বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে যুগলদের শাস্তি দিচ্ছে গ্রামবাসী ও আর্মি, এ ধরনের ক্যাপশনের সঙ্গে কিছু ছবি সম্প্রতি ফেসবুকে পোস্ট করা হচ্ছে। 'আনিস আহমেদ' নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে এ ধরনের বেশ কিছু ছবি ছড়ানো হচ্ছে। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, ছবিগুলো এআই দিয়ে বানানো। মূলত মোরাল পুলিশংকে উৎসাহ দিতেই এ ধরনের পোস্ট করা হচ্ছে বলে ধারণা পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানের শুরুতে আনিস আহমেদ (Anis Ahmed) নামের আইডিতে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, এটির ফলোয়ার সংখ্যা ৬ লাখের ওপরে। এই আইডিতে অনেক পোস্টের সঙ্গে এআই দিয়ে বানানো ছবি বা ভিডিও যুক্ত করা হয়েছে। পোস্টগুলোর মধ্যে পাঁচটি পোস্ট গত ১৪ ফেব্রুয়ারির ভালোবাসা দিবসে যুগলদের শাস্তি নিয়ে। এগুলোর ক্যাপশনের সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এবারের ভালোবাসা দিবস ঘিরে হেনস্তার খবর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
যদিও বিগত বছরগুলোতে যুগলদের হেনস্তার কিছুকিছু খবর সংবাদমাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়।
তবে সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়ানো ছবিগুলোর সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের ছবিগুলোর মিল নেই। এ বছর পার্কে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ ধরনের হেনস্তার খবরও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নমুনা-১
এই পোস্টের পোস্টের ক্যাপশনে লেখা- “প্রবাসে থাকা স্বামীর অনুপস্থিতিতে প্রবাসীর স্ত্রী ও প্রবাসী বন্ধু পরকীয়ায় লিপ্ত হয়, বিশ্ব ভালবাসা দিবসের পরের দিন রাতে ভালোবাসা করতে গেলে গ্রামবাসী তাদের আটক করে ফেলে পরবর্তীতে তাদেরকে গাছের সাথে বেঁধে জুতার মালা পরিয়ে মাথার চুল ন্যাড়া করে শাস্তি দেওয়া হয়।”
ছবিটি পর্যালোচনা করে, কিছু অসঙ্গতি পাওয়া যায়। চুল কেটে দেওয়া ব্যক্তির হাত এবং চুল কাটার যন্ত্রের অবস্থানে বাস্তব এঙ্গেল পাওয়া যায় না। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিদের অস্পষ্ট মুখও এআই দিয়ে বানানো ছবির ধরনের সঙ্গে মেলে। ছবিটি এআই সনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশন (Hive Modaration) দিয়ে যাচাই করে এআই নির্মিত বলে ১০০% ফলাফল পাওয়া যায়।
সংবাদমাধ্যমে খুঁজে এ ধরনের একটি ঘটনার খবর পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে এক গৃহবধূ (৪০) ও এক মধ্যবয়সী ব্যক্তিকে (৫০) প্রকাশ্যে হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে। উপজেলার বড়মানিকা ইউনিয়নের নতুনবাজার মেঘনাতীর বাঁধ এলাকায় স্থানীয় এক সালিসে তাদের গলায় জুতার মালা পরানো হয় এবং মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে বোরহানউদ্দিন থানা–পুলিশ অভিযান চালিয়ে সালিসকারীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।
তবে আলোচিত ছবিটি এই ঘটনার নয়।
নমুনা-২
একই ধরনের আরেকটি পোস্ট পাওয়া একই আইডিতে। এই পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়েছে- “মোস্তাকিন ছিল গ্রামের এক প্রবাসী শ্রমিক। মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করে সে সংসার চালাত, টাকা পাঠাত নিয়মিত। গ্রামে ছিল তার তরুণী স্ত্রী আর বৃদ্ধ মা। সবাই জানত—মোস্তাকিন কত কষ্ট করে পরিবারটাকে ভালো রাখতে চায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের দূরত্ব আর একাকীত্বের সুযোগে, গ্রামেরই এক যুবকের সঙ্গে গোপন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে প্রবাসীর স্ত্রী। প্রথমে বিষয়টি চাপা থাকলেও ধীরে ধীরে মানুষের চোখে সন্দেহ ধরা পড়ে। আজকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে নির্জন এক বাড়িতে দেখা করতে গেলে কয়েকজন প্রতিবেশী তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলে। খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। গ্রামের মানুষ জড়ো হয়। কেউ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে, কেউ হতাশায় মাথা নাড়ে—কারণ তারা জানত, প্রবাসী মানুষটি কত বিশ্বাস করে স্ত্রীকে রেখে গেছে।”
এই ছবিটির ব্যক্তিদের দাঁড়িয়ে ও বসে থাকার ভঙ্গিতে খুব গোছানো ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত গ্রামের এ ধরনের ঘটনায় একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এআই দিয়ে বানানো ছবির ক্ষেত্রে এই ধরনের সাজানো ব্যাপার থাকে।
এই ছবিটিও এআই শনাক্তকারী টুল দিয়ে ১০০% এআই জেনারেটেড ফলাফল পাওয়া যায়।
নমুনা-৩
এই পোস্টটির ক্যাপশনে বলা হয়, “গতকালকে ভ্যালেন্টাইন ডে দিবসে সেনাবাহিনীর অ্যাকশন। পার্কে বসে কিছু যুবক-যুবতীরা ভালবাসার নামে নোংরামি ও অনৈতিক কাজ করছিল, সেনাবাহিনীর সদস্যরা খবর পেয়ে তাদেরকে হাতে নাতে ধরে কান ধরে উঠবস করিয়ে পাছায় বেত্রাঘাত করে করে ছেড়ে দেয় এবং তাদেরকে বলে দেয় ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসের নামে নোংরামি করলে তাদেরকে পাছা লাল দিবস উপহার দেবে।”
পার্কে এ ধরনের অভিযান সাধারণত পুলিশ করে থাকে। এসব ঘটনায় সাধারণত সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, ইউটিউবেও পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে এই ধরনের ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ছবিটি খেয়াল করলে দেখা যায়, কান ধরে বসে থাকা সবার মাথা এক লাইনে। এআই ছবিতে এ ধরনের সাজানো ব্যাপার থাকে।
এছাড়া, এ আই শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করে ছবিটিকে ৯৮% কৃত্রিম দেখায়।
নমুনা-৪
এই পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়েছে, “গতকালকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি তথা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ছিল। ১৪ই ফেব্রুয়ারির বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে শহরের বিভিন্ন পার্কে উপচে পড়া ভিড় ছিল। সেই সময় সেনাবাহিনী অভিযান চালায়। কিছু উঠতি বয়সি ছেলে-মেয়ে পার্কের নিরিবিলি কোণে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল। তাদের আটক করে কান ধরে ৫০ বার উটবস করানো হয় এবং মোটা লাঠি দিয়ে তাদের পাছা লাল করে দেয়া হয়। চারপাশে কৌতূহলী মানুষ ভিড় করে। পরে ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার অঙ্গীকার নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি সবার জন্য কঠোর সতর্কবার্তা হয়ে থাকল। ধন্যবাদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে।”
এই ছবিটিতেও আর্মির পোশাকে চারজনকে দেখা যাচ্ছে। এআই ছবির মতো এই ছবিটিতেও কোন বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না।
এছাড়া, এ আই শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করে ছবিটিকে ১০০% কৃত্রিম দেখায়।
নমুনা-৫
এই পোস্টের ক্যাপশনে লেখা- ” ভ্যালেন্টাইনস ডের বিকেলে পার্কে ছিল উপচে পড়া ভিড়। অনেকেই হাতে ফুল নিয়ে ঘুরছিলেন। তবে কিছু তরুণ-তরুণী সবার সামনে অশ্লীল কার্যক্রম শুরু করলে আশপাশের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা বিরক্তি প্রকাশ করেন। পরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সেনাসদস্যরা সংশ্লিষ্টদের আটক করে শাস্তিমূলকভাবে কান ধরে উঠবস করান এবং ছেলেদের কয়েকটি লাঠির আঘাত দিয়ে সতর্ক করে ছেড়ে দেন।”
এই ছবিটিও আগের ছবি দুটির মতোই। এটির ক্যাপশনেও কোন এলাকার ঘটনা তা উল্লেখ নেই।
এআই জেনারেটেড ছবির মতোই ঝকঝকে ছবি এটি।
এছাড়া, এ আই শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করে ছবিটিকে ১০০% কৃত্রিম দেখায়।
আনিস আহমেদের পোস্টগুলোর কমেন্ট সেকশন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মন্তব্যকারীদের একটা বড় অংশ ক্যাপশন ও ছবিকে বাস্তব ভেবে মন্তব্য করেছেন। লক্ষ্য করে দেখা যায়, মন্তব্যকারীরা মোরাল পুলিশিংয়ের (মোরাল পুলিশিং হলো নিজের ব্যক্তিগত নৈতিক মানদণ্ড অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সীমিত করা) এসব ঘটনায় ব্যাপক সমর্থন দিয়েছেন। এসব মন্তব্যই পোস্টদাতাকে একের পর এক এ ধরনের পোস্ট দিতে উৎসাহ যুগিয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ওপরের পাঁচটি ছবির কোনোটিতেই ‘এআই ছবি’ উল্লেখ করা নেই। এছাড়া ক্যাপশনে মনগড়া বানোয়াট গল্প জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কোন এলাকার ঘটনা তাও উল্লেখ নেই। সামাজিক মাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে ১৪ ফেব্রুয়ারির অথবা কাছাকাছি সময়ে এ ধরনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও নেই।
Claim: বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে যুগলদের শাস্তি দিচ্ছে গ্রামবাসী ও আর্মি, এ ধরনের ক্যাপশনের সঙ্গে কিছু ছবি সম্প্রতি ফেসবুকে পোস্ট করা হচ্ছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh