ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেন্দি সাফাদির সাথে জামায়াত আমিরের গোপন বৈঠক- এমন দাবিতে একটি খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দৈনিক আমার দেশের লোগোযুক্ত একটি পত্রিকার প্রথম পাতার ছবি দেখা যাচ্ছে এসব পোস্টের সাথে। তবে অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, দৈনিক আমার দেশে এমন কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। আর ইসরায়েলের নাগরিক মেন্দি এন সাফাদির সাথে জামায়াতের আমিরের কখনো কোনো যোগাযোগ হয়েছে কিনা, সেটি ফ্যাক্টওয়াচ স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এসব পোস্টে মূলত একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতার আদলে তৈরি একটি ছবি যুক্ত করা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশের লোগোযুক্ত এই পাতায় কেবলমাত্র ২ টি কলাম দেখা যাচ্ছে (সাধারনত ব্রডশিট পত্রিকায় আটটি কলাম থাকে) । পূর্ণ ২ কলাম জুড়ে একটি শিরোনাম- “ইসরাইলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা মিন্দি সাফাদির সাথে জামায়েত আমিরের গোপন বৈঠক’’ (বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)
প্রতিবেদনের যে অংশটুকু দৃশ্যমান, সেখানে লেখা রয়েছে- “সম্প্রতি জামায়াতের আমির ডাঃ শফিকুর রহমান দুবাই সফরে গিয়ে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা হোটেলে ইষরাইলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা মিন্দি সাফাদির সাথে গোপন বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। সূত্রটি জানায়, দুবাই সফরের সময় জামায়াত আমির ও মিন্দি সাফাদির মধ্যে ওই হোটেলে একান্তে বৈঠক হয়। বৈঠকের বিষয়ে বিশদ তথ্য জানাতে চাইলেও সূত্রটি এ বিষয়য়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।”
এরপর একটি ‘বক্স’ এর ভিতরে ‘মিন্দি সাফাদির স্তীকারোক্তি’ উপশিরোনামে লেখা হয়েছে, এদিকে বৈঠকের বিষয়টি স্বীকার করেছেন ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা মিন্দি সাফাদি। আরোও বলা হচ্ছে, কোন বিষয়ে কথা হয়েছে তিনি তা বিস্তারিতভাবে বলতে রাজি হননি।
এরপরে উদ্ধৃতি হিসেবে বলা হয়েছে- “আমি জামাাত আমিরের সাথে দুবাইয়ে একটি বৈঠক করেছি,তবে আলোচনার বিষয়টি প্রকাশ করতে পারব না। –মিন্দি সাফাদি,ইসরাইলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা’’ (সবক্ষেত্রে বানানগুলো অবিকৃত রাখা হয়েছে)
দৈনিক আমার দেশের ফেসবুক পাতা ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে তাদের পেজ থেকে এ ধরনের কোনো ছবি প্রকাশিত হয়নি। আমার দেশের ওয়েবসাইটের ‘ইপেপার’ ভার্সন থেকে দেখা যাচ্ছে, তাদের প্রথম পাতায় ৬ টি কলাম থাকে এবং বিজ্ঞাপন থাকে। (আলোচ্য ছবিতে কোনো বিজ্ঞাপন ছিলনা)
গত কয়েকদিনের পত্রিকাগুলোর ফ্রন্ট পেজ ঘেঁটে দেখা গেল, জামায়াত আমির সম্পর্কিত এমন কোনো স্টোরি প্রকাশিত হয়নি। এই শিরোনামটি ব্যবহার করে সার্চ ইঞ্জিনে অনুসন্ধান চালিয়েও পুরোনো কোনো প্রতিবেদন দেখা যায়নি।
আমার দেশ পত্রিকার আদলে এই পেজটি তৈরি করা হলেও প্রচুর অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। যেমন-
বিষয়
মূল পত্রিকা
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ছবি
১।স্লোগান
স্বাধীনতার কথা বলে
স্বাধীনতা ও সত্যের পক্ষে
২। বিজ্ঞাপনের অবস্থান
পত্রিকার নামের নিচেই কয়েকটি ক্ষুদ্র বিজ্ঞাপন থাকে
বর্ষ ১২ সংখ্যা ৭ (২৯ সেপ্টেম্বের ,২০২৬ এ প্রকাশিত সংখ্যা)
বর্ষ ১২ সংখ্যা ৩৬৭
পত্রিকাটির বর্ষ এবং সংখ্যা বিষয়ে একটি মারাত্মক ভুল দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। পত্রিকার নামের নিচে ‘বর্ষ ১২ সংখ্যা ৩৬৭’ লেখা ছিল, যা কোনো হিসাবেই বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, একটি পূর্ণ বছরে ৩৬৫ দিন। সেক্ষেত্রে ১২ বর্ষ ৩৬৭ সংখ্যা হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় (এই স্থলে বর্ষ ১৩ সংখ্যা ২ হতে পারতো)।
উল্লেখ্য, দৈনিক আমার দেশ ২০০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করেছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একটানা ১১ বছর পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ ছিল। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তারা ‘বর্ষ ১২ সংখ্যা ১’ হিসেবে গণনা করছে । সেই হিসেবে ‘বর্ষ ১২ সংখ্যা ৩৬৭’ পাওয়া যাবে ২০২৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখে। অর্থাৎ পত্রিকাটির যে কপি এখনো ছাপা হয়নি, সেদিনের ফ্রন্ট পেজের একটি কপি হিসেবে এই ছবিটি আবির্ভূত হয়েছে।
পত্রিকাটিতে তারিখ হিসেবে লেখা রয়েছে- ৯ আশ্বিন ১৪৩২, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে সেটি ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫। আমার দেশের সেদিনের ইপেপার থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রথম পাতায় ৮ টি খবর ছাপা হলেও জামায়াতের আমিরকে নিয়ে কোনো খবর এখানে প্রকাশিত হয়নি। এছাড়া, দুটি পাতাতেই ‘৯ আশ্বিন ১৪৩২’ তারিখে লেখা থাকলেও পাতার আঙ্গিকে আকাশ পাতাল পার্থক্য।
এআই এর ব্যবহার
ছড়িয়ে পড়া পত্রিকাটির ছবিতে, ডানের কলামে বক্স আকারে যে কথাগুলো দেখা যাচ্ছে, সেখানে উল্লেখযোগ্য দুটি ভুল বানান রয়েছ- স্তীকারোক্তি (স্বীকারোক্তি) ও জামাাত (জামায়াত বা জামায়েত)। এ ধরনের ভুল একটি গণমাধ্যমে দেখা যায়ই না বলা চলে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) এর সাহায্যে বাংলা কথাযুক্ত ছবি বা ব্যানার ডিজাইন করতে গেলে এই ধরনের বানান ভুল প্রায়ই দেখা যায়।
বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য কয়েকটি এআই শনাক্তকারী টুলের সাহায্যে যাচাই করার চেষ্টা করা হয়। হাইভ ডিটেক্ট, ডিপ এআই, জিরো জিপিটি, সাইট ইঞ্জিন, ডিপ এআই ইত্যাদি টুলগুলো তাদের বিশ্লেষণে জানায়, এই ছবির অধিকাংশ অংশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি।
প্রসঙ্গ: মেন্দি সাফাদি
মেন্দি এন সাফাদির ফেসবুক প্রোফাইলে তার পরিচয় হিসেবে লেখা রয়েছে, তিনি ‘সাফাদি সেন্টার’ এর প্রধান। এই সাফাদি সেন্টার আন্তর্জাতিক কূটনীতি, গবেষণা ও জনসংযোগের কাজ করে।
বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের সাথে বিভিন্ন সময়েই তার নাম শোনা গেছে। ২০১৬ সালে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সাথে এই মেন্দি সাফাদি ভারতে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে সরকার পতনের পরিকল্পনা করছেন –এমন অভিযোগে মামলা করা হয়। সেই মামলায় আসলাম চৌধুরী দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন।
এর কিছুদিন পরেই গুঞ্জন ওঠে,তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র ও তার তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাথেও মেন্দি সাফাদির বৈঠক হয়েছে। বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে মেন্দি দাবি করেন, আগের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে নিউইয়র্কে তাদের বৈঠক হয়েছিল। সজীব ওয়াজেদ জয় আবার দাবি করেন, তাদের মধ্যে কোনো সাক্ষাৎ হয়নি।
২০২৩ সালে গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরের সাথে মেন্দি সাফাদির একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দাবি করা হচ্ছিল, কাতারে তাদের সাক্ষাৎ হয়েছে এবং এই ছবিটা তখনই তোলা। এ সময় নুরুল হক নুর তাদের সাক্ষাতের বিষয়টি অস্বীকার করলেও মেন্দি সাফাদি সাক্ষাতের বিষয়টি স্বীকার করেন। ২ বছর পরে, ২০২৫ এর জুলাইয়ে একটি আলোচনা সভায় এই প্রসঙ্গটি আলোচিত হলে, নুরুল হক নুর তখন মেন্দি সাফাদির সাথে তার সাক্ষাতের বিষয়টি স্বীকার করেন।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এই মেন্দি সাফাদির সাথে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের সাক্ষাৎ নিয়ে একধরনের লুকোচুরি চলেছে।
সাম্প্রতিক অভিযোগের ব্যাপারে জামায়াত আমিরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ বা দলীয় কোনো হ্যান্ডেল থেকে এখনো কোনো বক্তব্য আসেনি। ২০২৫ এ গুঞ্জন উঠেছিল, জামায়াতের আমির গোপনে কাতার সফর করেছেন। তখন সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে জামায়াতে ইসলামী এই দাবিকে ‘গুজব’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইট থেকে জানা যাচ্ছে, অতীতে তিনি দুবাই সহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চীন সফর, অক্টোবর-নভেম্বরে একাদিক্রমে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্য সফরের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এসব সফরে কোনো ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাথে জামায়াত আমিরের সাক্ষাত হয়েছিল মর্মে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয়নি।
ফ্যাক্টওয়াচের সিদ্ধান্ত
জামায়াতের আমিরের সাথে মেন্দি এন সাফাদির বৈঠকের তথ্যটি ফ্যাক্টওয়াচের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে এ প্রসঙ্গে দৈনিক আমার দেশের যে ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এই ছবিযুক্ত পোস্টগুলোকে ফ্যাক্টওয়াচ ‘বিকৃত’ সাব্যস্ত করছে।
Claim: ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেন্দি সাফাদির সাথে জামায়াত আমিরের গোপন বৈঠক- এমন দাবিতে একটি খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দৈনিক আমার দেশের লোগোযুক্ত একটি পত্রিকার প্রথম পাতার ছবি দেখা যাচ্ছে এসব পোস্টের সাথে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh