অনুমোদনহীন ভুয়া লোন অ্যাপের ফাঁদে ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থ

122
অনুমোদনহীন ভুয়া লোন অ্যাপের ফাঁদে ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থ
অনুমোদনহীন ভুয়া লোন অ্যাপের ফাঁদে ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থ

ঘরে বসে অনলাইনে অ্যাপের মাধ্যমেই আর্থিক ঋণ পাওয়ার কিছু চটকদার বিজ্ঞাপন অনলাইনে দেখা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এসব অ্যাপ সম্পর্কে সতর্ক করে বলছে যে এসব অ্যাপ থেকে গ্রাহকের ক্ষতি হতে পারে। সরেজমিনে এমন কয়েকটি অ্যাপ এবং তাদের পেছনের ফেসবুক পেজ ঘেঁটে মনে হল, অনলাইনে একটু কম সচেতন ব্যক্তিরা সহজেই নিজেদের স্পর্শকাতর তথ্য এখানে দিয়ে বিপদে পড়তে পারেন। কিছু কিছু অ্যাপ  ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে উল্টো ‘জামানত’ হিসেবে প্রথমে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। আবার, বিজ্ঞাপনে খুব সামান্য সুদের হারের প্রলোভন দেখানো হলেও, ঋণ নিতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে সুদ বা বিভিন্ন চার্জ হিসেবে অনেক বেশি হারে অর্থ দাবি করা হচ্ছে।  সর্বোপরি এসব অ্যাপের উপরে বাংলাদেশ ব্যাংক বা কোন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কোনো হস্তক্ষেপ নেই।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এমন কয়েকটি বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে। 


‘অনলাইন ব্যাংকিং লোন ০১’ নামের পেজে ১০ মিনিটের একটি ভিডিওতে ‘লোন স্টোর বিডি ডট কম’ এর বিজ্ঞাপন দিতে দেখা যায়। ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যাচ্ছে, মূল ঋণ পাওয়ার জন্য প্রথমে কিছু টাকা জামানত হিসেবে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। যেমন- কেউ ৫,০০০ টাকা পেতে চাইলে আগে তাকে ৫০০ টাকা বিকাশে জামানত পাঠাতে হবে। এরপর ৫,৫০০ টাকা একবারে ঋণ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ঋণের জন্য রেজিস্ট্রেশনের এক পর্যায়ে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এই বিজ্ঞাপনে ইউটিউবার স্যামের ২০২৩ সালের অনলাইন প্রতারণা নিয়ে সচেতনতামূলক একটি ভিডিওর অংশবিশেষ কেটে এই প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়েছে।

এসব ঋণের জন্য ফেসবুকে কয়েকটি গ্রুপও গড়ে উঠেছে। যেমন ‘বাংলাদেশ ইমার্জেন্সি লোন সার্ভিস’ কিংবা ‘লোন দেওয়া হয়..ইমার্জেন্সি’। এসব ফেসবুক গ্রুপে ঘুরে ফিরে অল্প কয়েকটি আইডিকে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ঋণ সংস্থার হয়ে অনবরত বিজ্ঞাপন দিতে।

ফেসবুক ছাড়াও ইউটিউবে এবং বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মধ্যে এই ঋণের অ্যাপের বিজ্ঞাপনগুলো দেখা যাচ্ছে।




পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণের প্রলোভন

‘ইসলামিক লোন বাংলাদেশ’ নামক এই পেজটি যাত্রা শুরু করেছিল এই বছরের ৩১ জুলাই। প্রোফাইল পিকচার এবং কভার ফটোতে তারা ইসলামী ব্যাংকের লোগো ব্যবহার করছে। লোন নেওয়ার জন্য তারা ইসলামী ব্যাংকের এই লিঙ্ক ব্যবহার করার অনুরোধ করছে-  https://islamibankpcl.com/

কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত ইউআরএল হল এটি- https://www.islamibankbd.com/ ।

Md Shofiqul Islam নামক এক ফেসবুক ব্যবহারকারীকে দেখা যাচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণ পাইয়ে দেওয়ার বিজ্ঞাপন দিতে। তবে এজন্য তিনি ব্র্যাক ব্যাংকের ওয়েবসাইট বা কোনো সুপরিচিত লিঙ্ক ব্যবহার না করে, আগ্রহীদেরকে হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইমোতে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করছেন।

ইনবক্সে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, প্রথমে প্রসেসিং ফি হিসেবে ৫৩০ টাকা দিতে হবে।


টাকা দিতে রাজি হয়ে একটি ঠিকানা চাইলে , “শেখ ম্যানশন, ৩৬৮/৪০৫ রংপুর রোড, বড়গোলা, বগুড়া ৫৮০০’’ এই ঠিকানাটি দেওয়া হয়, যে ঠিকানাটি প্রকৃতপক্ষে বগুড়া শাখা ব্র্যাক ব্যাংকের ঠিকানা।

অধিকতর অনুসন্ধানে দেখা গেল, Brac Bank নামক আনভেরিফায়েড ভুয়া পেজ খুলেও এই ধরনের ঋণের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে এই পেজে বিশেষভাবে টার্গেট করা হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের, এবং তাদের পাসপোর্ট ও আকামার (কাজের অনুমতিপত্র) ছবি দিয়ে নিবন্ধন করতে বলা হচ্ছে। যে ধরনের বিজ্ঞাপন ব্র্যাক ব্যাংকের ভেরিফায়েড পেজ থেকে কখনোই দেখা যায়নি। 

ব্র্যাক ব্যাংকের মতই আরেকটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান –নগদের নামেও এই ধরনের ঋণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।



পেজগুলোর অস্বাভাবিক আচরন

‘ইসলামিক লোন বাংলাদেশ’ নামক পেজের ফলোয়ার এখন পর্যন্ত ৬৯৪ জন। অথচ এই পেজের একটি পোস্টই অস্বাভাবিকভাবে শেয়ার হয়েছে ৫৩৫ বার। এই একাউন্টে ১০০০ ফলোয়ার থাকলেও বেশ কিছু পোস্টে শেয়ার ২০০০ বা তার বেশি। আরোও অস্বাভাবিক হচ্ছে যেসব পোস্ট ২০০০ শেয়ার হয়েছে সেখানে রিয়েকশন ১৫-২০ টি আর কমেন্ট ২-৩ টি। একই ঘটনা গ্রামীণ লোনের এই পেজেও, মোট ফলোয়ারের চেয়ে একটি পোস্টে শেয়ার বেশি। (৩৯২ ফলোয়ারের বিপরীতে ৫১০ শেয়ার) ।


ফেসবুকে এসব বিজ্ঞাপনের কমেন্ট বক্সে কোথাও কোথাও অস্বাভাবিক কমেন্ট দেখা যায়। যেমন এই পোস্টে ১০৭ টি কমেন্ট। এখানে সবাই এই ঋণ অ্যাপ সম্পর্কে  ইতিবাচক মন্তব্য করছে। এসব মন্তব্যের ফাঁকে, অ্যাপ সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য পাওয়া দুরুহ হয়ে যাচ্ছে।



অনুসন্ধানে আইডিগুলো পর্যেবক্ষণ করলে ‘Coordinated Inauthentic Behavior (CIB)’ বা সংঘবদ্ধ ভুয়া প্রচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়। যাকে অনেকে ‘বট নেটওয়ার্ক’ হিসেবেও চিহ্নিত করে থাকেন।

GrameenLoan24.com পেজের একটি পোস্টের নিচে থাকা মন্তব্যের প্রথম ৪৪টি মন্তব্য নিয়ে পর্যালোচনা করা হয় । সবগুলো মন্তব্যই ইতিবাচক এবং এর মধ্যে ৩২টিতে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা দিয়ে ঋণ পাওয়ার দাবি করা হচ্ছে। মন্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষ কিছু প্যাটার্ন পাওয়া যায়। যেমন, ৩২ জনের প্রত্যেকেই জমা দেওয়া টাকার ঠিক ১১ গুণ বেশি ঋণ হিসেবে পাওয়ার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে জমার অঙ্কও কেবল ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর বাইরে কোনো অঙ্কের উল্লেখ নেই। এই ১১ গুণের হিসাবটি পেজের বিজ্ঞাপনে দেওয়া প্রস্তাবের সঙ্গেও মিলে যায়। যেমন, ৫০০ টাকা জামানতের বিপরীতে ৫,৫০০ টাকা ঋণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর থেকে প্রশ্ন উঠে যে, মন্তব্যগুলো কি আসল না কি বিজ্ঞাপনেরই পুনরাবৃত্তি?

দাবিকৃত জমা (টাকা)দাবিকৃত প্রাপ্ত ঋণ (টাকা)অনুপাতমন্তব্যকারীর সংখ্যামন্তব্যকারীদের নাম
৫,০০০৫৫,০০০১১ গুণ৭Ujayer Islam; মারাজুন বেগম; Tarek; Safi Khan Himel; Mst Fahmida; Moyna Mia; মোছা ফাতিরা
৬,০০০৬৬,০০০১১ গুণ৬Mis Sumi Talukdar; Habib Ahmed; Hussain Mulla; Ataur Rahman; Minara Akter; Niha Jannat
৭,০০০৭৭,০০০১১ গুণ৫বখল মিয়া; Raisa Khan; Somuj Ali; Olinur Rhman; ফুলতেরা বেগম
৮,০০০৮৮,০০০১১ গুণ৫Maisah Akter Rimu; Azbor Mia; Tamanna Begum; Rehena Akter; Kolim Uddin Milon
৯,০০০৯৯,০০০১১ গুণ৪Rabeya Begum; Abdus Salam; Raju Mia; Nipa Begum
১০,০০০১,১০,০০০১১ গুণ৫হালিমাতুজ সাদিয়া; Bisi Mia; Manik Ahmed; Kazi Korim; মরিয়ম আক্তার
মোট—কোনো ব্যতিক্রম নেই৩২—


ইতিবাচক মন্তব্যকারী এসব আইডির প্রোফাইল ঘাটলে দেখা যাচ্ছে, তাদের কারো প্রোফাইলেই কোনো স্ট্যাটাস বা পোস্ট নেই, তাদের ফ্রেন্ডলিস্টেও কোনো বন্ধু নেই (কয়েকজনের কিছু ফলোয়ার আছে), এবং তাদের প্রায় সবার প্রোফাইলেই সর্বশেষ পোস্ট হিসেবে একই লিঙ্ক শেয়ার করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের কমেন্টের রিপ্লাইতে কেউ কিছু বললে তারা সেটারও উত্তর দিচ্ছেন না। কিছু কিছু পেজে আবার কমেন্ট সেকশন বন্ধ রাখা হয়েছে।  


একই ধরনের বট নেটওয়ার্কের কমেন্ট দেখা যায় ‘হালাল লোন’ এবং ‘ইসলামী অনলাইন’ নামক পেজের স্পন্সর্ড পোস্টে।


বিপরীত চিত্র দেখা যায় ‘জাগরণী ই-লোন’ নামক পেজের এই স্পন্সর্ড পোস্টে। এখানে ৬৫ টা কমেন্টের মধ্যে সবাই লোন নিতে চাচ্ছে কিংবা হতাশ হয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছে। ইতিবাচক মন্তব্য দেখাই যাচ্ছেনা। 




প্লে স্টোরে এই এ্যাপের রিভিউতেও বেশ কিছু ‘গ্রাহক’ কে দেখা যায়, এই এ্যাপ সম্পর্কে খুবই ইতিবাচক মন্তব্য করতে। ফেসবুকের মত গুগল প্রোফাইল ভিজিট করার যেহেতু কোনো সুযোগ নেই, তাই এই গ্রাহকদের অন্যান্য কর্মকান্ড যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে এই সকল মন্তব্য সবগুলোই খুবই শুদ্ধ এবং পরিশীলিত ভাষায় লেখা হয়েছে, যেখানে বানান ভুল বা ব্যকরণগত কোনো ভুল চোখে পড়ছে না।

অসংখ্য ইতিবাচক মন্তব্যের ভিড়ে প্লেস্টোরে মাত্র কয়েকটি নেতিবাচক কমেন্ট দেখা যায়, যেখানে এসব অ্যাপ ইনস্টল করে অন্যদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।




এডিটেড ভিডিওর ব্যবহার

চার বছর আগে বিকাশ এবং সিটি ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে ‘ডিজিটাল ন্যানো লোন’ নামে একটি সেবা শুরু হয়। এই সংবাদটি সময় নিউজ, চ্যানেল টুয়েন্টিফোর সহ একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রচার করেছিল। সময় নিউজের এই ভিডিওর প্রথম অংশ বর্তমানে অনেক ঋণ অ্যাপের বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হতে দেখা যাচ্ছে। এসব ভিডিওতে সময় সংবাদের মূল প্রতিবেদনের প্রথম অংশ রাখা হয় ঠিকঠাকমত। সেখানে সাংবাদিককে বলতে শোনা যায়- ‘দেশে প্রথমবারের মত চালু হলো ডিজিটাল ক্ষুদ্র ঋণ সেবা। এখন ঘরে বসেই অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহক ঋণ নিতে পারবেন। গ্রাহককে এখন থেকে আর এনজিও বা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হবে না।’ এর কিছুক্ষণ পরেই সময় সংবাদের মূল ভিডিওটি বন্ধ করে দিয়ে ঋণ অ্যাপের বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের নিজেদের অ্যাপের বর্ননা দেওয়া শুরু করেন।

প্রকৃতপক্ষে, সময় নিউজে বর্ণিত উক্ত অ্যাপটি ছিল মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস- বিকাশ এর অ্যাপ। কিন্তু এসব বিজ্ঞাপনে বিকাশের কথাটা উহ্য রেখে নিজেদের অ্যাপের কথা প্রচার করা হচ্ছে।

সময় নিউজের মূল ভিডিও ব্যবহার করে এডিটেড ভিডিও প্রচার করছে ন্যানো লোন সার্ভিস, ইসলামিক লোন বাংলাদেশ।   অন্যদিকে চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের মূল ভিডিও ব্যবহার করে এডিটেড ভিডিও প্রচার করছে এমপিএস ওয়ান নামক ফেসবুক পেজ। 

৩ বছর আগে ঢাকা ব্যাংক ই-ঋণ (eRin) নামক ডিজিটাল ঋণ সুবিধার একটি অ্যাপের সূচনা করেছিল। এই ঘটনা নিয়ে এটিএন বাংলা সেসময় একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রচার করেছিল। এই ভিডিওটাই কাটছাট করে ঢাকা ব্যাংকের নাম বাদ দিয়ে নিজেদের অ্যাপের কথা যুক্ত করে প্রচার করছে বাংলাদেশ ইমার্জেন্সি লোন সার্ভিস,  ডিজিটাল সেবা বিডি এবং অনলাইন ঋণ সেবা নামক দুটি পেজ।



কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার


Faith App নামক ফেসবুক পেজ থেকে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘জেমিনি’ দিয়ে তৈরি করা একটা কৃত্রিম ভিডিওর সাহায্যে  বিজ্ঞাপন দিতে দেখা যাচ্ছে। এই ভিডিওর নিচে ডান দিকে জেমিনির লোগো দেখা যাচ্ছে।


অনলাইন লোন সার্ভিস এবং WB online service নামক দুটি পেজ থেকে দুজন তরুণীকে দেখা যায়, বিশ্বব্যাংকের লোগোযুক্ত ডেস্কের সামনে বসে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে গ্রাহককে ক্ষুদ্র ঋণ নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিতে। এসব ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এ আই) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এখানে যে টুলগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ছিল  ট্রুথ স্ক্যান, ডিপ এ আই, জিরোজিপিটি ইত্যাদি। 



‘সেবা লোন সার্ভিস’ এবং ‘সেবায় প্রথম’ পেজ থেকে প্রচারিত এই ভিডিওতে  সুপরিচিত ইসলামী বক্তা শায়খ আহমদুল্লাহকে এমন একটি অ্যাপ থেকে সহজে ঋণ গ্রহণের বিজ্ঞাপন প্রচার করতে দেখা যায়। বিজ্ঞাপনে জানানো হয়, এই ঋণ দেওয়া হচ্ছে ‘৩% সুদ’ এর শর্তে। এমন সুদের শর্তযুক্ত বিজ্ঞাপন প্রচার করা শায়খ আহমদুল্লাহর মত একজন ইসলামী বক্তার পক্ষে একেবারেই মানানসই নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সনাক্তকারী টুল-হাইভ মডারেশনের বিশ্লেষণে এই ভিডিওতে শায়খ আহমদুল্লাহর অংশটি এ আই দিয়ে তৈরি হওয়ার ৯৮.৮% সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।



অ্যাপ ইনস্টলের পরে যা পাওয়া গেল

বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য আমাদের একজন ফ্যাক্টচেকার তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে এমন কয়েকটি অ্যাপ ইনস্টল করেন। অ্যাপগুলো ইনস্টলের সময়েই ডিভাইসের যাবতীয় পারমিশন (ফোন বুক, টেক্সট মেসেজ, ক্যামেরা, লাইভ লোকেশন ইত্যাদি) চেয়ে নেয়। পরবর্তী ধাপে ঋণের আবেদনের সময় গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, পরিবারের সদস্যদের ফোন নাম্বার সহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে। একটি অ্যাপে জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে লাইভ ফেস ম্যাচিং’ এ অমিল দেখে রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করা হয়নি। আরেকটি অ্যাপ  থেকে তাদের চাহিদামত সকল তথ্য দেওয়ার পরে কেবলমাত্র ১৩০০ টাকা ঋণের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, ৭ দিন পরে এই টাকা ফেরত দিতে হবে, এবং ফেরত দেওয়ার সময় ১৩০০ এর বদলে ২০০০ টাকা ফেরত দিতে হবে। এই বাড়তি ৭০০ টাকাকে কোনো ধরনের ‘সুদ’ হিসেবে চিহ্নিত না করে ‘উৎস ফি’ বলে দাবি করছে।

অনুরূপ আরেকটি অ্যাপ এক সপ্তাহের জন্য ৮৭০ টাকা ঋণ অফার করছে, যেখানে এক সপ্তাহ পরেই ১৩০০ টাকা ফেরত দিতে হবে।


এই চার্জ বা ফি কে যদি ‘সুদ’ হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে এক সপ্তাহের জন্যই প্রায় ৫০% সুদ দিতে হচ্ছে, যা বার্ষিক ২৮০০% সুদের হারের সমান। বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাংকগুলো সাধারণত কোনো জামানতের বিনিময়ে ১০ থেকে ১৫% সুদে গ্রাহককে ঋণ নেওয়ার সুবিধা দিয়ে থাকে, সেখানে এই অ্যাপ গুলো তেমন কোনো জামানত ছাড়াই গ্রাহককে অতি উচ্চ সুদে ঋণ দিচ্ছে।

যেহেতু এই অ্যাপগুলো কোনো জামানত (স্থাবর সম্পত্তি,বাড়ি,জমি, স্বর্ণালংকার বা ব্যাংকের ডিপিএস বা অন্যন্য আমানত) ছাড়াই অর্থ ঋণ দিচ্ছে, সেক্ষেত্রে কোনো গ্রাহক ঋণ পাওয়ার পরে পরিশোধ না করলে অ্যাপের পক্ষ থেকে কিভাবে ঋণ উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে, সেটা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হয়নি। একটি ক্ষেত্রে দেখা গেল, অ্যাপ  সংশ্লিষ্ট একটি আইডি থেকে দুজন গ্রাহকের ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি প্রকাশ্যে প্রচার করে তাদের নিন্দা করা হচ্ছে। অর্থ্যাৎ, ডক্সিং করে বা এর ভয় দেখিয়ে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা হতে পারে। 



বিএফআইইউ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা

অনলাইন জুড়ে চলতে থাকা এই ঋণের প্রলোভনের ডামাডোলের মধ্যে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব প্রলোভন থেকে সচেতন থাকতে সাধারণ জনতাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এসব অনুমোদনহীন প্ল্যাটফর্ম থেকে ঋণ নিয়ে প্রতারিত হলে অথবা এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোনো অ্যাপ, প্ল্যাটফর্ম, গ্রুপ, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য জানা থাকলে বিএফআইইউর ওয়েবসাইটে অভিযোগ করা যাবে বলে জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।

বিএফআইইউর নজরে আসা ৩১টি অননুমোদিত ঋণদাতা অ্যাপের মধ্যে রয়েছে—সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, সাথি লোন, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, টাকা ক্যাশ লোন, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোনহাট ও টাকানাও।

তবে এই ৩১ টি অ্যাপের বাইরেও কয়েকটি অ্যাপ এবং ওয়েবসাইটের সন্ধান পেয়েছে ফ্যাক্টওয়াচ , যেখান থেকে সহজ শর্তে ঋণের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।

আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এই ধরনের অ্যাপে লেনদেন সম্পর্কে সতর্কতা জারি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, অনুমোদন ছাড়া অনলাইনে অ্যাপ খুলে ঋণ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। ‘পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪’-এর ১৫(২) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম চালানো নিষিদ্ধ। একই আইনের ৩৭(১) ধারা অনুযায়ী এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।


শুধু অ্যাপ পরিচালনাকারীরাই অপরাধী নন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব অবৈধ অ্যাপে নিবন্ধন করে বা ঋণ লেনদেন করে গ্রাহকরাও না জেনে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।

তাই এ ধরনের চক্র থেকে সুরক্ষিত থাকতে অনলাইনের কোনো অবৈধ অ্যাপ থেকে ঋণ নেওয়া কিংবা এদের সঙ্গে যেকোনো প্রকার লেনদেন থেকে বিরত থাকার জন্য সর্বসাধারণকে জোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম 

২০২১ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছিল । এ সময় এই চক্রের ৫ জনকে গ্রেফতারও করা হয়।

অনুরূপভাবে ২০২৩ সালে বোয়ালিয়া থানা পুলিশ অনুরূপ আরেকটি চক্রের ২৩ জন সদস্যকে গ্রেফতার করে।

বোয়ালিয়া থানা পুলিশের উপকমিশনার মো. রফিকুল আলম বলেন, চক্রটি অ্যাপের মাধ্যমে ঋণের ফাঁদ পেতে মোবাইল থেকে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেল করত। তাদের চাহিদামতো টাকা না দিলে নগ্ন ছবি বানিয়ে ভয়ভীতি দেখাত। 

উদাহরণ হিসেবে, পুলিশ একজন ভুক্তভোগী আবুল এহসানের ঘটনা তুলে ধরে। ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ রাজশাহী নগরের বাসিন্দা আবুল এহসান ফেসবুকে ‘র‍্যাপিড ক্যাশ’ নামের একটি অ্যাপে ৩০ হাজার টাকা ঋণের লোনের বিজ্ঞাপন দেখেন। তিনি অ্যাপটি ডাউনলোড করে মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও লাইভ ছবি দিয়ে নিবন্ধন করেন। ওই দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদের মাধ্যমে তার হিসাবে ৭১৫ টাকা ঢুকে। রাত ১২টার দিকে অ্যাপ চেক করে দেখেন, তার নামে ৭১৫ টাকা জমা হয়েছে। ঋণের শর্তে বলা হয়, ৫৮৫ টাকা সুদসহ মোট ১ হাজার ৩০০ টাকা ৩ এপ্রিলের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এত সুদ দেখে তিনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কাস্টমার কেয়ারে ফোন দিয়ে বন্ধ পেলে ইমেইলের মাধ্যমে তিনি টাকা পরিশোধ করবেন মর্মে একটি মেইল পাঠান। তখন প্রতারকেরা একটি নম্বর দিয়ে টাকা পরিশোধ করতে বলেন। এরপর তিনি ১ হাজার ৩০০ টাকা পরিশোধ করেন।

ওই দিন আবুল এহসানের নগদ হিসাবে আবার আগের মতো টাকা জমা হয়। আবার ঋণের শর্ত দিয়ে সুদসহ পরিশোধ করতে বলা হয়। এবার সুদসহ পরিশোধ করতে না চাইলে প্রতারকেরা ফোনে জানায়, তার মোবাইলের কন্টাক্ট লিস্ট, ছবি-ভিডিওসহ যাবতীয় তথ্য হ্যাক করেছেন তারা। টাকা পরিশোধ না করলে তার নগ্ন ছবি বানিয়ে সব কন্টাক্ট নম্বরসহ ফেসবুকে ছড়িয়ে দেবে। তিনি টাকা দিতে অস্বীকার করলে প্রতারকেরা তার নগ্ন ছবি বানিয়ে তাকেসহ তার নম্বর তালিকায় থাকা কয়েকজনকে পাঠায়। পরে ভয়ে তিনি প্রতারকদের দাবি করা টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু প্রতারক চক্র তার পিছু ছাড়ছিল না। চক্রটি অধিক টাকার জন্য তাকে ব্ল্যাকমেল করতে থাকে।

প্রথম আলোর একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানেও এই ঋণ অ্যাপ চক্রের কার্যকলাপ উঠে এসেছে।


ফ্যাক্টওয়াচের সিদ্ধান্ত

যেহেতু এই অ্যাপ গুলোর কোনো অনুমোদন নেই এবং অ্যাপের পক্ষ হতে গ্রাহকের স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তাই এখান থেকে গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। মেটার ফ্যাক্টচেকিং নীতিমালা অনুযায়ী, ফ্যাক্টওয়াচ ফেসবুকে এই সংশ্লিষ্ট সকল পোস্ট এবং বিজ্ঞাপনকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করছে।


Claim:
ঘরে বসে অনলাইনে অ্যাপের মাধ্যমেই আর্থিক ঋণ পাওয়ার কিছু চটকদার বিজ্ঞাপন অনলাইনে দেখা যাচ্ছে।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh