প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আধ্যাত্মিক চিকিৎসক হিসেবে প্রচার

256
প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আধ্যাত্মিক চিকিৎসক হিসেবে প্রচার
প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আধ্যাত্মিক চিকিৎসক হিসেবে প্রচার

সম্প্রতি ফেসবুকে ‘ড. মালা আলি কুর্দিস্তানি’ নামের একজন ইরাকি আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোরআন পাঠ ও ভেষজ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ সারিয়ে থাকেন বলে দাবি করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, তার চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে না এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে নানা ধরণের প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া যায়। ২০২০ সালে সৌদি আরবে ভুয়া চিকিৎসার অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন এই ব্যক্তি। এছাড়া মালদ্বীপে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তের সাপেক্ষে তাকে ব্ল্যাকলিস্টেড করা হয়। ইতালিতে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার নামে। এমনকি রোগীদের মারধর বা ওজন কমানোর জন্য টিস্যু খাওয়ানোর মত ঘটনারও অভিযোগ পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে।

এমন কিছু ভিডিও দেখুন, এখানে, এখানে এখানে এবং এখানে । (সংবাদ মাধ্যম কালবেলা) এখানে।  

পাকিস্তানি গণমাধ্যম ‘DWAN’ এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,  তার আসল নাম আলি কলাক, তার জন্ম ইরাকের কুর্দিস্তানের এরবিল প্রদেশে। এখানেই তিনি তার ‘চিকিৎসা কেন্দ্র’ প্রথমবার স্থাপন করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংবাদমাধ্যম ‘The Insight International’ এর এক প্রতিবেদনের মতে, তিনি একজন নারীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যদি সে প্রতিদিন তিনবার উটের দুধের সাথে মিশ্রিত একটি ছোট কাপে উটের প্রস্রাব পান করে তাহলে তার স্তন ক্যান্সার নিরাময় করা সম্ভব। একই সংবাদমাধম্যের অন্য একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, তিনি ইরাকি কুর্দিস্তানে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতির প্রচারণা চালাচ্ছিলেন । 

পাকিস্তানি পত্রিকা ‘mmnews’ তাদের একটি প্রতিবেদনে তুলে ধরেন, আলি একজন নারী রোগীকে ওজন কমাতে শুধুমাত্র টিস্যু পেপার খাওয়ার পরামর্শ দেন। পরামর্শ অনুসরণ করার পর ওই নারী গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকরা তার পেট থেকে প্রায় ২০টির মত টিস্যু উদ্ধার করেন। হাসপাতালের স্টাফ যখন আলি কুর্দিস্তানিকে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেন, তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করেন । 

তার প্রকাশিত একটি ভিডিও সম্পর্কে ইরাকের গণমাধ্যম ‘Ruwda’ একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। জানা যায়, সেই ভিডিওতে তিনি আঙ্গুল চেটে এবং চোখে স্পর্শ করে একজন অন্ধ ব্যক্তিকে সুস্থ করে দেওয়ার দাবি করেন। এই প্রদর্শনী সৌদি পুলিশের নজরে আসার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দাবিকৃত অন্ধ ব্যক্তি পরবর্তীতে  টিভি চ্যানেলগুলোতে  উপস্থিত হয়ে বলেন যে, তিনি অন্ধ নন এবং কুর্দিস্তানি মিথ্যা বলেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেন তিনি মানুষকে ‘রোগী’ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য পাকিস্তান থেকে সৌদিতে আনেন।

মালদ্বীপের গণমাধ্যম ‘SUN SIYAM’ এর একটি প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানানো হয়, আলি ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যটক ভিসায় মালদ্বীপে আসেন। এ সময় তিনি কোরআনের আয়াত পাঠ করে শ্রবণ ও দৃষ্টিহীন রোগীদের চিকিৎসা করার দাবি করেন। তবে জানা যায়, তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়াই চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছিলেন। ফলে, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে ‘ব্ল্যাক লিস্ট’ করে এবং ভবিষ্যতে মালদ্বীপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

২০২৩ সালের ৩ আগস্ট তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে আলি কুর্দিস্তানির অফিসে পুলিশ অভিযান চালায় বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তুর্কি গণমাধ্যম RUVAR। এই অভিযানটি তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। পুলিশের তদন্তে জানা যায় যে, কুর্দিস্তানি রোগীদের চিকিৎসার নামে তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন।

এছাড়া তার নামে আর্থিক প্রতারণারও অভিযোগ পাওয়া যায়। একজন ইতালিতে বসবাসরত আলবেনিয়ান অভিবাসী ইতালির গণমাধ্যম ‘TAVA news’ কে অভিযোগ করেছেন যে, তিনি তার অসুস্থ আত্মীয়ের চিকিৎসার জন্য ড. মালা আলি কুর্দিস্তানিকে ১,৪০০ ইউরো প্রদান করেছিলেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অর্থ প্রদান করার পর, অভিযোগকারী বুঝতে পারেন যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

মালা আলি কুর্দিস্তানি তার নিজস্ব ওয়েবসাইটে দাবি করেছেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের লিবার্টি ইউনিভার্সিটি (Liberty University) থেকে মনোরোগবিদ্যায় (Psychiatry) মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, লিবার্টি ইউনিভার্সিটিতে মনোরোগবিদ্যা বিষয়ে কোনো এম.এ বা পিএইচডি প্রোগ্রাম নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত অনলাইনভিত্তিক কোর্স প্রদান করে এবং তাদের পাঠ্যক্রমে ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রি বা এ ধরনের ডিগ্রির কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, তার “ডক্টর” বা “পিএইচডি” পরিচয় নিয়েও বিস্তারিত কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এসব ঘটনা একত্র করলে বোঝা যায় যে তার কার্যক্রম নিশ্চিতভাবে বৈধ বা নিরাপদ নয়। এবং তিনি সামাজিক মাধ্যমে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অসহায়ত্বকে ব্যবহার করে বিতর্কিত ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশে তাকে এক ধরণের অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ডাক্তার হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কোনো ধরণের যাচাই বাছাই ছাড়াই তার ‘চিকিৎসা’ পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমে প্রতিবেদন হচ্ছে। কমেন্টে অনেকেই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা উচিত বলে মনে করছেন।

তাই সার্বিক বিবেচনায় এসব ফেসবুক পোস্টকে ফ্যাক্টওয়াচ “মিথ্যা” হিসেবে চিহ্নিত করছে।

সিবলী সাদিক সিফাত, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ।

No Factcheck schema data available.

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh