পুরান ঢাকার মিডফোর্ডের সামনে এক ব্যবসায়ীকে হত্যার ঘটনায় অনলাইন-অফলাইনে চলছে বিএনপির বিরুদ্ধে নানা প্রচারণা। এমন প্রচারণার মধ্যে ঢাকা, কুমিল্লা, ঝিনাইদহে বিএনপির কার্যালয়ে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ‘সাধারণ জনতা’ হামলা চালিয়েছে দাবিতে ফেসবুকে বেশ কিছু ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার ভিডিও উপরিউক্ত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে ঝিনাইদহে বিএনপির কার্যালয়ে হামলাটি গত বছরের ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের। কুমিল্লার ঘটনাটি বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের পদবঞ্চিতদের দ্বারা ঘটেছে এবং ঢাকার ঘটনাটি ছিল রেলওয়ের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে তোলা স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানের।
এই দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, গত ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কালীগঞ্জ শহরের থানা রোডস্থ বিএনপির কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় কার্যালয়ের আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুড়ে যায়।
ফেসবুকে সুলতান আল আনাম নামে স্থানীয় এক সাংবাদিকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও ২৩ আগস্টে দেওয়া এসব তথ্য সংবলিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে তার সঙ্গে ভিডিওটি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ভিডিওটি দেখে ফ্যাক্টওয়াচকে জানান, কালীগঞ্জে বিএনপির কার্যালয়ে আগুনের এই ভিডিওটি ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের।
ফ্যাক্টওয়াচের সঙ্গে সুলতান আল আনাম তার পরিচালনায় চলা সবুজ বাংলা টিভি নামের পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিও শেয়ার করেন।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বিএনপির এই কার্যালয়ে গত বছরের ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগ ভাঙচুর চালায়
ভিডিওটির ক্যাপশন থেকে জানা যায়, কালীগঞ্জ বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে হামলা-ভাংচুরের দাবিটি গুজব। প্রচার করা ভিডিওটি গত বছরের ৪ আগস্ট ২০২৪-এর। সম্প্রতি এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। শনিবার (১২ জুলাই) বিকেল ৬ টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত আছেন।
এ ছাড়া জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠে শনিবার (১২ জুলাই) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বিএনপির কার্যালয়ে ভাঙচুরের দাবিটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এটি থেকে জানা যায়, গত বছরের ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কার্যালয় পুড়িয়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা করেছিলেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।
বিএনপির কার্যালয় পোড়ানোর পুরনো ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, শনিবার (১২ জুলাই) বিকেলে ওই কার্যালয়ে দেখা যায়, ভবনটি নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। নেতাকর্মীরা অনেকে তখন সেখানে আড্ডা দিচ্ছিলেন।
অর্থাৎ ঝিনাইদহে বিএনপির কার্যালয়ে জামায়াত, শিবির-এনসিপির আগুন দেওয়ার দাবিটি মিথ্যা।
কুমিল্লার বিএনপি অফিসে জামায়াত-এনসিপি আগুন দেওয়ার দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি থেকে কিছু কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চে নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওটির মিল রয়েছে।
গত ১৮ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপি ও মহানগর কার্যালয়ে আগুন দিয়েছেন ছাত্রদলের দক্ষিণ জেলা ও মহানগর কমিটির পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। ওইদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে নগরের কান্দিরপাড় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে ওই কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দিয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয়। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ সময় পদবঞ্চিত ছাত্রদল নেতারা একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান।
গত মে মাসে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপি ও মহানগররের এ কার্যালয়ে আগুন দেয় ছাত্রদলের দক্ষিণ জেলা ও মহানগর কমিটির পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা
এ ছাড়া ১৭ মে যমুনা টিভির ইউটিউব চ্যানেলে (আর্কাইভ) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও ভাইরাল ফুটেজটি পাওয়া যায়। এ প্রতিবেদনেও ঘটনার একই বিবরণ অর্থাৎ কুমিল্লায় বিএনপির কার্যালয়ে আগুনের এ ঘটনার সঙ্গে পদবঞ্চিত ছাত্রদল কর্মীরাই জড়িত। ফলে এ দাবিটিও মিথ্যা।
প্রসঙ্গত, এই ভিডিওটি রাজধানীর পল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে হামলার দাবিতেও প্রচার হচ্ছে।
ফেসবুকে এ ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, এনসিপি ও শিবির মিলে ঢাকার খিলক্ষেত থানা বিএনপির প্রধান কার্যালয় ভেঙে দিচ্ছে। কিছু কিছু পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ‘সাধারণ জনতা’ বুলডোজার দিয়ে এই কার্যালয় গুড়িয়ে দিয়েছে।
দাবিগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। গত ২৭ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে খিলক্ষেত রেলগেট পর্যন্ত রেললাইনের দুপাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা দুইশোর মতো স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। উচ্ছেদ হওয়া স্থাপনার মধ্যে একটি স্থানীয় বিএনপি ও একটি জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয় ছিল। এই অভিযানে সেনাবাহিনী, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) ও পুলিশ অংশ নেয়।
এ ছাড়া ফেসবুকে প্রচারিত দাবিগুলোতে নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪-এর একটি ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার করতে দেখা যায়। এই সূত্রে নিউজ পোর্টালটির ইউটিউব চ্যানেলে (আর্কাইভ) গত ২৬ জুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, এটি যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান চলাকালের ভিডিও।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সানের বাংলা সংস্করণের (আর্কাইভ) ইউটিউব চ্যানেলে ২৬ জুন প্রকাশিত একটি ভিডিওতেও ঘটনাটি সম্পর্কে একই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ এ ঘটনার সঙ্গেও শিবির-এনসিপি বা কোনো ‘সাধারণ জনতা’র সম্পৃক্ততা নেই। ফলে এ দাবিটিও মিথ্যা।
ফ্যাক্টওয়াচের সিদ্ধান্ত
সার্বিক বিবেচনায় ফ্যাক্টওয়াচ ওপরে যাচাইকৃত তিনটি দাবিকেই মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে।
Claim: ঢাকা, কুমিল্লা, ঝিনাইদহে বিএনপির কার্যালয়ে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ‘সাধারণ জনতা’ হামলা চালিয়েছে দাবিতে ফেসবুকে বেশ কিছু ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh