ফজলুর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা

26
ফজলুর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
ফজলুর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা

বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে একটি তথ্য ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) তালিকায় ফজলুর রহমানের নাম নেই। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, দাবিটি বিভ্রান্তিকর। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বা এমআইএসে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ফজলুর রহমানের নাম রয়েছে। এমআইএস বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্যের ডিজিটাল ভান্ডার। এটি মূলত অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমে সমন্বিত তালিকা হিসেবে পরিচিত। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের দুইজন কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা বলে জানা গেছে, এমআইএসে থাকা তালিকাটিই প্রকৃত তালিকা। কিন্তু এসব পোস্টে শুধুমাত্র জামুকায় নাম না থাকার কথাটি এমনভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে যা থেকে তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে এক প্রকার বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, অনেকেই তাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলেও দাবি করছেন। তাই ফ্যাক্টওয়াচ এসব পোস্টকে বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করছে।

ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে। 

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বা এমআইএসে রয়েছে ফজলুর রহমানের নাম 

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের জেলা ও উপজেলার নাম দিয়ে অনুসন্ধান করা হয়। এতে ফজলুর রহমান সম্পর্কে সচিত্র তথ্য পাওয়া যায়। এখানে ফজলুর রহমানের মুক্তিযোদ্ধার সমর্থনে প্রমাণ বা তথ্য হিসেবে তার লাল মুক্তিবার্তা ও বেসামরিক গেজেটের নাম্বার রয়েছে। নাম্বারগুলো হলো, লাল মুক্তিবার্তা (১১৭০৬০১৩৪) ও বেসামরিক গেজেট (১৯৮৯)। এই দুইটি নাম্বার দিয়ে আলাদা আলাদা অনুসন্ধানেও বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। 

এই এমআইএস সূত্রেই গত ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান জানান, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। 

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) একটি তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি 

অনুসন্ধানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত দপ্তর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শিরোনামে একটি তালিকা পাওয়া যায়। এই তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি। এই তালিকায় ২১ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ফজলুর রহমানের নাম নেই। তবে এই ২১ জনের নাম আবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তালিকায় রয়েছে।

তালিকাটিতে উল্লিখিত বেসামরিক গেজেট নাম্বার সূত্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খোঁজে দেখা যায়, এই ২১ জনের মধ্যে দুই থেকে তিনটি নাম ব্যতীত বাকী নামগুলোর ক্ষেত্রে একটি মন্তব্য/পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এতে লেখা, ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর গেজেট অধিশাখার স্মারক নং- ৪৮.০০.০০০০.০০৪.৩৭.০০৩.২১.২৩১৭, তারিখ- ১২/১২/২০২৩ এর প্রজ্ঞাপন মূলে এবং জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল এর ৭৪তম সভার আলোচ্যসূচি ০৩ নং সিদ্ধান্ত/সুপারিশ মোতাবেক বেসামরিক গেজেট নিয়মিতকরণ করা হলো।’ 

এই মন্তব্য থেকে অনুমান করা যায়, এই নামগুলো জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ৭৪তম সভার আগে অনিয়মিত ছিল। পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই শেষে নিয়মিত করা হয়েছে। 

জামুকার কর্মকর্তারা যা বলছেন

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া দাবিটি সম্পর্কে জানতে ফ্যাক্টওয়াচ থেকে জামুকার সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও কল্যাণ-২ শাখা এবং ঢাকা বিভাগের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই ও জামুকার মামলা তদারকি ও মামলার ডাটাবেইজ হালনাগাদ সংক্রান্ত কার্যক্রম) বীর আমির হামজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। 

তিনি ফ্যাক্টওয়াচকে জানান, ‘কারও নাম যদি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের এমআইএসে থাকে, তবে সেটা বৈধ। জামুকাতে আলাদা কোনো তালিকা থাকে না। মুক্তিযোদ্ধাদের যাবতীয় তথ্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেই থাকে।’ 

পাশাপাশি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ উল্যাহর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তিনি এই ব্যাপারে ফ্যাক্টওয়াচকে জানান, ‘সারা বাংলাদেশের যত মুক্তিযোদ্ধা সবার তালিকা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। ওখানে চেক করে যেটা পাবেন সেটাই। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল কারো আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপারিশ করে।’ 

মোহাম্মদ উল্যাহ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সম্পর্কে তথ্য পেতে এই প্রতিবেদককে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের সহায়তা নিতে বলেন। 

জামুকার ওয়েবসাইট থেকেও সংস্থাটির পরিচালক মোহাম্মদ উল্যাহর বক্তব্যের যোগসূত্র পাওয়া যায়।

সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এটির কার্যক্রম সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ও মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীদের তালিকা প্রণয়ন ও গেজেট প্রকাশের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ প্রদান; (গ) গেজেটভুক্ত কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী যথাক্রমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী নয়, মর্মে তদন্তে প্রমাণিত হলে তার গেজেট ও সনদ বাতিলের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ প্রদান। 

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তি 

গতকাল বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাতে এনসিপি ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্স এশিয়া নামের একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ফজলুর রহমানের দাবিটি নিয়ে পোস্ট করা হয়। পোস্টটি এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক শেয়ার হয়েছে, রিয়েকশন পড়েছে ১১ হাজারের বেশি এবং কমেন্টও পড়েছে এক হাজারের বেশি। 

এসব কমেন্টে ফজলুর রহমানকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে মন্তব্য করেছেন ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। যেমন, এম কামরুল হাসান নামে একজন লিখেছেন, ‘তাহলে কি এতদিন চাপার জোরে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে আসছিল?’ আশরাফুল ইসলাম জনি নামে একজন লিখেছেন, ‘তার মানে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা!’, তৌহিদ ইসলাম নামে একজন প্রশ্ন করে লিখেছেন, ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম কি সেই তালিকায় থাকে?’  

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ফজলুর রহমানের নাম না থাকার দাবিটি Azadir Dak – আজাদির ডাক নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকেও ভাইরাল হয়েছে। এই পেজের পোস্টের কমেন্টবক্সেও ফজলুর রহমানকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন। যেমন, মারুফ আবুল নামে একজন লিখেছেন, ‘এই সমস্ত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার হওয়া দরকার।’ মাওলানা আব্দুস ছাত্তার নামে একজন প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছেন, ‘তাহলে কি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা?’ সাইদুল সাইদুল নামে এক অ্যাকাউন্ট থেকে কমেন্ট এসেছে, ‘ফজু পাগলারে রিমান্ডে নিলে সঠিক সংবাদ বের হবে, সে যে একটি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।’ 

এই দাবি সংক্রান্ত আরও অনেক পোস্টের কমেন্ট সেকশন বিশ্লেষণেও এমন অনেক মন্তব্য পাওয়া যায়, যেখানে ফজলুর রহমানকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলা হচ্ছে। 

তবে বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বা এমআইএসে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ফজলুর রহমানের নাম রয়েছে। এছাড়া জামুকার কর্মকর্তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের বৈধ তালিকা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটকেই সঠিক সূত্র হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। 

এমন প্রেক্ষাপটে ফ্যাক্টওয়াচ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া দাবিটিকে বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করছে। 

Claim:
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) তালিকায় ফজলুর রহমানের নাম নেই

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
Invalid rating

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh