ধামরাইয়ে মুসলিম গৃহবধূ ধর্ষণের খবরটি অপ্রমাণিত
রাজধানী ঢাকার ধামরাইয়ে বেড়াতে গিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক গৃহবধু-এমন একটি অভিযোগ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, ওই গৃহবধূ মুসলিম, তিনি তার স্বামীসহ ওই এলাকার এক হিন্দু বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়নের রামরাবন এলাকায় শান্তি মনি দাস নামে এক নারীর বাড়িতে এই ঘটনাটি ঘটে। বিষয়টি কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে গত শনিবার (১৭ জানুয়ারি) থেকে।
ভাইরাল হওয়া খবরে বলা হয়, মানিকগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ও ধামরাই উপজেলার পারাবাড়ির একটি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক আব্দুর রাজ্জাক তার স্ত্রীকে নিয়ে বালিয়াটি গ্রাম ঘুরতে যান। তাদের সঙ্গে ছিলেন ওই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী কৃষ্ণচন্দ্র মনি দাস। ঘোরাফেরা শেষে সন্ধ্যার দিকে তারা কৃষ্ণচন্দ্র মনি দাসের বাড়িতে বেড়াতে যান। পরে তাদের রাতযাপনের জন্য কৃষ্ণচন্দ্র মনি দাসের বোন শান্তি রাণী দাসের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ১২টার দিকে পাঁচ-সাতজন যুবক চাপাতি ও রামদা নিয়ে এসে স্বামীকে রশি দিয়ে বেঁধে তার স্ত্রীকে রাতভর ধর্ষণ করে।
অভিযোগটি সংবাদমাধ্যমগুলোতে এসেছেও বেনামি সূত্রে, কিন্তু শিরোনামে এই অভিযোগটিকেই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, যেন ঘটনাটি প্রমাণিত। যেমন, ‘ধামরাইয়ে বেড়াতে এসে ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ’। আবার কোনো কোনো মিডিয়ার শিরোনাম সরাসরি সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়। যেমন, বার্তাবাজার নামে একটি অনলাইন পোর্টাল শিরোনাম দিয়েছে, ‘হিন্দু বাড়িতে বেড়াতে এসে মুসলিম গৃহবধূ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার’।


এই অভিযোগটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আমার দেশ, দেশ রূপান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন, যুগান্তর, বার্তাবাজার, চ্যানেল আইসহ স্থানীয় বেশকিছু নিউজ পোর্টাল।


সংবাদমাধ্যমের এসব খবর ফেসবুকে ব্যাপকভাবে প্রচারও হচ্ছে। এসব পোস্টেও সাম্প্রদায়িকতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। আবার এই ঘটনার সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনকে যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। যেমন, মীর জাহান নামে একজন লিখেছেন, ‘এই ঘটনা নিয়ে মিডিয়াতে কোন হেডলাইন নেই, বিএনপি চুপচাপ থাকবে খুবই স্বাভাবিক, কারণ এটা ভারতের দল আবার সামনে নির্বাচন। জামায়াতে ইসলামীও কথা বলবে না। কারণ, মুসলমানদের চেয়ে হিন্দুদের ভোট তাদের বেশি দরকার।’
আহমেদ রাকিব নামে একজন লিখেছেন, ‘সম্প্রতি ভয়াবহ দুইটা নৃশংস ধর্ষণের ঘটনা ঘটল, দুইটাই হিন্দু মালাউনরা করছে! মিডিয়া ও এলিট সুশীলরা চুপ!…পরপর হিন্দু কর্তৃক ধর্ষণ হচ্ছে মুসলিম মেয়েরা, এর আগেও আশা মনিকে ধর্ষণ করা হয়ছে, উল্লেখযোগ্য কোনো বিচার মুসলিমরা পাইনি! ঘটনাগুলো সুপরিকল্পিত হচ্ছে। এ নিয়ে মুসলিমরা বিক্ষুব্ধ হলে, (উগ্রবাদীর উত্থান) হেডলাইন দিয়ে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া ন্যারেটিভ বিল্ডাব করবে!সংখ্যালঘু বলে সিম্পেথির স্লোগান তুলবে।’
এমন প্রেক্ষাপটে ফ্যাক্টওয়াচ থেকে ধামরাইয়ের একাধিক স্থানীয় সাংবাদিক ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
এর মধ্যে বাংলাদেশ বুলেটিনের স্থানীয় প্রতিনিধি সুমন আহমেদ ফ্যাক্টওয়াচকে জানান, ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটে নাই। তারা যতটুকু জানতে পেরেছে, চার-পাঁচজন মিলে ওই ঘরে ঢুকে তাদেরকে মারধর করে টাকা-পয়সা, মোবাইল, স্বর্ণ হাতিয়ে নিয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে কথিত ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে বিচার চাওয়া এবং এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ভুক্তভোগী নারী ও তার স্বামীকে লাঠিপেটা করে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার ব্যাপারে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটিও মিথ্যা।
একই প্রসঙ্গে জানতে বেসরকারি সম্প্রচার মাধ্যম আরটিভির স্থানীয় প্রতিনিধি রাজিউল হাসান পলাশের সঙ্গেও কথা হয় ফ্যাক্টওয়াচের।
তিনি জানান, “আমাদের প্রাপ্ত অনুসন্ধান অনুযায়ী, আমরা জানতে পেরেছি, দম্পতি পরিচয়ে দুজন এখানে ঘুরতে এসেছিল। তবে আমাদের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তারা দম্পতি কিনা এটাও সন্দিহান। আমরা এই দম্পতির স্বামী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, এখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ফলে ধর্ষণের অভিযোগটি অপ্রমাণিত। সর্বোপরি, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি ওখানে একটা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে এবং সেটা নিশ্চিত।”
ঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিক (জেলা প্রতিনিধি, সাভার) আরিফুল ইসলাম সাব্বিরের মাধ্যমে সরেজমিনে খোঁজ নেওয়া হয়। তার বর্ণনায় এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলটি সাটুরিয়া-কাওয়ালীপাড়া সড়কের সাটুরিয়াগামী সড়ক থেকে বাম দিকে রামরাবন এলাকায়। ওই এলাকায় পাকা সড়ক থেকে বাম দিকে কাঁচা সড়কের প্রায় ৩০০-৪০০ মিটার দূরে বামে এক কক্ষের টিনের ঘর। ওই বাড়িতে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এক কন্যাকে নিয়ে বসবাস করেন শান্তি মনি দাস। বাড়িটিতে একটি রান্নাঘর ও এটির পেছনে টিউবওয়েল ও বাথরুম।
ঘটনার দিন মেহমান আসায় তাদের থাকতে দিয়ে নিজে ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে ছিলেন শান্তি মনি দাস ও তার কন্যা। ঘটনার বিষয়ে পরদিন জানতে পারেন তিনি। পশ্চিমে একটি বাড়িতে থাকেন পরেশ রাজবংশী, উত্তর-পশ্চিমে ডানে অবস্থিত বাড়ির বাসিন্দা তাপস সাহা, চন্দ্র মোহন। পূর্বে কৃষি জমি, উত্তরে পতিত জমি, গাছপালা আছে। আর দক্ষিণে নেপাল চন্দ্র মনি দাসের বাড়ি। সেখানে কথা হয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে।
মধ্যরাতে ওই বাড়িতে মারধরের আওয়াজ পেয়ে বাড়িটিতে যান পাশের বাড়ির বাসিন্দা গৃহবধূ শিল্পী মনি দাস ও তার স্বামী নেপাল চন্দ্র মনি দাস। দুপুরে গিয়ে কাজে যাওয়ায় নেপাল চন্দ্র মনি দাসকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।
শিল্পী মনি দাস বলেন, রাত ১টার দিকে হঠাৎ মারামারির শব্দ শুনি, এসে দেখি কেউ নাই, শুধু তারা দুইজন ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। পরে ওই মহিলা বললো, তার কানের দুল, গহনা, টাকা, মোবাইল নিছে। আর কাউকে দেখিনি। কোনো বেঁধে রাখার চিহ্ন দেখিনি। প্রায় ৪-৫ মিনিট ধরে ঘটে এই ঘটনা।
মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা শুনে রাতেই ঘটনাস্থলে যান কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের চাচাতো ভাই বিকাশ চন্দ্র মনি দাস। তিনি বলেন, রাতের বেলা আমি আমার বাসায় শুয়ে ছিলাম। আনুমানিক রাত সাড়ে বারোটার দিকে আমার কৃষ্ণ দাদা ডাক দিয়ে আমাকে ওঠান।
তিনি জানান, পাশের বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। খবর শুনে আমরা দ্রুত ওই বাড়িতে যাই। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগে ও পরে দেখি, সেখানে ওই মহিলা কান্নাকাটি করছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, “ভাবি, কী হয়েছে? কেন কাঁদছেন?”
তখন তিনি বলেন, তার কাছে মোট ২২ হাজার টাকা ছিল। এর মধ্যে আগে ৫ হাজার টাকা খরচ করা হয়েছিল। বাকি প্রায় ১৭-১৮ হাজার টাকা চোরেরা নিয়ে গেছে। পাশাপাশি তার দুইটি কানের দুল, একটি নাকফুল এবং আরেকজনের একটি চেইন চুরি হয়েছে বলে জানান।
আমি আবারও তাকে জিজ্ঞেস করি, “আপু, কাঁদবেন না। আপনার স্বামীর কোনো পরিচিত মানুষ কি এসব নিয়ে গেছে?” তিনি বলেন, “না ভাই, আমার কোনো কিছু নেয়নি। তবে আমার স্বামীকে দুজন মারধর করে চলে গেছে।”
বিকাশ চন্দ্র মনি দাস জানান, ঘটনাস্থলে আমি কাউকে গাছে বেঁধে রাখা বা এ ধরনের কোনো আলামত দেখতে পাইনি। শুধু দেখেছি, তিনি ঘরের ভেতরে বসে কান্নাকাটি করছিলেন।
এ ঘটনার বিষয়টি পর দিন লোকমুখে জানতে পারেন স্থানীয় বালিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মন্টু চন্দ্র মনি দাস। তিনি বলেন, আমি বৃহস্পতিবার সকালে জানতে পারি একটা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এসে আমি কাউকেই পাইনি। আমার কাছে কেউই আসেনি। কোনো সহযোগিতাও চায়নি। যদি সহযোগিতা চাইতো, আমি অবশ্যই সহযোগিতা করতাম। তবে ওই সময় যারা উপস্থিত ছিল, বা পরে যারা এসেছে সবাই বলেছে, মালামাল নিয়েছে। আর কোনো ঘটনা ঘটেনি।
কি ঘটেছিল সেদিন
রামরাবন এলাকায় শান্তি মনি দাসের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, তার ভাই কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের সহকর্মী পরিচয়ে আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক নারী আসেন তার বাড়িতে। তাদের রাত্রিযাপন করতে দিয়ে বাড়ি ত্যাগ করে বাবার বাড়ি চলে যান। পরে সকালে তিনি এই ঘটনা জানতে পারেন।
সরেজমিনে রামরাবন এলাকায় গিয়ে কথা হয় সেই গৃহবধু ও আব্দুর রাজ্জাককে আতিথেয়তা দেওয়া কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস ও তার পরিবারের সঙ্গে।
কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস জানান, ওই দিন বিকেলের দিকে রাজ্জাক তার স্ত্রীসহ ঘুরতে আসবেন বলে জানান। বিকেল ৫টার দিকে রাজ্জাক রামরাবন এলাকায় আসেন। কৃষ্ণ মনি দাস তাদের দুজনকে তার ও তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যান। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাদের ঘুমানোর জন্য তার বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে বোনের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে রেখে তিনি নিজের বাড়ি চলে আসেন।
রাত দেড়টার দিকে রাজ্জাক এসে তাকে গহনা, টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার কথা জানান। এর পরিপ্রেক্ষিত কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস তার স্বজনদের নিয়ে বোনের বাড়ি যান। এরপর তিনি ওই ঘটনার বিবরণ শুনতে পান ওই নারীর কাছ থেকে।
কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস বলেন, রাজ্জাক ভাই ও আমরা দুইজন এনডিইতে কাজ করি। তারা আসার পর আমার বাড়িতে জায়গা না থাকায় তাদের আমার বোনের বাড়িতে থাকতে দেই। রাত ১০টার দিকে তিনি জানান, অচেনা একজন এসে তাদের পরিচয় ও সম্পর্ক জানতে চেয়েছে। তারা নিজেদের পরিচয় দেন। এরপর আবার রাত দেড়টার দিকে ৪-৫ জন এসে দরজা খুলতে বলে তাদের। দরজা খোলার পর রাজ্জাককে মারধর করে ও তার সঙ্গে থাকা নারীর গহনা, ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়।
‘মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া হয়, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি’-জানালেন ভুক্তভোগী স্বামী
একই কর্মস্থলে কাজের সুবাদে কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের সঙ্গে প্রায় দুই বছর ধরে পরিচয় হয় আব্দুর রাজ্জাকের। ঘটনার দিন তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক নারীকে নিয়ে কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের বাড়ি আসবেন বলে আতিথেয়তা চান রাজ্জাক। সন্ধ্যার দিকে তিনি রামরাবন আসেন। প্রায় দুই ঘণ্টা তার বাড়িতে বেড়ানোর পর শোয়ার জন্য তাদের নিজের বোনের বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। তাদের বোনের বাড়িতে রেখে বাড়ি ফেরেন কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস।
রাত দেড়টার দিকে ওই মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে বলে কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসকে জানান আব্দুর রাজ্জাক।
তিনি জানান, স্ত্রীকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকার সময় রাত ১০টার দিকে একজন অপরিচিত ব্যক্তি এসে তাদের দুজনের পরিচয় ও সম্পর্ক জিজ্ঞেস করেন। জবাব দিলে তিনি সেখান থেকে চলে যান। রাত দেড়টার দিকে আবারও পাঁচজন ব্যক্তি এসে দরজা খুলতে বলে। এরপরই তাদের মালামাল ছিনিয়ে নেয় তারা।
আব্দুর রাজ্জাক জানান, আমার স্ত্রী বালিয়াটি রাজবাড়ি বেড়াতে আসেন। বিকেলের দিকে আমিও যাই। এরপর আমি রাতে থাকা যাবে কিনা, সেজন্য যোগাযোগ করি কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের সঙ্গে। এরপর আমরা রামরাবন আসি। তার বাড়ি আসার পর রাতে তার বোনের বাড়িতে ঘুমাতে যাই। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এক যুবক এসে দরজা খুলতে বলে। আমার স্ত্রী বলল, দরজা খুলে দিন, আমরা তো চোর নই। আমি দরজা খুলে দেই। এরপর তারা আমাদের পরিচয় ও সম্পর্ক জিজ্ঞেস করে। আমরা বলার পর সে চলে যায়।
তিনি আরও জানান, রাত দেড়টার দিকে পাঁচজন লোক আবারও এসে দরজা খুলতে বলে। দরজা খোলার পরই তারা বাইরের লাইট বন্ধ করে দেয়। এরপর চারজন ঘরে ঢুকে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করে ও আমার মানিব্যাগ থেকে ১৩০০ টাকা নেয়। আমার স্ত্রীর কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, তার কানের দুল, নাক ফুল, গলার স্বর্ণের চেইন ও ১৭ হাজারের মতো টাকা ছিনিয়ে নেয়। তারা আমাকে মারধর করে লাথি দেয়। এই ঘটনা আমাকে কাউকে জানাতে নিষেধ করে প্রায় পাঁচ মিনিট পর চলে যায়। পরে আমি পুরো ঘটনা কৃষ্ণ দা’কে জানাই। তবে ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত কাউকে চিনতে পারেননি উল্লেখ করে আব্দুর রাজ্জাক।
আব্দুর রাজ্জাককে ধর্ষণ ও বেঁধে মারধরের বিষয়ে প্রশ্ন করলে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।
তবে তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া নারীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি যোগাযোগ করাতে রাজি হননি।
রাজ্জাকের বাড়ি গিয়ে পাওয়া তার স্ত্রী ভুক্তভোগী নারী নন, খোঁজ মেলেনি সেই নারীর
গতকাল মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুরের দিকে বক্তব্য গ্রহণের পরপরই আব্দুর রাজ্জাক তার মুঠোফোন বন্ধ করে দেন। ওই নারীর বিষয়েও কোনো বক্তব্য তিনি দেননি।
এই বিষয়ে খোঁজ নিতে তার কর্মস্থল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (এনডিই) কর্মস্থলে গিয়ে জানা যায়, ঘটনার পর থেকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক।
এনডিইর স্টোর ইনচার্জ অশীষ কুমার জানান, ওই ঘটনার পর থেকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক। তার ফোনও বন্ধ। সবশেষ পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি কাজে আসছেন না বলে জানান। এদিকে কর্মস্থল থেকে পাওয়া তার ভোটার আইডি কার্ড সূত্রে তার গ্রামের বাড়ির ঠিকানা পাওয়া যায়। এই সূত্রে জানা যায়, তার বাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা এলাকায়।
সেখানকার স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে রাজ্জাকের স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন তিনি ধামরাইয়ের রামরাবন গ্রামে যাননি।
যা বলছে পুলিশ
মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শহীদুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। ওসি নাজমুল হুদা খান বলেন, সংবাদমাধ্যম ও সূত্রে পাওয়া খবর থেকে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছি। পরিদর্শনের সময় এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এখানে পালাক্রমে ধর্ষণ বা কোনো নারীর উপর যৌন নিপীড়নের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, যারা এই ঘটনা সংক্রান্ত অভিযোগ করতে চাইবেন, তারা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে ধর্ষণ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইউপি সদস্যের কাছেও বিচারপ্রার্থী হিসেবে কেউ কোনো অভিযোগ জানায়নি। কোনো লোককে বাধা দিয়ে বা অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখিত এসআই হারাধন নামে কোনো এসআই নেই বলে জানান ওসি। খোঁজ নিয়ে ধামরাই থানায় আরাধন চন্দ্র সাহা নামে একজন এসআই রয়েছে বলে জানা যায়। তিনি সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
এ ছাড়া ফ্যাক্টওয়াচ থেকে ধামরাই থানার কাওয়ালীপাড়া বাজার তদন্ত কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আলমের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। এই তদন্তকেন্দ্রটি ঘটনাস্থল থেকে ৫০০-৬০০ মিটার দূরে অবস্থিত।
নুরে আলম জানান, ধর্ষণের অভিযোগটি এখন পর্যন্ত গুজব। রাজ্জাক নামের ওই ব্যক্তি এক নারীকে স্ত্রী পরিচয়ে ঘুরতে এসেছিল। ওই নারী স্ত্রী কিনা তারা নিশ্চিত না।
তিনি আরও বলেন, এই দম্পতির দাবি, তাদেরকে মারধর করে টাকা ছিনতাই করা হয়েছে। পরে অন্যরকম গুজব ছড়ালো যে, স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে বলেও তিনি জানান।
এছাড়া তারা রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি কিন্তু তাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান। কেউ ধর্ষণের অভিযোগও করেনি বলে এই কর্মকর্তা বলেন।
ফ্যাক্টওয়াচের বক্তব্য
যেহেতু সরেজমিন অনুসন্ধানে ঘটনাটির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি, তাই কথিত ধর্ষণের এই ঘটনাটি এখন পর্যন্ত অপ্রমাণিত। ঘটনা সম্পর্কে আমাদের পাঠকদের কারোও কাছে কোনো তথ্য-প্রমাণ থাকলে সেগুলো আমাদের সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইলো। এছাড়া নতুন কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে এই প্রতিবেদনে নতুন করে সেগুলো সংযুক্ত করা হবে।
এই প্রতিবেদনটি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নতুন করে হালনাগাদ করা হয়েছে। (আপডেটের সময়: সময় ২১ জানুয়ারি, ২০২৬, রাত ১০টা ২০ মিনিট)।
No Factcheck schema data available.





