আফসার আলী নিউটনের গতিসূত্রকে ভুল ‘প্রমাণ’ করেননি, ‘দাবি’ করেছেন

268
আফসার আলী নিউটনের গতিসূত্রকে ভুল ‘প্রমাণ’ করেননি, ‘দাবি’ করেছেন
আফসার আলী নিউটনের গতিসূত্রকে ভুল ‘প্রমাণ’ করেননি, ‘দাবি’ করেছেন

পদার্থবিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন (জন্ম ১৬৪৩-মৃত্যু ১৭২৭) তার গতি সূত্রগুলোর জন্য বিখ্যাত । তার এই সূত্রগুলো বাংলাদেশের স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। সম্প্রতি পঞ্চগড়ের জনৈক আফসার আলী নিউটনের গতিসূত্রের কয়েক জায়গায় ভুল রয়েছে বলে দাবি করেছেন। আফছার আলী তার দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি, কেবলমাত্র তিনি কিছু তত্ত্বীয় ধারনা বা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, নিউটনের গতিসূত্র নিয়ে বোঝাপড়ায় আফসার আলীর ঘাটতি রয়েছে। তিনি এই সূত্রগুলোকে ভুল হিসেবে ‘প্রমাণ’ করার মত কিছু করতে পারেননি, কেবলমাত্র তিনি এদেরকে ভুল বলে ‘দাবি’ করেছেন। ফেসবুকে এমন দাবিকেই "ভুল প্রমাণ করেছেন" বলে উপস্থাপন করা এ সকল ফেসবুক পোস্টকে ‘বিভ্রান্তিকর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। এছাড়া এই আর্টিকেলে আমরা জানার চেষ্টা করবো নিউটনের গতিসূত্র এবং এর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে। বুঝার চেষ্টা করবো বিজ্ঞানে কোনো কিছু প্রমাণ করার উপায় আসলে কী?

গুজবের উৎস

আফসার আলীর এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিভিন্ন রকম শিরোনাম করেছে। যেমন –

ঢাকা মেইলে এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল – নিউটনের সূত্র নিয়ে প্রশ্ন আফসার আলীর, দাবি তৃতীয় সূত্র ‘কাল্পনিক’

বাংলাদেশ টাইমসের শিরোনাম নিউটনের সূত্র ভুল দাবি, সংশোধনের আহ্বান বাংলাদেশি যন্ত্রবিদের

নিউটনের সূত্র ভুল দাবি করলেন পঞ্চগড়ের আফসার- এমন শিরোনাম করেছিল দৈনিক কালবেলা এবং জনতার জাগরণ


অন্যদিকে ,কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম তাদের শিরোনামে নিউটনের সূত্রকে ভুল প্রমাণ করার সংবাদ দিয়েছে। নিউটনের সূত্র ভুল প্রমাণ করা কে এই পঞ্চগড়ের বিজ্ঞানী!- এমন শিরোনাম করেছে আমাদের সময়,নিউজ২৪বিডি,খবরের কাগজ,দৈনিক জনকণ্ঠ ইত্যাদি।

ফেসবুকে রোভার সোহেল রানা তার ভিডিওর ক্যাপশনে লিখেছেন- নিউটনের সূত্র ভুল প্রমাণ করলেন পঞ্চগড়ের এই বিজ্ঞানী  

‘জানা অজানা ভিডিও’ নামক পেজ থেকে এই বিষয়ক পোস্টের শিরোনাম- নিউটনের সূত্র ভু’ল প্রমাণ করলেন পঞ্চগড়ের বিজ্ঞানী! জ্বালানিবিহীন ইঞ্জিন আবিষ্কারে তো’লপাড়


এ ধরণের আরো কয়েকটি পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

অনুসন্ধান

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার আজিজনগর গ্রামের এই ব্যক্তির নাম আফসার আলী। পেশায় একজন যন্ত্রবিদ। বয়স ৬৫। তিনি ১৯৭৫ সালে জগদল হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। ঠাকুরগাঁও টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৯৭৮ সালে দুইবছর মেয়াদী একটি কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি চাকরিতে (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে) যোগদান করেন । বর্তমানে তিন ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি তেঁতুলিয়া উপজেলার আজিজ নগর গ্রামে বসবাস করছেন।

আফসার আলী দাবি করেছেন, নিউটনের গতির ৩টি সূত্রের মধ্যে কেবল দ্বিতীয়টি পরিপূর্ণভাবে সঠিক। প্রথমটি সঠিক হলেও অসম্পূর্ণ। আর তৃতীয় সূত্রটি কাল্পনিক যুক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।

প্রথম সূত্র নিয়ে তার মন্তব্য- “এই সূত্রে বাহ্যিক বল প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এই বাহ্যিক বল কোথায় থেকে আসবে বা কে প্রয়োগ করবে, তা ওই সূত্রে বলা নেই। এ জন্য আমি এটাকে অসম্পূর্ণ মনে করি।”

তৃতীয় সূত্র নিয়ে কালের কণ্ঠে তার প্রকাশিত বক্তব্যটি এরকম- “তিন নম্বর সূত্রটি যুক্তিমাত্র। প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি ঘর্ষণ, বাধা অথবা প্রতিক্রিয়া আছে। ঘর্ষণ, বাধা বা প্রতিক্রিয়া সমান হলে বস্তু স্থিতিবস্থা ফিরে পায়। এটি আমার ব্যাখ্যা।”

এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজে প্রকাশিত ভিডিও সাক্ষাৎকারে ৩ নাম্বার সূত্রের বিষয়ে তাকে বলতে শোনা যাচ্ছে, “বিজ্ঞানী নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রটা ভুল। এজন্য ভুল যে, ওখানে বলা আছে, ক্রিয়া আর প্রতিক্রিয়া বল সমান । কিন্তু যখন সমান হবে কিন্তু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সমান হলে বলের লব্ধি নিরপেক্ষ অর্থাৎ শূন্য হয়। অর্থাৎ, বল থেমে যাবে। ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া কিছুই হবেনা।এইরকম পরিস্থিতিতে বস্তু তো স্থির বা নিরপেক্ষ হয়ে যাবে ।

তার এই সাক্ষাৎকার শুনে বোঝা যাচ্ছে, তিনি নিউটনের তৃতীয় সূত্র বুঝতে ভুল করেছেন। এই সূত্রে ২ টা আলাদা বস্তুর উপরে প্রযুক্ত বলের কথা বলা হয়েছে। একই বস্তুর উপরে দুইটি বলের কথা বলা হয়নি।

১৬৮৭ সালে প্রকাশিত আইজ্যাক নিউটনের ‘ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা’ বইটা ল্যাটিন ভাষায় লেখা হয়েছিল। ল্যাটিন ভাষায় তার এই সূত্রটির রূপ ছিল এইরকম– ‘Actioni contrariam semper et æqualem esse reactionem: sive corporum duorum actiones in se mutuo semper esse æquales et in partes contrarias dirigi.’

যার ইংরেজি অনুবাদ ছিল- To every action there is always opposed an equal reaction; or the mutual actions of two bodies upon each other are always equal, and directed to contrary parts..

এর বাংলা অনুবাদ হতে পারে এরকম- প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া আছে। অন্য কথায়, দুটি বস্তু যখন একে অন্যের উপর বল প্রয়োগ করে, তখন বল দুটির মান সমান কিন্তু দিক পরস্পর বিপরীত হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে ২০১৭ সালের জন্য প্রকাশিত নবম-দশম শ্রেণীর পদার্থবিজ্ঞান বইয়ে এই সূত্রটিকে সরলীকৃত করে লেখা হয়েছে এভাবে, “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে । তবে এই সূত্রের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যখনই কোনো একটি বস্তুর উপর একটি বল প্রযুক্ত হয়, তখনই একটি সমমানের এবং বিপরীতমুখী বল অন্য একটি বস্তুর উপর ক্রিয়া করে……… লক্ষনীয় যে, ক্রিয়া বল এবং প্রতিক্রিয়া বল সব সময়ই দুইটি ভিন্ন বস্তুর উপর ক্রিয়া করে।



২০২৫ সালে এনসিটিবি থেকে প্রকাশিত পদার্থবিজ্ঞান বইয়ে সূত্রটি একটু ভিন্নভাবে লেখা হয়েছে এভাবে,

“যখন একটি বস্তু অন্য একটি বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করে তখন সেই বস্তুটিও প্রথম বস্তুটির ওপর বিপরীত দিকে সমান বল প্রয়োগ করে।”

এই সূত্রের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য “প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে”- এভাবে সূত্রটি লেখা হয়নি।

দেখা যাচ্ছে, এখানে সুস্পষ্টভাবে দুইটি আলাদা বস্তুর উপরে ক্রিয়াশীল বলের কথা বলা হয়েছে, একই বস্তুর উপরে নয়।

এমনকি এক পর্যায়ে এই বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, “যারা নতুন পদার্থবিজ্ঞান শেখে, তাদের প্রথম প্রশ্নই হয় যে যদি সকল ক্রিয়ার (কোনো একটি বল) একটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া (আরেকটি বল) থাকে তাহলে ক্রিয়া -প্রতিক্রিয়া একে অপরকে কাটাকাটি করে শূন্য হয়ে যায় না কেন!

ঠিক এই প্রশ্নটাই জেগেছে আফছার আলীর মনে। এবং সেই প্রশ্ন থেকেই তিনি দাবি করছেন, নিউটনের সূত্রই ভুল!

প্রকৃতপক্ষে নিউটনের সূত্র ভুল নয়। নিউটটনের সূত্রই আফসার আলী সাহেব বিস্তারিত বুঝতে পারেননি ।


বাংলাভিশনে প্রকাশিত তার ভিডিও সাক্ষাৎকার থেকে নিউটনের প্রথম সূত্র সম্পর্কে তাকে বলতে শোনা যায়, “নিউটনের প্রথম সূত্রে বলা হয়েছে, বাহ্যিক কোনো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে আর গতিশীল বস্তু সমবেগে চলতে থাকবে। আবার নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র থেকে বলা হয়েছে, এই মহাবিশ্বের প্রত্যেকটি বস্তুকণা একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। তাহলে তো, এই সূত্র দু’টো পরস্পরবিরোধী হয়ে গেল। কারন মহাবিশ্বে আমরা দেখছি ,সব বস্তুই হয় স্থির অথবা গতিশীল। কিন্তু নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী, সব স্থির বস্তুই তো মহাকর্ষ বলের প্রভাবে চলতে শুরু করবে। তাহলে তো আর ‘স্থির বস্তু স্থির’ থাকলো না।”

লক্ষনীয় যে, নিউটনের গতিবিষয়ক প্রথম সূত্রে ‘বাহ্যিক বল’ এর কথা বলা হয়েছে। মহাকর্ষ বলটা এই বাহ্যিক বলের অন্তর্ভুক্ত। জনাব আফসার আলী সম্ভবত এই মহাকর্ষ বলকে উপেক্ষা করে গিয়েছেন।

এছাড়া ,মহাবিশ্বে শুধুমাত্র ‘আকর্ষণ বল’ কাজ করেনা। গ্রহগুলো নক্ষত্রের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে কেন্দ্রবিমুখী বল লাভ করে। নিউটনের সূত্র অনুযায়ী, এই সকল বল যদি না থাকতো, তাহলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকতো আর গতিশীল বস্তু সমবেগে চলতে থাকতো।

নিউটনের গতি সূত্রগুলোর কি কোনো সীমাবদ্ধতা আছে?

হ্যা, আছে। অনেক বেশি গতিসম্পন্ন বস্তুর ক্ষেত্রে নিউটনের গতি সূত্র কাজ করেনা। এসব ক্ষেত্রে বস্তুগুলোর আচরণ ব্যাখ্যা করার জন্য আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সূত্র দরকার হয়।

এছাড়া অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণাগুলোর আচরণ ব্যাখ্যা করার জন্য কোয়ান্টাম মেকানিক্স দরকার হয়।

তবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে দৃশ্যমান সকল বস্তুগুলোর আচরণ ব্যাখ্যা করার জন্য নিউটনের গতিসূত্রগুলোই যথেষ্ট। জনাব আফসার আলী অতি ক্ষুদ্র কণা বা অনেক বেশি বেগে চলমান বস্তুর ক্ষেত্রে নিউটনের সূত্র ভুল দাবি করেননি, বরং তিনি সকল বস্তুর ক্ষেত্রেই এই দাবি করেছেন।

নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অনেক ভারি বস্তুর ক্ষেত্রে এই সূত্র অনুযায়ী সঠিক ফলাফল পাওয়া যায়না। যেমন- নিউটনের সূত্র থেকে সূর্যের চারদিকে বুধ গ্রহের কক্ষপথের যে বেগে ঘোরার কথা, গ্রহটি সেই বেগে ঘোরে না। সূর্যের খুব কাছে বলেই বুধ গ্রহের এই দশা। তেমনি খুব বড় নক্ষত্র, নিউট্রন স্টার, কৃষ্ণগহ্বর ইত্যাদির আশপাশে নিউটনের সূত্র ভুল তথ্য দেয়। এ সকল ক্ষেত্রে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা সূত্র দিয়ে এদের কার্যক্রম ব্যাখ্যা করা যায়।

জ্বালানিবিহীন ইঞ্জিন

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে , জনাব আফসার আলী দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানিবিহীন ইঞ্জিন আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে এসব মেশিন শতাব্দী-প্রাচীন একটা ধাঁধা। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন শতাব্দীতেই অনেক বিজ্ঞানী বা গবেষক এ ধরনের মেশিন তৈরি  করে জ্বালানি ছাড়াই শক্তি উৎপাদন করতে চেয়েছেন। এধরনের মেশিনকে বলে Perpetual Motion Machine । অনেকে Free Energy Machine ও বলেন একে। ভাস্করাচার্য থেকে শুরু করে রবার্ট বয়েল, কিংবা আধুনিক যুগের অনেকেই এ ধরনের ফ্রি এনার্জি মেশিনের আইডিয়ায় বিভ্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু মেশিন বানাতে গিয়ে দেখেছেন, তাদের মেশিন কাজ করছে না। অর্থাৎ এভাবে অবিরাম শক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

এসব মেশিনের ক্ষেত্রে তাপগতিবিদ্যার প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্র লঙ্ঘিত হয় । তাপগতিবিদ্যার ১ম সূত্র অনুযায়ী, সকল ক্ষেত্রে যেখানে তাপের মাধ্যমে কাজ সম্পাদন করা হয় সেখানে, গৃহীত তাপ কৃত কাজের সমানুপাতিক; বিপরীতভাবে, সমান পরিমাণের কাজ সমান শক্তি উৎপন্ন করে। কিন্তু পারপেচুয়াল মোশন মেশিন অনুযায়ী ইনপুট শূণ্য হলেও , আউটপুট (উদাহরনস্বরুপ) ৫০০ বা ১০০০ ওয়াট হবে, যেটা সম্ভব নয়।

তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরে সক্ষম এমন যন্ত্র নির্মাণ সম্ভব নয়। কিন্তু পারপেচুয়াল মোশন মেশিন এটাই দাবি করছে যে, একই পরিমান জ্বালানি সম্পূর্ণভাবে যান্ত্রিক শক্তিতে রুপান্তরিত হবে এবং একই প্রক্রিয়ার বারবার পুনারবৃত্তি হবে।

অর্থাৎ, এ ধরনের মেশিন বানানোর চেষ্টা কেবল পন্ডশ্রম হবে, এমন মেশিন বানানো সম্ভব হবেনা।  অতীতেও বাংলাদেশে অনেকে এমন মেশিন বানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন, কিন্তু কেউ সফল হতে পারেন নি।

এ বিষয়ে পড়তে পারেন ফ্যাক্টওয়াচের এই পুরনো নিবন্ধগুলি-

পেট্রোল বা জ্বালানি ছাড়াই গাড়ি চালানোর এই আইডিয়াটি বাস্তবে সম্ভব নয়

বিনামূল্যে বিদ্যুৎ তৈরির ভুয়া ভিডিও ভাইরাল

বিজ্ঞানে কোনো কিছু প্রমাণ করার উপায় কী ?

বিজ্ঞান মূলত কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে, যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে, গবেষক প্রথমে পর্যবেক্ষণ করেন, একটি অনুমান তৈরি করেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সেই অনুমান যাচাই করেন এবং অবশেষে সিদ্ধান্তে উপনীত হন। যদি প্রাথমিক অনুমানটাই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ঠিক প্রমাণিত হয়, তাহলে আর পরীক্ষা নিরীক্ষার দরকার নাই। কিন্তু প্রাথমিক অনুমানটি ঠিক না হলে, সেই অনুমানে একটু পরিবর্তন এনে এই প্রক্রিয়াটি বারবার পুনরাবৃত্তি করতে হবে।  এভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞানলেখক তৌহিদুর রহমান উদয় তার বিজ্ঞান যেভাবে কাজ করে শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছেন, “বিজ্ঞানের আওতাধীন কোনো একটি বিষয় নিয়ে গবেষণাকালে একজন বিজ্ঞানীকে অবশ্যই কতগুলো নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটা এমন এক আইন, যে আইন প্রতিটা গবেষক মানতে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মহাবিশ্বের কোনো একটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হলো যার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীদের অজানা, অথবা জানা থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন বিজ্ঞানী বিভিন্ন ধরনের হাইপোথেসিস বা অনুকল্প পেশ করতে পারেন। যোগ্যতাসম্পন্ন সব

গবেষকই এই স্বাধীনতা ভোগ করেন। তবে এই অনুকল্পগুলো দেওয়া হবে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের জানা নির্ধারিত আইনের ভিত্তিতে। এখন প্রত্যেক গবেষক তার অনুকল্প মোতাবেক আরো কিছু ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো যাচাই করে দেখবে এর সাথে জড়িত পরীক্ষণ পদার্থবিদগণ। যদি সেই পরীক্ষাগুলো অনুকল্পটিকে অযোগ্য বলে প্রমাণ করে, তবে সুযোগ থাকে পরিমার্জন করে সেটাকে আবার নতুনভাবে গড়ে তোলার। তবে সেটাকেও তত্ত্ব হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে পরবর্তী সব পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষায় সঠিক বলে প্রমাণিত হয়ে আসতে হবে। একজন বিজ্ঞানীর খ্যাতি, ক্ষমতা, অর্থ-বৈভব, মেধা ইত্যাদি কোনো কিছুই একটি অনুকল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই অনুকল্পটি পরীক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে। গাণিতিক যুক্তি ও অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার ইতিবাচক ফলাফল একটি অনুকল্পকে তত্ত্বের মর্যাদা দান করে।”


অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শামির মোন্তাজিদ তার এই লেখা বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে শীর্ষক নিবন্ধে কোনো কিছু প্রমাণ করার একট উপায় বাতলে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন,

ধরুন, আপনি একজন বিজ্ঞানী। আপনি জানতে চান যে, ধূমপান ও হৃদরোগের মাঝে কোন সম্পর্ক আছে কিনা। …… ধরুন, আপনি একদল মানুষ নিলেন যারা ধূমপান করে। তারা আপনার টেস্ট গ্রুপ। আবার, ধূমপান করে না এমন একদলকে নিতে হবে যাকে কন্ট্রোল গ্রুপ বলে। এরপর আপনি পরীক্ষা করে দেখলেন যে, ধূমপায়ীদের হৃদরোগ হচ্ছে। কিন্তু, অধূমপায়ীদের সেই রোগগুলো হচ্ছে না। তাহলে, বলা যাবে, ধূমপান হয়তো হৃদরোগের জন‍্য দায়ী। কোন কারণে যদি আপনার কন্ট্রোল গ্রুপেও হৃদরোগ পাওয়া যায় তাহলে কিন্তু আপনি হৃদরোগের জন‍্য শুধু ধূমপানকে দায়ী করতে পারবেন না। তাই, টেস্ট এবং কন্ট্রোল নির্বাচন করতে সায়েন্টিস্টদের গলদঘর্ম হতে হয়।

 দ্বিতীয় জিনিস হলো স‍্যাম্পল সাইজ। কেউ টাকার অভাবে ২০ জন নিয়ে কাজ করে। আবার, অক্সফোর্ডের স‍্যার ওয়াল্টার বডমার নামের এক ভদ্রলোক (যিনি তার গবেষণার জন‍্য Knight উপাধি পেয়েছেন) ২৯ হাজার ব্রিটিশ পপুলেশনের উপরও কাজ করেছেন। অবশ‍্যই, যত বড় স‍্যাম্পলের উপর কাজ করা হবে তত নির্ভরশীল রেজাল্ট পাওয়া যাবে। মাত্র ১০০-২০০ মানুষের উপর ট্রায়াল দিয়ে পাওয়া তথ‍্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ‍্য হয় না।

ধরুন, আপনার গবেষণার ফলাফল হাতে আছে। এখন কি করবেন?

বিজ্ঞানীদের মধ‍্যে বিশাল প্রতিযোগিতা কাজ করে। তাই, নিজের আবিষ্কারকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু, প্রকাশ কই করবো? পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিবো?

হ‍্যাঁ। পত্রিকায় প্রকাশ করবেন। তবে বৈজ্ঞানিক পত্রিকা বা সায়েন্টিফিক জার্নালে। সারাবিশ্বে হাজার হাজার জার্নাল আছে। কিছু ভালো; তবে অধিকাংশই ব‍্যবসার উদ্দেশ‍্যে কাজ করে। একটি জার্নাল কতটুকু ভালো তা বোঝা যায় তার impact factor দ্বারা। বিশ্বের সেরা জার্নাল New England Journal of Medicine এর impact factor ৫৯. নেচার বায়োটেকনলজির স্কোর ৪৪.৫. নেচারকে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক জার্নালগুলোর একটি বিবেচনা করা হয়।

তবে অধিকাংশ বিজ্ঞানীর গবেষণা প্রকাশিত হয় মাত্র ১-৩ impact factor বিশিষ্ট জার্নালে। তাই, কারো গবেষণার গভীরতা যাচাই করতে তার জার্নালের এই স্কোর জিজ্ঞাসা করুন। একজন বিজ্ঞানীর সারা জীবনের স্বপ্ন থাকে Nature এ গবেষণা প্রকাশ করা। ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়ে আমার জানামতে হাতেগোনা কয়েকজন আছেন যারা এই সম্মান অর্জন করেছেন।

আপনার গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত হলো। অন‍্য কথায়, বিজ্ঞানের জগতে আপনি আপনার পায়ের ছাপ রেখে ফেলেছেন। এখন কি?

আসল লড়াই শুরু হবে গবেষণা প্রকাশিত হবার পর। বিশ্বের শত শত বিজ্ঞানী আপনার কাজ পড়ে দেখবেন। তাদের মূল উদ্দেশ‍্য আপনার কাজের ভুল ধরা। এ কি ধরনের আচরন? তাই না? পাড়া-বেড়ানী আন্টির মতো বিজ্ঞানীরা কেন মানুষের কাজের ভুল ধরেন?

আসলে এই প্রক্রিয়াটাই বিজ্ঞানকে বিশুদ্ধ রেখেছে। একটি গবেষণায় কোন ভুল, বায়াস থাকলে সেটা অন‍্য বিজ্ঞানী প্রমাণ করে দেখান। অনেক সময় গবেষক নিজেই নিজের লেখায় এই সকল সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করেন। ভালো একটি গবেষণা হাজারো বিজ্ঞানীর রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। তারা রাত জেগে চিন্তা করেন এই কাজের জের ধরে নতুন কি করা যায়? পরদিন সকালে ল‍্যাবে যেয়ে তারা নতুন কিছুর পেছনে লেগে পড়েন। এইভাবে একটা আবিষ্কার তার পরবর্তী আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যে জিনিসটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে সেটা হলো, একজন আপনার মাসের পর মাস খেটে করা কাজের ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে। আপনি কই রাগ করবেন? কিন্তু, বিজ্ঞানীরা বরং এই ক্রিটিকদের অসম্ভব পছন্দ করেন।”

দেখা যাচ্ছে , আফসার আলী সাহেব তার গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছেন । তিনি তার অনুমান বা হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়েছেন। তবে তার এই হাইপোথিসসের ক্ষেত্রেও তত্ত্বগত ভুল রয়েছে। তদুপরি ,তিনি তার হাইপোথিসস এর স্বপক্ষে কোনো পরীক্ষা করেননি। উদাহরন স্বরূপ- নিউটনের গতির ২য় সূত্রের বহুল ব্যবহৃত  দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি নৌকা থেকে বালকের লাফ দেওয়ার সময় পরস্পরের বিপরীতমুখী বল (অর্থাৎ ভর এবং ত্বরণ) যাচাই করে নিউটনের সূত্রের সত্যাসত্য বের করতে পারতেন। যত বেশি স্যাম্পল সাইজ (অর্থাৎ যতগুলা ভিন্ন ভরের নৌকা এবং বালক এবং লাফ দেওয়ার ঘটনা) নিতেন, তার ফলাফল তত নিখুঁত হত। এই পরীক্ষার ফলাফলে যদি নিউটনের ৩য় গতি সূত্র ভুল প্রমাণিত হত (অর্থাৎ বালকের লাফ দেওয়ার বলের সমান পরিমান বিপরীত মুখী বল নৌকা প্রয়োগ না করে) তাহলে নিউটনের সূত্র ভুল ‘প্রমাণিত’ বলা যেত।  

 
কিন্তু এ ধরনের কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা তিনি করেননি। ফলে তিনি নিউটনের সূত্র ভুল ‘প্রমাণ’ করেছেন এমনটি বলা যাবেনা। তিনি কেবলমাত্র নিউটনের সূত্রকে ভুল হিসেবে দাবি করেছেন।

তবে কিছু সংবাদমাধ্যম এবং ফেসবুক ব্যবহারকারী তাদের পোস্টে জানিয়েছেন, জনাব আফসার আলী নিউটনের সূত্র ভুল প্রমাণ করেছেন। সঙ্গত কারনে ফ্যাক্টওয়াচ এ সকল পোস্টকে বিভ্রান্তিকর হিসেবে সাব্যস্ত করছে।

Claim:
পদার্থবিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন (জন্ম ১৬৪৩-মৃত্যু ১৭২৭) তার গতি সূত্রগুলোর জন্য বিখ্যাত । তার এই সূত্রগুলো বাংলাদেশের স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। সম্প্রতি পঞ্চগড়ের জনৈক আফসার আলী নিউটনের গতিসূত্রের কয়েক জায়গায় ভুল রয়েছে বলে দাবি করেছেন। আফছার আলী তার দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি, কেবলমাত্র তিনি কিছু তত্ত্বীয় ধারনা বা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, নিউটনের গতিসূত্র নিয়ে বোঝাপড়ায় আফসার আলীর ঘাটতি রয়েছে। তিনি এই সূত্রগুলোকে ভুল হিসেবে ‘প্রমাণ’ করার মত কিছু করতে পারেননি, কেবলমাত্র তিনি এদেরকে ভুল বলে ‘দাবি’ করেছেন। ফেসবুকে এমন দাবিকেই "ভুল প্রমাণ করেছেন" বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
Mostly false

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh