জুলাই সনদে স্বাক্ষর নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির নামে ভুয়া ফটোকার্ড

220
জুলাই সনদে স্বাক্ষর নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির নামে ভুয়া ফটোকার্ড
জুলাই সনদে স্বাক্ষর নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির নামে ভুয়া ফটোকার্ড

নির্দিষ্ট শর্ত না মানলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না বিএনিপি/জামায়াতে ইসলাম/ ইসলামী ছাত্রশিবির- এমন দাবিযুক্ত কয়েকটি ফটোকার্ড ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। দৈনিক আমার দেশের লোগোযুক্ত এসব কার্ডে প্রতিটা দলের পক্ষে নির্দিষ্ট শর্তের কথা বলা হচ্ছে। যেমন-শিবিরের ক্ষেত্রে দাবি করা হচ্ছে, জুলাই সনদে ১৯৭১ এর গণহত্যার উল্লেখ থাকলে সেখানে শিবির স্বাক্ষর করবে না। আবার বিএনপি ও জামায়াতের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, ভারতকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না। প্রকৃতপক্ষে এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে এমন কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি। দৈনিক আমার দেশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এগুলো ভুয়া ফটোকার্ড । সঙ্গত কারনে ফ্যাক্টওয়াচ এ সকল ফেসবুক পোস্টকে ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এর বর্তমান সভাপতি জাহিদুল ইসলাম এর নাম ও ছবি সম্বলিত কয়েকটি ফটোকার্ড দেখতে পাবেন এখানে,এখানে,এখানে,এখানে,এখানে,এখানে এবং এখানে। এসব কার্ডের শিরোনামে বলা হয়েছে- “জুলাই সনদে ৭১ এর গণহত্যা উল্লেখ থাকলে সাক্ষর করবে না শিবির —জাহিদুল”

গত ৫ আগস্ট ভোর ৩ টা ৩ মিনিটে আমার দেশের ফেসবুক পেজ থেকে একটি পোস্টে জানানো হয়, “৩ আগস্ট তারিখ দিয়ে বানানো এই ফে/ক কার্ডে যে কথা বলা হচ্ছে, ওইদিন সে রকম কোনো নিউজ বা কার্ড আমার দেশের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়নি। তাই পাঠকদের সতর্ক থাকার অনুরোধ করা যাচ্ছে।”

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ এর নাম ও ছবিযুক্ত কয়েকটি ফটোকার্ড দেখতে পাবেন এখানে,এখানে,এখানে,এখানে,এখানে, এখানে, এখানে,এখানে এবং এখানে। এসব পোস্টে বলা হয়েছে- “ইন্ডিয়াকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবেন না বিএনপি -সালাউদ্দিন চৌধুরী”

৮ আগস্ট দুপুর ১ টা ১ মিনিটে আমার দেশের ফেসবুক পেজ থেকে প্রকাশিত একটি পোস্টের মাধ্যমে সালাহউদ্দিন আহমেদের কথিত উদ্ধৃতি যুক্ত এই ফটোকার্ডকে ‘ফেক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই পোস্টে বলা হয়, ‘আমার দেশের ভুয়া ফটোকার্ড বানিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে একটি মহল। সম্মানিত পাঠকদের এ বিষয়ে সচেতন থাকার অনুরোধ করা যাচ্ছে, ধন্যবাদ।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডা. শফিকুর রহমানের উদ্ধৃতি ও ছবিযুক্ত কয়েকটি ফটোকার্ড দেখতে পাবেন এখানে, এখানে,এখানে,এখানে,এখানে,এখান,এখানে,এখানে,এখানে ,এখানে এবং এখানে

এসব কার্ডে বলা হয়েছে, ‘ইন্ডিয়াকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না জামায়াত।’

আমার দেশ এর আদলে তৈরী করা এই ফটোকার্ডে তারিখ দেওয়া হয়েছে ৫ আগস্ট ২০২৫। আমার দেশের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ঘেটে দেখা গেল, ওইদিন আমার দেশ থেকে মোট ৬০টি ফটোকার্ড আপলোড করা হয়েছিল। তবে জামায়াতের আমিরের বক্তব্যযুক্ত এমন কোনো কার্ড সেখানে ছিল না।

তদুপরি, ৫ আগস্ট তারিখে আমার দেশে প্রকাশিত ভিন্ন একটি খবর থেকে জানা যাচ্ছে, গত শনিবার (২ আগস্ট) রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। ওই প্রতিবেদন লেখার সময়েও (৫ আগস্ট) তিনি হাসপাতালের আইসিইউ তে ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই এরকম সময়ে তার পক্ষে কোনো বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া, তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের আমিরের জুলাই সনদ নিয়ে কোনো বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।



প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস জাতীয় সংসদের সামনে ‘জুলাই ঘোষনাপত্র’ উপস্থাপন করেন। এই ঘোষনাপত্রে কোনো রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবে জুলাই সনদে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরের কথা বলা হয়েছিল।

দৈনিক প্রথম আলোর এই এক্সপ্লেইনারে বলা হয়েছে, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ হলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের একটি দলিল। যার মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদ হলো—রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ঐকমত্যের একটি রাজনৈতিক দলিল।……গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনার উদ্যোগ নেয়। ইতিমধ্যে প্রথম ধাপে গঠন করা ছয়টি সংস্কার কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে। যেসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে তৈরি করা হবে একটি সনদ। এটিই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’।

৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষনে প্রধান উপদেষ্টা জানান, ‘ঐকমত্য কমিশনের পরিচালনায় দেশের সকল রাজনৈতিক দল মিলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিয়ত আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে এসেছে।আমরা আশা করছি এই ঐক্যমতের ভিত্তিতে অচিরেই রাজনৈতিক দলগুলি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে এবং এর বাস্তবায়নেও ঐকমত্যে পৌঁছাবে।’

জুলাই সনদ চূড়ান্ত হওয়ার পূর্বে এখানে স্বাক্ষর করা না করা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য দেখা গিয়েছিল। গত ২ আগস্ট জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি’র আহবায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, জুলাই সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকতে হবে, না হলে স্বাক্ষর করবে না তার দল। আবার গত ৪ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন বিএনপি যেকোনো সময়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত।

এই পরিপ্রেক্ষিতে , বিভিন্ন অবাস্তব শর্ত পূরণ না হলে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সনদে স্বাক্ষর না করার গুজবটা রাজনৈতিক স্যাটায়ার হিসেবে তৈরি করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে এ সকল পোস্টে অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং সত্য হিসেবে ধরে নিচ্ছেন । তাই সার্বিক বিবেচনায় ফ্যাক্টওয়াচ জুলাই সনদে স্বাক্ষর সম্পর্কিত এ সকল পোস্টকে ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে। 

Claim:
নির্দিষ্ট শর্ত না মানলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না বিএনিপি/জামায়াতে ইসলাম/ ইসলামী ছাত্রশিবির- এমন দাবিযুক্ত কয়েকটি ফটোকার্ড ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। দৈনিক আমার দেশের লোগোযুক্ত এসব কার্ডে প্রতিটা দলের পক্ষে নির্দিষ্ট শর্তের কথা বলা হচ্ছে। যেমন-শিবিরের ক্ষেত্রে দাবি করা হচ্ছে, জুলাই সনদে ১৯৭১ এর গণহত্যার উল্লেখ থাকলে সেখানে শিবির স্বাক্ষর করবে না। আবার বিএনপি ও জামায়াতের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, ভারতকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না। প্রকৃতপক্ষে এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে এমন কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি। দৈনিক আমার দেশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এগুলো ভুয়া ফটোকার্ড । সঙ্গত কারনে ফ্যাক্টওয়াচ এ সকল ফেসবুক পোস্টকে ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh