গণ অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগের মত ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও, ছবি ও সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে মূলত বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। তবে এর মধ্যে অনেক গুজবও দেখতে পাওয়া যায়। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনিরাপত্তার প্রমাণ হিসেবে ফেসবুকে একটি ভিডিও শেয়ার করা হচ্ছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে ভিডিওটি বাংলাদেশের মুসলমান কর্তৃক দেবী কালীর মন্দিরে হামলা চালিয়ে প্রতিমা ভাংচুর এবং মন্দিরের ভেতরে উপস্থিত হিন্দু ভক্তদের হত্যা করার দৃশ্য। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এটা ভারতের পূর্ব বর্ধমানের সুলতানপুরে অবস্থিত একটি কালী মন্দিরের ভিডিও। সেখানে ১২ বছর পর পর ঐতিহাসিক প্রথা অনুযায়ী দেবী কালীর মূর্তি ভেঙ্গে বিসর্জন করা হয়।
ভারতীয় গণমাধ্যম RT India এর এক্স হ্যান্ডেল থেকেও এই একই ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছিল আলোচিত ভিডিওটি বাংলাদেশের মুসলমান কর্তৃক দেবী কালীর মন্দিরে হামলা চালানোর দৃশ্য।
ভাইরাল ভিডিওটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য এর বিভিন্ন কি- ফ্রেম ধরে অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে বিনোদ ঘোষ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ৩ ডিসেম্বর ২০২৪ এ আপলোড করা ভাইরাল ভিডিওর অনুরূপ একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।
ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয় “ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমানের সুলতানপুর গ্রামের শতাধিক বছরের পুরোনো কালীপূজায় প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, ১২ বছর পর পর কুল পুরোহিতেরা ১৩ ফুট দীর্ঘ কালী মূর্তির প্রথমে কড়ি আঙ্গুল ভাঙ্গেন এবং তারপর মূর্তির বাকি অংশ গ্রামের সর্বস্তরের মানুষেরা ভেঙ্গে সেই ভাঙ্গা অংশগুলো একে একে বিসর্জন দেন। বিসর্জন হওয়ার পর আবার নতুন মূর্তি গড়ে পরবর্তী ১১ বছর ওই মূর্তিই পুজো হয়।” এই সূত্র অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক কিছু কি-ওয়ার্ড ধরে অনুসন্ধান করে ধর্মীয় এই অনুষ্ঠানের অন্যান্য কিছু ভিজ্যুয়ালও খুঁজে পায় ফ্যাক্টওয়াচ টিম। সেখানে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক লোক এটি উদযাপন করছে এবং তাতে অংশগ্রহণ করছে।
Comparison between original video and viral video
পরবর্তীতে, দৈনিক স্টেটসম্যান- এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে অনুরূপ বিবরণ উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে প্রথাটি ৬০০ বছরেরও বেশি পুরনো। শুরুতে গ্রামে কামার সম্প্রদায় এই পূজার চর্চা করত এবং তারা পরে মন্ডল পরিবারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে।
অন্যদিকে, গুগল স্ট্রিট ভিউ থেকে কালী মন্দিরের ফেসবুক ভিডিওগুলোর ভিজ্যুয়ালগুলির সাথে তুলনা করলে আরও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, মন্দিরটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সুলতানপুরে অবস্থিত, বাংলাদেশে নয়। তাছাড়া, ‘সেখানে উপস্থিত কোনো হিন্দু ভক্তকে হত্যা করা হয়েছে’ এই দাবির সমর্থনেও নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, একটি ভুয়া সাম্প্রদায়িক আবহ জুড়ে দিয়ে ভাইরাল ভিডিওটিকে বাংলাদেশের ঘটনা দাবিতে শেয়ার করা হচ্ছে। তাই, সবকিছু বিবেচনা করে ফ্যাক্টওয়াচ ভাইরাল পোষ্টগুলোকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh