সম্প্রতি ফেসবুকে বেশ কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এসব ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন কারখানায় অভিযান চালাচ্ছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম সদৃশ পোশাক পরিহিত কয়েকজন ব্যক্তি। এসবের মধ্যে আছে কৃত্রিমভাবে প্লাস্টিকের ডিম তৈরির কারখানায় অভিযান, কৃত্রিমভাবে কেমিক্যাল মিশ্রিত দুধ তৈরির কারখানায় অভিযান, প্লাস্টিকের চাল তৈরি করে বাজারজাত করার সময় হাতেনাতে ধরার দৃশ্য ইত্যাদি। যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, সেনাবাহিনীর কথিত অভিযানের এসব দৃশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি।
কৃত্রিমভাবে প্লাস্টিকের ডিম তৈরির কারখানায় কথিত অভিযান
১৬ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম সদৃশ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি ক্যামেরায় বলছেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, আমরা এই কারখানায় অভিযান পরিচালনা করছি। যেখানে কৃত্রিমভাবে প্লাস্টিকের ডিম তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছিল। আমরা খবর পেয়ে অপরাধীকে আটক করেছি। এই অপরাধীকে কি শাস্তি দেওয়া যায়?’
ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু অসঙ্গতি নজরে আসে। যেমন, সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম সদৃশ পোশাক পরিহিত ব্যক্তিদের চেহারা অস্পষ্ট ও বিকৃত, কণ্ঠস্বরও অনেক বেশি যান্ত্রিক। ভিডিওটিতে যেসব বাংলা টেক্সট দেখা যাচ্ছে, সেগুলোও স্পষ্ট নয় ও বিকৃত। এসব অসঙ্গতি এআই জেনারেটেড কনটেন্টে দেখা যায়।
এই কারণে ভিডিওটি একাধিক এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুলের সাহায্যে যাচাই করে দেখা হয়। এর মধ্যে গুগলের এআই শনাক্তকারী টুল সিন্থ আইডি ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, এটির অডিও ও ভিজ্যুয়াল গুগল এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদনা করা হয়েছে।
আরেকটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশনও ভিডিওটি ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ এআই জেনারেটেড বলে জানিয়েছে।
ভিডিওটি ‘লাইফ অব হিরোজ‘ নামে একটি পেইজ থেকে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হতে দেখা গেছে। এখান থেকে ভিডিওটি আজ বুধবার (১১ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত ৮৮ হাজার শেয়ার হয়েছে, ভিউ প্রায় ৯৭ লাখ। পেইজটি ঘুরে দেখা যায়, এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে প্রতিনিয়ত এআই জেনারেটেড কনটেন্ট প্রচার করা হয়। পেইজটির ইন্ট্রোতেও উল্লেখ করা হয়েছে, পেইজটির সকল ভিডিও এআই দ্বারা তৈরি এবং শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য।
প্রসঙ্গত, প্লাস্টিকের ডিম বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপীই বহুল আলোচিত একটি মিথ। দীর্ঘদিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্লাস্টিক ডিম সম্পর্কে নানা গুজব, প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বৈজ্ঞানিকভাবে নকল ডিম বানানোর পক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো যুক্তি পাওয়া যায়নি, বরং বিভিন্ন সময়ে বিজ্ঞানীরা এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন।
যেমন, ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (এফএসএসএআই) ওয়েবসাইটে ২০১৮ সালে দেওয়া একটি নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ভোক্তারা নকল বা প্লাস্টিকের ডিম নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্লাস্টিকের ডিম বা কৃত্রিম ডিমের ধারণাটির কোনো ভিত্তি নেই। প্রকৃতপক্ষে এমন কোনো প্রযুক্তি নেই, যা পুরোপুরি একটি প্রাকৃতিক ডিমের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ আরেকটি কৃত্রিম ডিম তৈরি করতে পারে।
এমন একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক সেনা সদস্য কারখানা সদৃশ একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, আমরা এই কারখানায় অভিযান পরিচালনা করছি। এখানে কৃত্রিমভাবে প্লাস্টিকের চাল তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছিল।’
এই ভিডিওটিও পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু অসঙ্গতি নজরে আসে। যেমন, সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম সদৃশ পোশাক পরিহিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর অনেক বেশি যান্ত্রিক। ভিডিওটিতে দৃশ্যমান সেনা সদস্যদের চলাফেরা অস্বাভাবিক। কোথাও কোথাও অস্বাভাবিকভাবে হুট করেই তাদের হাতে কাগজ দেখা যায়। পাশাপাশি তাদের চেহারাও বিকৃত। ভিডিওটিতে যেসব বাংলা টেক্সট দেখা যাচ্ছে, সেগুলোও স্পষ্ট নয় ও বিকৃত।
এসব কারণে ভিডিওটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুলের সাহায্যে যাচাই করে দেখা হয়। গুগলের সিন্থ আইডি, হাইভ মডারেশনের মতো টুলগুলো ভিডিওটিকে এআই জেনারেটেড হিসেবে শনাক্ত করেছে।
প্রসঙ্গত, প্লাস্টিকের ডিমের মতো প্লাস্টিকের চালও বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত একটি গুজব। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্লাস্টিকের তৈরি চালের গুজব ছড়িয়েছে।
বিবিসি নিউজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১০ সাল থেকে প্লাস্টিকের চাল সম্পর্কিত গুজবটি ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় চীনে এই গুজবের সূত্রপাত। সেখানে গুজব ছড়ায়, যে প্লাস্টিকের চাল তৈরি হচ্ছে এবং তা সাধারণ চালের মধ্যে মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
আরবান লিজেন্ড যাচাইয়ের জন্য বিখ্যাত স্নুপসসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, প্লাস্টিকের চাল নামে কোথাও কিছু নাই। আবার প্লাস্টিকের চাল উৎপাদনও ব্যবসায়িকভাবে লাভবান নয়।
প্লাস্টিকের চাল উৎপাদন কতটা সাশ্রয়ী এই সংক্রান্ত অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্লাস্টিক চালের চেয়ে অনেক দামী। এ বিষয়ে বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের উর্ধতন যোগাযোগ কর্মকর্তা কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন বলেন, বাজারে এক কেজি চাল প্রকারভেদে ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকা। আর এক কেজি প্লাস্টিকের দাম কত? ইন্টারনেট ঘেটে দেখলাম মোটামুটি নিম্নমানের কেজি প্লাস্টিকের দাম কোনো অবস্থাতেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকার কম না।…এই অবস্থায় ক্রেতা কিভাবে সেটা ৫০ টাকা কেজিতে কিনতে পারবেন?
সার্বিক বিবেচনায় ফ্যাক্টওয়াচ এসব ভিডিওকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে।
Claim: প্লাস্টিকের ডিম তৈরির কারখানায় সেনাবাহিনীর অভিযান, হাতেনাতে আটক এক ব্যক্তি..!
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh