প্রথম আলোর নাম ব্যবহার করে সাবেক উপদেষ্টাদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে ভুয়া ফটোকার্ড

18
প্রথম আলোর নাম ব্যবহার করে সাবেক উপদেষ্টাদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে ভুয়া ফটোকার্ড
প্রথম আলোর নাম ব্যবহার করে সাবেক উপদেষ্টাদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে ভুয়া ফটোকার্ড

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন, সংস্কৃতি উপদেষ্টা ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন কিংবা প্রেস সচিব শফিকুল আলম ২ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন- এমন কয়েকটি খবর অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে দৈনিক প্রথম আলোর আদলে তৈরি করা ফটোকার্ডও ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইট ঘেঁটে এমন কোনো সংবাদ দেখা যায়নি। অন্য অখ্যাত কয়েকটি পোর্টাল এবং ফেসবুকে পেজে তথ্যসূত্র ছাড়াই অনুরূপ খবর প্রকাশিত হলেও, এই দাবি যাচাই করা ফ্যাক্টওয়াচের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

তিন দেশে ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন আসিফ নজরুল- এমন খবর প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়েছিল ১৯ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে আজকের কণ্ঠ নামক পোর্টাল থেকে। এই প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম -পরিচয় উল্লেখপূর্বক তার দেওয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়নি , কেবলমাত্র ‘মন্ত্রণালয়ের অন্দরমহল এবং গোয়েন্দা সূত্রে’র বরাতে পুরো প্রতিবেদন সাজানো হয়েছে।

পরবর্তীতে এই একই শিরোনামের খবর দেখা যায় একুশের দর্পণ, ডেইলি একাত্তর, ঢাকা নিউজ, ভোলা ট্রেন্ড ইত্যাদি পোর্টালে।  

২০ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা থেকে এই শিরোনামে প্রথম আলোর আদলে একটি ফটোকার্ড ফেসবুকে ছড়াতে দেখা যায়। এমন কিছু পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

এসব পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয় -’’ব্রেকিং নিউজ….!!

তিন দেশে ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন আসিফ নজরুল…’’

এসব পোস্টে প্রথম আলোর লোগোযুক্ত ফটোকার্ডেও একই শিরোনাম (তিন দেশে ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন আসিফ নজরুল) দেখা যায়। এরপর ছোট হরফে ‘বিস্তারিত কমেন্টে’ কথাটি লেখা ছিল। কমেন্টে সরবরাহ করা লিংকে ক্লিক করলে সেটি prothom-alo.online শীর্ষক একটি ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনে কেবলমাত্র একটি সম্পূর্ণ বাক্য ছিল। প্রতিবেদনটি ছিল এইরকম- “২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তবে সদ্য বিদায়ী এই উপদেষ্টার গত দেড় বছরের…’’

এরপর ‘সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন’ শীর্ষক একটি বাটন দেখা যায়। এই বাটনে ক্লিক করলে সেটি ভিন্ন একটি বিজ্ঞাপনের ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়, উক্ত খবরের বিস্তারিত আর পাওয়া যায়না।   

অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, দৈনিক প্রথম আলোর ইউআরএল হল prothomalo.com। আর এই ওয়েবসাইটের ইউআরএল prothom-ali.online, অর্থাৎ প্রথম আলোর নামটা ব্যবহার করে ভিন্ন ওয়েবসাইট খুলে পাঠককে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।


তবে প্রথম আলোকে রেফারেন্স হিসেবে ধরে নিয়ে কেউ কেউ এই শিরোনামটি পুনঃপ্রকাশ করেছেন। যেমন People’s uprising পেজের এই পোস্টে বলা হয়েছে, “তিন দেশে ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন আসিফ নজরুল। সূত্র: প্রথম আলো’’

অনুরূপভাবে ’সাবেক প্রেস সচিব শফিকের বিরুদ্ধে ২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ’-এমন শিরোনামে একটি খবর প্রচার শুরু হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে ‘আজকের কণ্ঠ’ পোর্টাল থেকে। পরবর্তীতে এই একই খবর দেখা যায় রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ, বরুড়া খবর, বিডি ক্রাইম নিউজ  ইত্যাদি পোর্টালে। দৈনিক প্রথম আলোর অনুকরণে একই নাম ও লোগোযুক্ত কয়েকটি ফটোকার্ড ব্যবহার করেও এই খবরটি ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। তবে এসব ক্ষেত্রে ফটোকার্ডে একটু ভুল বানানে শিরোনাম ছিল ‘সাবেক প্রেস সচিবের শফিকের বিরুদ্ধে ২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ’ । এই কার্ডযুক্ত কয়েকটি পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

এসব পোস্টের কমেন্ট বক্সের লিংকে ক্লিক করলে পূর্বোক্ত প্রথম আলো অনলাইনের একটি পাতায় নিয়ে যায়, যেখানে মূল প্রতিবেদনে মাত্র একটি বাক্য রয়েছে। বিস্তারিত পড়ার বাটনে ক্লিক করলে ভিন্ন একটি বিজ্ঞাপনের ওয়েবসাইটে রিডাইরেক্টেড হয়ে যায়। 

ঠিক একই রকম অভিযোগ দেখা যাচ্ছে সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রেও।  “জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের ১১০ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ ফারুকীর বিরুদ্ধে’’- শিরোনামের খবরটি প্রথমবারের মত দেখা যায় আজকের কণ্ঠের ফেসবুক পাতায়, ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ২ টা ৩৯ মিনিটে। পরবর্তীতে একই শিরোনামে প্রথম আলোর লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ডও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে,এখানে,এখানে,এখানে

এসব পোস্টের কমেন্টে দেওয়া লিংক থেকে আবারও প্রথম আলো ডট অনলাইনের একটি পাতা পাওয়া যায় এবং সেখান থেকে একটি বেটিং সাইটের বিজ্ঞাপনের পৃষ্ঠায় পাঠককে নিয়ে যায়। 

অর্থাৎ প্রতিক্ষেত্রেই পাঠককে একটি চটকদার শিরোনাম দেখিয়ে বিভ্রান্ত করে নিজেদের বিজ্ঞাপনের ওয়েবসাইটে ভিজিটর বাড়ানোর লক্ষ্যেই কাজ করেছে এসব আলোচিত ফটোকার্ড বা ফেসবুক পোস্ট।

ডোমেইন হিস্ট্রি যাচাই করার কয়েকটি ওয়েবসাইটের (যেমন ইউআরএল ভয়েড, স্মল এসইও টুলস ইত্যাদি)  বিশ্লেষণে দেখা গেল, এই প্রথম আলো ডট অনলাইন ডোমেইনটি রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে অতি সম্প্রতি, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে। এর সার্ভার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত এবং এর আইপি এ্যাড্ড্রেস – 209.74.68.12। অন্যদিকে মূল প্রথম আলো ডট কম ডোমেইনের রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিল আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে, ২০০১ সালে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অতীতেও প্রথম আলোর আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট এবং সেসব ওয়েবসাইট থেকে ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে মামলা এবং গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছিল। এমন কিছু সংবাদ দেখতে পাবেন এখানে, এখানে

দৈনিক প্রথম আলোর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪ টা ১৫ মিনিটে একটি পোস্টের মাধ্যমে জানানো হয়, ছড়িয়ে পড়া এই কার্ডগুলো ভুয়া।

সার্বিক বিবেচনায়, ফ্যাক্টওয়াচ প্রথম আলোর নাম লোগোযুক্ত এসব ফটোকার্ডকে ‘বিকৃত’ সাব্যস্ত করছে। 

Claim:
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন, সংস্কৃতি উপদেষ্টা ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন কিংবা প্রেস সচিব শফিকুল আলম ২ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন- এমন কয়েকটি খবর অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে দৈনিক প্রথম আলোর আদলে তৈরি করা ফটোকার্ডও ব্যবহৃত হয়েছে।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh