শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মানি-লন্ডারিং ও যৌন অপরাধে জড়িত জেফ্রি এপস্টিন সংক্রান্ত তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথি, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যা ‘এপস্টিন ফাইলস’ নামে পরিচিত হয়েছে। এসব তথ্য ও ছবি প্রকাশের সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। একইসাথে বেশ কিছু অপতথ্য সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। এদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট একটি বিষয় ( ক্যানিবালিজম বা নরমাংস ভক্ষণ) নিয়ে ছড়িয়ে পড়া কিছু অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে এই ফ্যাক্টফাইলে-
(প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ফাইলগুলো বয়সভেদে সংবেদনশীল। তাই ১৮ বছরের কম বয়সী পাঠকদের এই প্রতিবেদন পড়তে অনুৎসাহিত করা হচ্ছে)
এপস্টিনের পার্টিতে দুটি মুরগির সাথে মানবশিশুর শরীর রাখা ছিল
মোঃ মনিরুল আলম এই ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছেন, “নেন এপস্টিন ফাইলের সবচেয়ে জঘন্যতম ছবির একটা! দুটি চিকেনের মাঝখানে একটি শিশুর রোস্ট। মানে এরা যে শুধু শিশুদের রেইপ করত তা নয়, শিশুদের খেত। মানে এরা ক্যানিবাল!!”
ছবি আদানপ্রদানের জন্য জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ইউপিক (Youpic) এ হ্যারাল্ড সেইওয়ার্টের অ্যাকাউন্ট থেকে আলোচিত মুরগি ও মানবশরীরের ছবিটি খুঁজে পাওয়া গেল। এই ছবির বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালের ১৪ মার্চ এই ছবিটি নেদারল্যান্ডসে তোলা হয়েছে। আরো জানা যাচ্ছে যে ২০০৪ সালে ইতালিয়ান ভেজিটেরিয়ান অর্গানাইজেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ভেনিস লায়ন’ নামক অ্যাডভার্টাইজমেন্ট কম্পিটিশনে এই কোলাজ ছবিটি অংশ নিয়েছিল।
যেহেতু এটাকে ‘কোলাজ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অতএব এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সেখানে মুরগির পাশেই কোনো মানব শরীর স্থাপন করে ছবি তোলা হয়নি, বরং ভিন্ন স্থান থেকে মানব শরীরের অংশবিশেষের ছবি তুলে এনে প্রযুক্তির সহায়তায় এখানে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, জেফ্রি এপস্টিনের কোনো পার্টি থেকে এই দৃশ্য ধারণ করা হয়নি।
পশ্চিমা দেশের নেতারা (এই ছবির মত) মেয়েদের জবাই করে মাংস পুড়িয়ে খেতো
একটি শিশুর দুই হাত একটি টেবিলের সাথে বাঁধা এবং সে হাসিমুখে সামনে তাকিয়ে রয়েছে, এমন একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘আমার যা ইচ্ছা তাই পোস্ট করবো‘ -পেজ থেকে এই ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হয়েছে,
“আপনার কাছে যদি একশ কোটি টাকা থাকে তাহলে আপনি গাড়ি কিনবেন, বাড়ি কিনবেন। যদি এক হাজার কোটি টাকা থাকে তাহলে জাহাজ কিনবেন, বিমান কিনবেন।
আর যদি দশ লক্ষ কোটি টাকা থাকে তাহলে বাচ্চা মেয়েদের মাংস খাবেন, জীবন্ত মেয়ে শিশুর পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি আলাদা করে অন্ত্র থেকে পায়খানা বের করে গিলে খাবেন।
কোন কল্পকাহিনী বলছি না। এমনটা সত্যিই ঘটেছে। পশ্চিমা বিলিয়নিয়াররা এতবছর এসবই করে এসেছে।
গতকাল Epstein ফাইলস ফাঁস হয়েছে। সেখানে হাজার হাজার ভিডিও এবং ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠার এসব গোপন নথিপত্রের প্রমাণ রয়েছে।এই পাশবিক এবং জঘন্য কাজগুলো কোন চুপিসারে হতো না। বরং আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে জমজমাট ভাবেই হতো।”
এই শিশুটির ছবি রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে যাচাই করে দেখা গেল,২০১৬ সাল থেকেই ছবিটি অনলাইনে রয়েছে। আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসির ‘Comet Ping Pong’ নামক একটি পিজ্জা রেস্টুরেন্টের মালিক, যার নাম ‘James Alefantis’ প্রথমবারের মত তার রেস্টুরেন্টে খেলতে থাকা এই শিশুর ছবিটি নিজের ইন্সটাগ্রামে প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, তার এই কমেট পিং পং রেস্টুরেন্টে শিশুদের আটকে রাখা হচ্ছে ও বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। তবে এই গুজবের কোনো সত্যতা কখনো পাওয়া যায়নি। আমেরিকাভিত্তিক ফ্যাক্টচেক সংস্থা স্নুপস এই গুজবকে ‘কনস্পাইরেসি থিওরি’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছে।
২০১৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পূর্বাপর নিয়ে এই রেস্টুরেন্টের মালিকের একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছিল আমেরিকার ফক্স নিউজে। সেখানে আলোচিত এই ছবিটা সম্পর্কে তিনি জানিয়েছিলেন, ওই শিশুটি তার বোনের সাথে খুশি মনে খেলছিল,এবং তার বোন টেপ দিয়ে তার হাত আটকে দিয়েছিল। তার বাবা-মাও সেখানে উপস্থিত ছিল এবং আমি তাদের অনুমতি নিয়ে ছবিটি ইন্সটাগ্রামে দিয়েছিলাম। ছবিটি সেখানে দেড় বছরের মত ছিল তারপর খারাপভাবে ভাইরাল হওয়ার পরে এটা সরিয়ে ফেলতে হল।
তবে তিনি শিশুটির নাম বা পরিচয়সূচক কোনো তথ্য বর্ণনা করেননি।
এছাড়া, রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে এই শিশুর ছবিটি যে সব স্থানে দেখা গিয়েছে, তাদের সাথে এপস্টিন ফাইলের সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়নি। এপস্টিন ফাইলসে প্রকাশিত অন্যান্য ছবিগুলাতে দেখা যাচ্ছে, সেখানে নির্যাতিতদের মুখমন্ডল কালো ব্লক দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে, যা এই ছবিতে অনুপস্থিত।
অর্থাৎ, এই ছবিটা এপস্টিন ফাইলসে প্রকাশিত কোনো নির্যাতিত শিশুর ছবি নয়। তবে এপস্টিন ফাইলে প্রকাশিত নথিপত্রের মধ্যে অন্তত একটি নথিতে মানব শরীরকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার একটি অভিযোগ রয়েছে। EFTA00147661 –এই ভুক্তিতে নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের শিশু নির্যাতন বিভাগের একজন কর্মকর্তা একজন ‘কথিত এপস্টিন ভুক্তভোগী’র সাক্ষাৎকারের সারাংশ ই-মেইল করেছেন। এই ই-মেইলের ডিসক্লোজড অংশ থেকে দেখা যাচ্ছে, ভুক্তভোগী জানাচ্ছেন, ইয়টে তিনি এমন ভয়াবহ নির্যাতনের দৃশ্য দেখেছিলেন, যেখানে শিশুদের ওপর চরম সহিংসতা চালানো হচ্ছিল (On the yacht he witnessed babies being dismembered, their intestines removed, and individuals eating the feces from these intestines. )।
পরবর্তী পাতায়, অর্থাৎ EFTA00147662 ভুক্তিতে পরবর্তী ই-মেইলে জানানো হচ্ছে, এই ভুক্তভোগী অতীতে ‘হ্যালুসিনেজিক মাশরুম’সহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য গ্রহণ করতেন এবং বর্তমানে মারিজুয়ানা সেবন করছেন। এপস্টিন এর ইয়টে তিনি এপস্টিন ,বিল ক্লিনটনসহ একাধিক লোকের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিল। এই ধর্ষণের সময়েও তাকে বিভিন্ন ধরনের কড়া মাদকদ্রব্য দেওয়া হয়েছিল। ইয়টের এই ঘটনাগুলো ঘটেছিল ২০০০ সালে। ২০১৬ সালে তিনি মানসিক থেরাপির সাহায্যে এই ‘চাপা পড়া স্মৃতিগুলো’ পুনরায় মনে করতে সক্ষম হয়েছেন। রিপোর্টের শেষ দিকে এই কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, তিনি তার দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি, এবং আমার কাছে তাকে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন (emotionally unbalanced) মনে হয়েছে।
অর্থাৎ, এপস্টিন এর অতিথিদের দ্বারা নরমাংস ভক্ষণের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ অথবা ছবি এই এপস্টিন ফাইলে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া দুই হাত টেপ দিয়ে বাঁধা শিশুটি এপস্টিনের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত কেউ নয়।
Claim: শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মানি-লন্ডারিং ও যৌন অপরাধে জড়িত জেফ্রি এপস্টিন সংক্রান্ত তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথি, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যা ‘এপস্টিন ফাইলস’ নামে পরিচিত হয়েছে। এসব তথ্য ও ছবি প্রকাশের সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। একইসাথে বেশ কিছু অপতথ্য সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh