ঈদযাত্রায় এআই দিয়ে নির্মিত লঞ্চে দুর্ঘটনা

27
ঈদযাত্রায় এআই দিয়ে নির্মিত লঞ্চে দুর্ঘটনা
ঈদযাত্রায় এআই দিয়ে নির্মিত লঞ্চে দুর্ঘটনা

১৮ মার্চ বিকেলে ঢাকার সদরঘাটে যাত্রা শুরুর মুহুর্তে দুটি লঞ্চের সংঘর্ষে কমপক্ষে ২ জন নিহত হয়েছেন। তবে এই ঘটনার কয়েকদিন পূর্ব থেকেই মাঝনদীতে দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবি হয়েছে এবং অনেক যাত্রী হতাহত হয়েছেন - এমন একটি সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দাবির সাথে সামাজিক মাধ্যমে যেসব ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, সেই ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্বারা নির্মিত বলে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যমেও লঞ্চডুবির কোনো সংবাদ দেখা যাচ্ছে না। সঙ্গত কারণে ফ্যাক্টওয়াচ এসব পোস্টকে 'মিথ্যা' সাব্যস্ত করছে।

ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে,  এখানে, এখানে, এখানে, এখানে। 

এসব পোস্টে বলা হয়েছে, “হায়রে মানুষের জীবন। এবার ঈদে বাড়ি যাওয়ার পথে যাত্রীবাহি লঞ্চ দুইটি ধাক্কা লেগে পানিতে ডুবে যাচ্ছে। বাড়ী ফিরে আর তাদের ঈদ করা হলো না। অনেক মানুষ মা/রা গেছে। ছবিটি লাইক দিয়ে বেশি করে শেয়ার করে দেন যাতে যাত্রীদের আত্মীয় স্বজনরা জানতে পারে। আল্লাহ সবাইকে এমন বিপদ থেকে উদ্ধার করুক। আমিন।’’ (বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

 এসব ফেসবুক পোস্টে যে ছবিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। প্রথম ছবিতে, লঞ্চের শীর্ষে ‘এমভি কর্ণফুলী’ কথাটি পরিষ্কারভাবে পড়া গেলেও, লঞ্চের পরবর্তী তলাগুলোর শীর্ষে বাংলা অক্ষরের আদলে অর্থহীন কিছু শব্দ ও বাক্য দেখা যায়। এছাড়া লঞ্চগুলোতে কোনো যাত্রীও দেখা যাচ্ছে না। 

দ্বিতীয় ছবিতে, লঞ্চগুলোর শীর্ষে কোনো অর্থপূর্ণ শব্দ বা বাক্যই দেখা যায়নি। এছাড়া, এই ছবিতে একই দিক থেকে আসা দুটি লঞ্চকে বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি আসতে দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দু’টি লঞ্চে ধাক্কা লাগলেও সেটা একে অপরকে ডুবিয়ে দেওয়ার মত যথেষ্ট হবেনা। অথচ কোনো ধরনের সংঘর্ষ ঘটার আগেই প্রচুর উদ্ধারকারী নৌকা, স্বেচ্ছাসেবক সাঁতারু এবং একটি হেলিকপ্টার ঘটনাস্থলে দেখা যাচ্ছে।


তৃতীয় ছবিতে এক যুবককে লঞ্চের সামনে সাঁতার কাটতে কাটতে মোবাইলে ‘সেলফি’ তুলতে দেখা যাচ্ছে। এখানে ঘটনাস্থলে ‘এমভি সোনার বাংলা’ নামের একটি মাত্র লঞ্চ দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় কোনো লঞ্চ দেখা যাচ্ছে না বা সংঘর্ষের কোনো আলামত দেখা যাচ্ছেনা। তারপরেও এই লঞ্চের আশপাশে অনেক উদ্ধারকর্মী ভিড় করেছেন, এবং কোনো কোনো যাত্রী লঞ্চ থেকে পানিতে লাফিয়ে নামছেন। 

এই ছবির নিচের দিকে জেমিনি লোগোটাও দেখা যাচ্ছে, যা এআই দিয়ে নির্মান নির্দেশ করে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ( Artificial Intelligence বা AI) সনাক্তকারী কয়েকটি টুলের সাহায্যে এই ছবিগুলো যাচাই করে দেখা গেল, এই ৩টি ছবিই এআই দ্বারা নির্মিত। এখানে ব্যবহৃত টুলগুলোর মধ্যে ছিল হাইভ মডারেশন, সাইট ইঞ্জিন, ডিকপি ইত্যাদি।

বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনের সাহায্যে গত কয়েক সপ্তাহে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুসন্ধান করে দেখা যাচ্ছে, ১৬ মার্চ একটি লঞ্চ চরে আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। আর ১৮ মার্চ সদরঘাটে যাত্রী তোলার সময়ে একটি লঞ্চকে পেছন থেকে আরেকটি লঞ্চ ধাক্কা দিয়েছিল যার ফলে কমপক্ষে ২ জন নিহত হয়েছে। এর বাইরে আর কোনো লঞ্চ দুর্ঘটনার কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছেনা।

 গত ১৬ মার্চ সন্ধ্যায় ‘এমভি সুগন্ধা’ নামের একটি লঞ্চ ঢাকার সদরঘাট থেকে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। রাতের শেষ ভাগে ইলিশা ঘাটের অদূরে ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চটি চরে আটকা পড়ে। পরবর্তীতে কোস্টগার্ডের তৎপরতায় ১৭ মার্চ বিকেলে যাত্রীদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। 

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর দেখতে পাবেন এখানে, এখানে

অন্যদিকে, ১৮ মার্চ বিকেল ৫ টা ৩০ মিনিটে সদরঘাটে দুটি লঞ্চের সংঘর্ষ ঘটেছে। দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশের উদ্ধৃতিতে বলা হয়, ‘’সদরঘাটের ১৪ নম্বর পন্টুনের কাছে ঢাকা–ইলিশা (ভোলা) রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ নামে একটি লঞ্চ ট্রলার থেকে যাত্রী তুলছিল। এ সময় লঞ্চটিকে ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট রুটের ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ নামে একটি লঞ্চ ধাক্কা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এমভি জাকির সম্রাট–৩ লঞ্চের সামনের অংশের আঘাতে ‘আসা যাওয়া–৫’ লঞ্চের দুজন যাত্রী পিষ্ট হন। এর মধ্যে একজনকে পানিতে পড়ে যেতে দেখা গেছে। অন্যজনকে ‘আসা যাওয়া–৫’–এর বাইরের অংশে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।’’

১৮ মার্চ সময় টিভিতে প্রকাশিত “ঈদযাত্রা: রেল, সড়ক ও লঞ্চ পথে বাড়ছে উপচেপড়া ভিড়” শীর্ষক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘’দক্ষিণাঞ্চলের বরিশালে সড়ক পথে ভিড় বেশি থাকায় লঞ্চের যাত্রী চাপ কম। তাই স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছেন যাত্রীরা। ‘’

ঈদযাত্রার খবারাখবর যুক্ত অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও বড় আকারের লঞ্চ দুর্ঘটনার বা লঞ্চডুবির কোনো খবর দেখা যাচ্ছে না। 

সার্বিক বিবেচনায় ফ্যাক্টওয়াচ এই সকল পোস্টকে ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।

Claim:
১৯ মার্চ বিকেলে ঢাকার সদরঘাটে যাত্রা শুরুর মুহুর্তে দুটি লঞ্চের সংঘর্ষে কমপক্ষে ২ জন নিহত হয়েছে। তবে এই ঘটনার কয়েকদিন পূর্ব থেকেই মাঝনদীতে দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবি হয়েছে এবং অনেক যাত্রী হতাহত হয়েছেন - এমন একটি সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দাবির সাথে সামাজিক মাধ্যমে যেসব ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, সেই ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্বারা নির্মিত বলে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যমেও লঞ্চডুবির কোনো সংবাদ দেখা যাচ্ছে না। সঙ্গত কারণে ফ্যাক্টওয়াচ এসব পোস্টকে 'মিথ্যা' সাব্যস্ত করছে।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh