বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতার বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিলের দাবিটি মিথ্যা

324
বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতার বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিলের দাবিটি মিথ্যা
বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতার বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিলের দাবিটি মিথ্যা

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় চার নেতা, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামানের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে- দাবিতে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফ্যাক্টওয়াচের যাচাইয়ে দেখা যায়, দাবিটি মিথ্যা। প্রতিবেদনগুলো করা হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার (৩ জুন, ২০২৫) রাতে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন মন্ত্রণালয়ের একটি অধ্যাদেশের ভিত্তিতে। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। যেহেতু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় চার নেতা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সদস্য ছিলেন, তাই নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, তারা মুক্তিযোদ্ধা। অর্থাৎ, তাদের স্বীকৃতি বাতিল হচ্ছে না।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন প্রতিবেদনগুলো দেখুন- সমকাল, বিবিসি বাংলা, কালের কণ্ঠ (১), যুগান্তর, ঢাকা টাইমস২৪, আমাদের সময় ডটকম, বাংলানিউজ২৪, নিউজ২৪, এখন টিভি, ডেইলি ক্যাম্পাস, ঢাকা মেইল, কালের কণ্ঠ (২), ইত্তেফাক, চ্যানেল২৪। 

ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে।  

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে এই অধ্যাদেশের একটি কপি সংগ্রহ করে ফ্যাক্টওয়াচ। গতকাল মঙ্গলবার (৩ জুন) আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসেলেটিভ ও সংসদ বিভগের মুদ্রণ ও প্রকাশনা শাখা থেকে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অধ্যাদেশটি প্রকাশিত হয়। 

অধ্যাদেশটির ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “বীর মুক্তিযোদ্ধা অর্থ যাঁহারা ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে গ্রামে-গঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিয়াছেন এবং যে সকল ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করিয়া ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাঁহাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়াছিলেন এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাহাদের এই দেশীয় সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছেন এইরূপ সকল বেসামরিক নাগরিক উক্ত সময়ে যাঁহাদের বয়স সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে; এবং সশস্ত্র বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ই.পি.আর), পুলিশ বাহিনী, মুক্তি বাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) ও উক্ত সরকার কর্তৃক স্বীকৃত অন্যান্য বাহিনী, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স, আনসার সদস্য এবং বাংলাদেশের নিম্নবর্ণিত নাগরিকগণও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হইবেন, যথা:-

(ক) হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাহাদের সহযোগী কর্তৃক নির্যাতিত সকল নারী (বীরাঙ্গনা); 

এবং 

(খ) মুক্তিযুদ্ধকালে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ফিল্ড হাসপাতালের সকল ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা-সহকারী।”

বীর মুক্তিযোদ্ধার এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময়  ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সদস্যরা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন। 

একই অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীর সংজ্ঞায় অনুচ্ছেদ ১৫ এর (গ) তে বলা হয়েছে, “মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সহিত সম্পৃক্ত সকল এম. এন. এ (Member of National Assembly) বা এম. পি. এ (Member of Provincial Assembly) যাঁহারা পরবর্তীকালে গণপরিষদের সদস্য (Member of Constituent Assembly) হিসাবে গণ্য হইয়াছিলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী।” 

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে আরও অনুসন্ধানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরীর একটি  বক্তব্য নজরে আসে। তিনি আজ বুধবার (৪ জুন) সকালে ইংরেজি সংবাদপত্র টিবিএসকে বলেন, ‘অবশ্যই তারা বীর মুক্তিযোদ্ধা। কারণ, তাদের নিয়েই মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছিল। সেই সরকারের নির্দেশনা ও পরিকল্পনায়ই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে।’ 

সংবাদপত্রটিকে তিনি আরও বলেন, ‘অধ্যাদেশে মুজিবনগর সরকারে যারা ছিলেন, তাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা ও দিক-নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে।’

অর্থাৎ, সংজ্ঞা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, যেহেতু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামানরা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সদস্য ছিলেন, তাই নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, তারাও বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাদের স্বীকৃতি বাতিল হচ্ছে না। 

দাবিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, জারি করা নতুন অধ্যাদেশকে ‘মিসলিড’ করা হচ্ছে। মুজিবনগরের সরকারের সদস্যরা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই অন্তর্ভুক্ত হবেন। 

প্রেস ব্রিফিংটি দেখুন এখানে। 

সার্বিক বিবেচনায় ফ্যাক্টওয়াচ দাবিটিকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে। 

Claim:
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় চার নেতা, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামানের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে- দাবিতে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh