোধী প্রচারণা
গত ১২ জুন “এফ এফ ভিডিও (আর্কাইভ)’’ নামের একটি পেজ থেকে “আপনি কি দেশে নির্বাচন চান’’-ক্যাপশনে একটি এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটিতে এআই দিয়ে তৈরি এক নারী চরিত্র আরেক বয়স্ক চরিত্রকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি এই মুহুর্তে নির্বাচন চান কিনা? চরিত্রটি উত্তরে বলেন, “আমার পেটে ভাত নেই। আমাকে ভাত দেন, নির্বাচন না।” এই ভিডিওটির ভিউ ইতিমধ্যে ১০ লাখ ছাড়িয়েছে, শেয়ার হয়েছে ১০ হাজার। ভিডিওটি যে এআই দিয়ে তৈরি, তার কোনো ডিসক্লেইমার দেওয়া হয়নি। ফেসবুক, টিকটকে এ ধরনের ভিডিও, ছবির ক্ষেত্রে এআই লেবেল ব্যবহারের ফিচার রয়েছে।
একই ধরনের একটি ভিডিও পাওয়া যায় টিকটকেও। গত ২২ জুন আপলোড করা ভিডিওটিতে (আর্কাইভ) দেখা যায়, এক নারী উপস্থাপিকার প্রশ্নে আরেক নারী বলছেন, তিনি এই মুহুর্তে দেশে নির্বাচন চান না। তিনি ইউনূস সরকারকে (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) আরও ক্ষমতায় দেখতে চান। যদিও ভিডিওটিতে এআই লেবেল যুক্ত করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় এআই দিয়ে তৈরি এসব ভিডিওর প্রভাব কি হতে পারে
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হানি ফরিদ এনপিআরকে বলেন, এ ধরনের ভিডিও নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত না করলেও মানুষের চিন্তাভাবনাকে ক্রমশ প্রভাবিত করতে পারে। এসব আধেয় মানুষকে নির্দিষ্ট একটি ন্যারেটিভের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রে সবার অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ক্যাম্পেইন লিগ্যাল সেন্টার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্বাচনকে কিভাবে প্রভাবিত করে এবং এর থেকে বাঁচার করনীয় সম্পর্কে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এআই একইসঙ্গে নির্বাচন প্রশাসনকে দুর্বল করার বা নির্বাচন ফলাফল নিয়ে অযৌক্তিক সন্দেহ সৃষ্টির জন্য দুষ্ট উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। এই প্রযুক্তি সহজেই ভুয়া ছবি, ভিডিও ও মিথ্যা প্রমাণ তৈরির জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে—যেমন ব্যালট পেপার নকল করা বা ছিঁড়ে ফেলার ভিডিও। এর ফলে শুধু জনগণের নির্বাচনের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং এটি পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে জনরোষ এবং সহিংস হুমকিও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া মিডিয়া ইতিমধ্যেই আর্জেন্টিনা ও স্লোভাকিয়ার মতো বড় বড় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে ব্যবহৃত হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে করনীয় কি? যেহেতু এআই একটি বাস্তবতা এবং একে অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই এআই দিয়ে কনটেন্ট প্রচারের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই লেবেল ব্যবহার বা ডিসক্লেইমার দেওয়া। নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে নির্বাচনী আচরণ বিধিতে এআইয়ের ব্যবহার বিধি অন্তর্ভুক্ত করা।
ক্যাম্পেইন লিগ্যাল সেন্টার জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্য দেশটির ২০২৪ সালের নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।এর মধ্যে আছে, নির্বাচনী প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হলে ভোটারদের তা জানাতে বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা প্রদর্শনের বিধান থেকে শুরু করে, রাজনৈতিক ডিপফেইক নিষিদ্ধ করার আইনসহ বিভিন্ন প্রস্তাব ও বিল পাস বা উত্থাপন করা হয়েছে। দেশটিতে নির্বাচনের সময় জো বাইডেনের এআই অডিও প্রচার করায় এক ডেমোক্রেটিক রাজনৈতিক পরামর্শক ৬ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করে দেশটির ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন। এমন কি তার নিউ হ্যাম্পশায়ারে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়।
No Factcheck schema data available.
অন্যান্য বিষয়















