ছয় বছরের ব্যবধানে আবারও হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এ নিয়ে ফেসবুকে কিছু পোস্ট শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ডাকসু নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। এ নিয়ে বিবিসি বাংলার ফেসবুক পেজসহ সংবাদমাধ্যমটির লাইভ পাতাতে দাবি করা হয়েছে, 'স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্যানেল ঘোষণা দিয়ে ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদে নির্বাচন করতে যাচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে শিবিরের পক্ষ থেকে গোপনে প্যানেল দেওয়া হলেও প্রকাশ্যে প্রচারণা করতে দেখা যায়নি বলে সেই সময়ের ছাত্রনেতারা জানিয়েছেন।' দেশীয় ইংরেজি সংবাদমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদনেও প্রায় একই দাবি করা হয়েছে। একই তথ্য দিয়েছে দৈনিক সংবাদপত্র খবরের কাগজও। তবে ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অন্তত ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮২, ১৯৮৯, ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র শিবির প্রকাশ্যে প্রার্থী কিংবা প্যানেল ঘোষণা করেছে এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন ও ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন ও ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে। খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য ডাকসু নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে নবম নির্বাচন। এর আগে ১৯৭২, ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮২, ১৯৮৯, ১৯৯০ ও ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়।
পুরোনো পত্রিকার অনলাইন সংগ্রহশালা সংগ্রামের নোটবুকের সাহায্যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বছরগুলোর সংবাদপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, চলতি ডাকসু নির্বাচনের আগে অন্তত ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮২ ও ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র শিবির প্রকাশ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে।
ডাকসু নির্বাচন ঘিরে ১৯৭৯ সালের ২৪ জুলাই তৎকালীন সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে সহসভাপতি পদে নির্বাচন করেন আবু তাহের এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচন করেন আব্দুল কাদের বাচ্চু।
১৯৭৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের অংশগ্রহণ। ছবিঃ সংগ্রামের নোটবুকের সৌজন্যে দৈনিক ইত্তেফাকের ১৯৭৯ সালের ২৭ জুলাইয়ের সংবাদ
একই দিনে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়।
১৯৮০ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবির
পুরোনো সংবাদপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৮০ সালের ১৭ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনেও ইসলামী ছাত্রশিবির অংশগ্রহণ করেছে এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে। তৎকালীন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ১৭ নভেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির অংশগ্রহণ করেছে।
এই নির্বাচন নিয়ে দৈনিক গণকণ্ঠে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৮০ সালের ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করে ছাত্রশিবিরের তাহের-কাদের পরিষদ। এ ছাড়া হলগুলোতেও শিবিরের প্রচারণার ব্যাপারে জানা যায় এই প্রতিবেদন থেকে।
১৯৮০ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের অংশগ্রহণ। ছবিঃ সংগ্রামের নোটবুকের সৌজন্যে সে সময়কার বিভিন্ন পত্রিকা
এটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮২ সালের ২৩ জানুয়ারি। এই দিন দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই নির্বাচনেও শিবিরের অংশগ্রহণ ছিল। এতে ছাত্রশিবির থেকে ভিপি ও জিএস পদে নির্বাচন করেন এনামুল হক মঞ্জু ও আব্দুল কাদের বাচ্চু।
১৯৮২ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের প্রচারণায় গ্রেনেড হামলা।ছবিঃ সংগ্রামের নোটবুকের সৌজন্যে দৈনিক ইত্তেফাক থেকে
একই পত্রিকায় ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ডাকসুর ১৯৮২ সালের এই নির্বাচন ঘিরে ইসলামী ছাত্রশিবিরের মিছিলে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ২২ জন আহত হন। এর প্রতিবাদে শিবিরের কর্মীরা ঢাবি ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করে।
১৯৮৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবির
এটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। ডাকসুর এই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে শামসু-আমিন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেয়। দৈনিক ইত্তেফাকে ওইদিন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ছাত্রশিবির থেকে আ ন ম শামসুল ইসলাম ভিপি পদে এবং আমিনুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করেন।
প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, এই ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরসহ ৭টি প্যানেল নির্বাচন করে।
১৯৮৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবির। ছবিঃ সংগ্রামের নোটবুকের সৌজন্যে দৈনিক ইত্তেফাক থেকে
ইত্তেফাকের এই প্রতিবেদনে ছাত্রশিবির থেকে মনোনীত শামসু-আমিন প্যানেলের বাকি সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ডাকসুর এই নির্বাচনে ভিপি-জিএসসহ মোট ২০টি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবির
১৯৯০ সালের ২৭ মে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালের এই নির্বাচনে ৩০টি প্যানেল মনোনয়ন জমা দেয়। এর মধ্যে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ভিপি পদে মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, জিএস পদে মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান ও এজিএস পদে শফিকুল আলম হেলাল মনোনয়নপত্র জমা দেন। দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য জানা যায়।
১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের অংশগ্রহণ। ছবিঃ সংগ্রামের নোটবুকের সৌজন্যে সে সময়কার বিভিন্ন পত্রিকা
উপরিউক্ত তথ্যসমূহের ভিত্তিতে এটি নিশ্চিত হওয়া যায়, ডাকসু নির্বাচনে এবারই প্রথম বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করছে না। এর আগেও একাধিক ডাকসু নির্বাচনে সংগঠনটি প্রতিদ্বন্ধিতা করে এবং প্রকাশ্যেই নির্বাচনী প্রচারণা চালায়। যদিও পুরোনো পত্রিকাগুলোতে অধিকাংশ ডাকসু নির্বাচনের পুর্ণাঙ্গ প্যানেলের তালিকা পাওয়া যায় না। এসব পত্রিকার প্রতিবেদনে কেবল ভিপি-জিএসের নাম রয়েছে। কোনো কোনোটিতে এজিএসের নাম পাওয়া যায়। তবে ১৯৮৯ সালের ডাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অংশ নেওয়া ৭টি প্যানেলের মধ্যে তিনটি প্যানেলের পূর্ণাঙ্গ তালিকাই পাওয়া যায়। যার মধ্যে শিবিরের প্যানেলও রয়েছে। ফলে ফ্যাক্টওয়াচ ডাকসু নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্রার্থী কিংবা প্যানেল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-এমন দাবিতে প্রচারিত ফেসবুক পোস্টগুলোকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে।
Claim: ছয় বছরের ব্যবধানে আবারও হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এ নিয়ে ফেসবুকে কিছু পোস্ট শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ডাকসু নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। এ নিয়ে বিবিসি বাংলার ফেসবুক পেজসহ সংবাদমাধ্যমটির লাইভ পাতাতে দাবি করা হয়েছে, 'স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্যানেল ঘোষণা দিয়ে ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদে নির্বাচন করতে যাচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে শিবিরের পক্ষ থেকে গোপনে প্যানেল দেওয়া হলেও প্রকাশ্যে প্রচারণা করতে দেখা যায়নি বলে সেই সময়ের ছাত্রনেতারা জানিয়েছেন।'
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh