১৮ আগস্ট ২০২৫ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ (ডাকসু) এর নির্বাচনের জন্য ছাত্রশিবির তাদের প্যানেল ঘোষণা করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্যানেলের নাম রাখা হয়েছে ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। এই ঘোষিত প্যানেলে ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) পদে মনোনয়ন পেয়েছেন আবু সাদিক কায়েম এবং জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে মনোনয়ন পেয়েছেন এস এম ফরহাদ। এই দুজন কর্মীর সাথেই অতীতে ছাত্রলীগ ঘনিষ্ঠতার দাবি উঠেছিল, তবে উভয়েই নিজ নিজ জায়গা থেকে তার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এদিকে, প্যানেল ঘোষণার পর থেকে অনলাইনে ছাত্রলীগের প্যাডে একটি প্রতিবাদলিপি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে সাদিক এবং ফরহাদকে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে ‘তীব্র নিন্দা’ জানানো হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকে এ ধরনের কোনো বিবৃতি দেয়া হয়নি। ছড়িয়ে পড়া বিবৃতিতে বাক্য গঠনসহ বিভিন্ন অসঙ্গতি ও দেখা যাচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় ছড়িয়ে পড়া এ সকল পোস্টকে ফ্যাক্টওয়াচ মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে।
২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে এস এম ফরহাদ নিজেকে দাবি করেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি ২০২২ সালের নভেম্বরে ঘোষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ওই কমিটিতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীর তালিকায় তার নাম দেখা গেছে।
এ বিষয়ে এস এম ফরহাদ তখন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের কোনো কর্মসূচি ও কার্যক্রমের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই। ছাত্রলীগের কোনো পদ-পদবির জন্য কোনো সিভি (জীবনবৃত্তান্ত) আমি কখনো কাউকে দিইনি। বিভাগ-ইনস্টিটিউটের কমিটিতে কাকে রাখা হবে, সেটা সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠনের সিদ্ধান্ত। সেখানে আমাকে কেন জড়ানো হচ্ছে, যেখানে আমি ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নই।’
অন্যদিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির দাবি করেছিলেন, ‘(বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি) সাদিক কায়েমের ছাত্রলীগের একাধিক পদ ছিল। …বিগত ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আমরা যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করেছি সেখানে তিনি আমাদের আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করেছেন। আমাদের কাছে অকাট্য প্রমাণ আছে তিনি মিছিল মিটিং করেছেন। তার একাধিক ছবি, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসছে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে সাদিক কায়েম বলেন, ‘নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগে কখনো আমার কোনো পদ-পদবি ছিল না। ৫ আগস্টের পর ইসলামী ছাত্রশিবির জুলাইয়ের স্পিরিটকে ধারণ করে শিক্ষার্থীবান্ধব ছাত্ররাজনীতি করছে। ছাত্রদল দুর্বৃত্তায়ন ও পেশীশক্তির রাজনীতি শুরু করেছে। আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরে তারা এখন চরিত্র হননের পথ বেছে নিয়েছে।’
সামাজিক মাধ্যমে মিছিল মিটিংয়ের ভিডিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগ হলের শিক্ষার্থীদেরকে জোরপূর্বক প্রোগ্রামে নিয়ে যেত, গেস্টরুম করাত। প্রোগ্রামে স্লোগান দিতে বাধ্য করত, মিছিল মিটিংয়ের ভিডিও ফেসবুকে দেওয়ার জন্য গেস্টরুমে জিজ্ঞাসাবাদ করত। যারা একদিন হলেও হলে ছিল সবাই সেটার প্রত্যক্ষদর্শী। ১ম বর্ষে থাকাকালে আমাদের ব্যাচের সবাইকে জোর করে গেস্টরুমে নিয়ে যায় প্রোগ্রাম করার জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যারা হলে কিছুদিন হলেও থেকেছে প্রত্যেকের এমন ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আছে। ছাত্রদল নেতাদেরও মিছিল-মিটিংয়ের ভিডিও আছে। এই ধরনের ছবি বা ভিডিও ছাত্রলীগের ফ্যাসিবাদের ফলে বাধ্যতামূলক উপস্থিতির ফল, কোনো স্বেচ্ছাসেবী রাজনীতির নয়।’
অর্থাৎ উভয় নেতাই তাদের অতীতে ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে আজ (১৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। তবে সংগঠনটির প্যানেলের আনুষ্ঠানিক নাম রাখা হয়েছে ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। সংগঠনের ঘোষিত প্যানেলে ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) পদে মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও ঢাবি শাখার সাবেক সভাপতি আবু সাদিক কায়েম। আর জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সভাপতি এস এম ফরহাদ।
এই ঘোষণার পরপরই ফেসবুকে আলোচ্য বিবৃতিটি ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। এসব বিবৃতিতে বলা হয়েছে,
“সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের দিয়ে শিবিরের ডাকসু প্যানেল ঘোষণা, ছাত্রলীগের নিন্দা ও প্রতিবাদ ( এই বাক্যটি ২ বার লেখা হয়েছে) আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী সাদিক কায়েম ওসমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগ নেতা এস এম ফরহাদ ভিপি ও জিএস পদে শিবিরের প্যানেল ঘোষণা করেছে। কর্মী হাইজেক করার কারণে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ এর তীব্র নিন্দা জানায়। তারুণ্যের অনুভূতি-নিঃশ্বাস ধারণ করে, তারুণ্যের ভাষায় কথা বলে, তারুণ্যের নেতৃত্বেই বাংলাদেশবিরোধী সকল অপশক্তিকে উৎখাত করবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ।” (বানান অবিকৃত রাখা হয়েছে)
বিবৃতির নিচে এখানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এর সভাপতি হিসেবে সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের নাম ও স্বাক্ষর দেখা যাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অফিসিয়াল ভেরিফাইড পেজ থেকে এমন কোনো বিবৃতি প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। এই পেজ থেকে ১৬ আগস্ট ও ১৭ আগস্ট প্রকাশিত দুটি পুরোনো বিবৃতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছাত্রলীগ থেকে প্রকাশিত প্রতিটি বিবৃতির উপরে ডানপাশে হাতে লিখে তারিখ বসানো হয়, কিন্তু সম্প্রতি ছড়ানো বিবৃতিতে তারিখের জায়গাটা প্রিন্ট করে বসাতে দেখা গিয়েছে। এছাড়া সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরের সাথে সাথে তারিখও বসানো হয়, যা উল্লেখিত বিবৃতিতে অনুপস্থিত।
ছাত্রলীগের পেজ থেকে আসল বিবৃতি
ছড়িয়ে পড়া ভুয়া বিবৃতি
এছাড়া, এই বিবৃতির বানান এবং বাক্যগঠণের ত্রুটিও লক্ষণীয়।
সার্বিক বিবেচনায় ফ্যাক্টওয়াচ এ সকল পোস্টকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে
Claim: ১৮ আগস্ট ২০২৫ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ (ডাকসু) এর নির্বাচনের জন্য ছাত্রশিবির তাদের প্যানেল ঘোষণা করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্যানেলের নাম রাখা হয়েছে ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ।এই ঘোষিত প্যানেলে ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) পদে মনোনয়ন পেয়েছেন আবু সাদিক কায়েম এবং জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে মনোনয়ন পেয়েছেন এস এম ফরহাদ। এই দুজন কর্মীর সাথেই অতীতে ছাত্রলীগ ঘনিষ্ঠতার দাবি উঠেছিল, তবে উভয়েই নিজ নিজ জায়গা থেকে তার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এদিকে ,প্যানেল ঘোষণার পর থেকে অনলাইনে ছাত্রলীগের প্যাডে একটি প্রতিবাদলিপি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে সাদিক এবং ফরহাদকে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে ‘তীব্র নিন্দা’ জানানো হয়েছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh