মাগুরায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়া ৮ বছরের শিশু আছিয়াকে নিয়ে ফেসবুকে কিছু মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে-
১। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে একজন কিশোরীর কথা বলার একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, আছিয়া এখন সুস্থ।
২। কিছু ছবি পোষ্ট করে বলা হচ্ছে, আছিয়া মারা গেছে।
৩। দুজন শিশুর ছবি দিয়ে আলাদা আলাদা পোস্টে দাবি করা হচ্ছে তারা আছিয়া এবং একই সঙ্গে বলা হচ্ছে তারা মারা গেছে।
ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, প্রথমত, ভিডিওর কিশোরী চাঁদপুরে মামা-মামির বাসায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার ১৫ বছরের নির্যাতিত রোজিনা এখন অনেকটা সুস্থ কিন্তু মাগুরার আছিয়ার সুস্থ হওয়ার কোন খবর পাওয়া যায়নি। আছিয়া সিএমএইচে চিকিৎসাধীন, তার অবস্থা এখনও আশংকামুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, আছিয়ার মৃত্যুর খবরটি মিথ্যা। তৃতীয়ত, নীল শাড়ি পরা এবং ফ্রক পড়া শিশু দুজন আছিয়া নয়। শিশু দুজনের একজন ভারতের অন্যজন চট্টগ্রামের। দুজন শিশুই জীবিত। অর্থ্যৎ, ভাইরাল চারটি তথ্যই মিথ্যা।
ফ্যাক্ট ওয়াচের অনুসন্ধান
দাবি -১
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্টে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নিজের উপর হওয়া নির্যাতনের কথা বলে নির্যাতককে শাস্তি দেওয়ার কথা বলছে এক শিশু। ক্যাপশনে তাকে মাগুরার ধর্ষণের শিকার আছিয়া দাবি করে বলা হচ্ছে, আছিয়া এখন অনেকটা সুস্থ। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কথা বলা শিশুটি মাগুরার আছিয়া নয়। সে চাঁদপুরে মামা-মামির নির্যাতনের শিকার রোজিনা।
রোজিনাকে নিয়ে ফ্যাক্টওয়াচের একটি প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
রোজিনাকে চাঁদপুর শহরের বিষ্ণুদী মাদ্রাসা রোড এলাকা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল গত ৬ মার্চ। তারপর তার চিকিৎসা চলেছে এবং তার মামা-মামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত ৬ মার্চ বিকেলে রোজিনা মামা-মামির নির্যাতন সইতে না পেরে ঘর থেকে পালিয়ে যায়। এ সময় স্থানীয় লোকজন রোজিনার অবস্থা দেখে পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথম থানায় নিয়ে যায় এবং হাসপাতালে ভর্তি করায়। হাসপাতালে ভর্তির সময় রোজিনার পিঠে গরম খুন্তির ছেঁকার ক্ষত ছিল। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত কয়েকদিনের শুশ্রূষা ও চিকিৎসায় সে কথা বলতে পারার মতো সুস্থ হয়েছে।
কয়েকটি ছবির একটি কোলাজ দিয়ে বলা হচ্ছে যে, মাগুরার শিশু আছিয়া মারা গেছে। প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে দেখা যায়, আজ (১১ মার্চ) পর্যন্ত সে ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি আছে। ইত্তেফাকের ১০ মার্চের প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বরাতে বলা হয়েছে, আছিয়ার অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ শিশুটির বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। আজও তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন শিশুটির শারীরিক অবস্থার খুব সামান্য উন্নতি হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো শিশুটি চোখের পাতা নেড়েছে। তবে শ্বাসরোধের কারণে তার মস্তিকে অক্সিজেন সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছিল। মস্তিষ্কে পানি জমে গিয়েছিল, যেটা অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। তার বুকের মধ্যে যে বাতাস জমে ছিল সেটা দূর করা গেছে। চিকিৎসকরা আশাবাদী দুই এক দিনের মধ্যে শিশুটির অবস্থার আরও উন্নতি হবে।
‘আছিয়া মারা গেছে’ এ ধরনের মিথ্যা ক্যাপশনের পোষ্টগুলো দেখুন এখানে, এখানে, এখানে।
দাবি -৩
ফেসবুকে ছড়ানো কিছু পোস্টে দেখা যাচ্ছে, শাড়ি পরা এবং ফ্রক পরা দুজন শিশুর ছবি দিয়ে বলা হচ্ছে তারা মাগুরার আছিয়া।
রিভার্স ইমেজ সার্চে পাওয়া যাচ্ছে শিশু দুজনের একজন ভারতের, অন্যজন চট্টগ্রামের। দুটি ছবিতেই আছিয়ার মৃত্যুর গুজব ছড়ানো হচ্ছে।
নীল শাড়ি পরা শিশুটির ছবি পাওয়া যায় নন্দিনী সরকার (Nandini Sarkar) নামের একটি ইন্সটাগ্রাম আইডিতে গত ৩ মার্চের একটি পোস্টে। আরও অনুসন্ধানে এই শিশুটির একটি নাচের ভিডিও পাওয়া যায়।
ফ্রক পরা শিশুটির ছবি দিয়ে আছিয়ার মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায় এই আইডি থেকে। রিভার্স ইমেজ সার্চে একটি ফেসবুক পোস্ট পাওয়া যায়।
ছবির ক্যাপশনে বলা হয়, শিশুটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এবং বাঁশখালির জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সাত মার্চে করা এই পোস্টে শিশুটির নাম বলা হয় ফাহিমা আক্তার। প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে ফাহিমা আক্তারের আহত হওয়ার একটি ইন্সটাগ্রাম পোস্ট পাওয়া যায়। এই পোস্ট থেকে পাওয়া ফোন নম্বরে ফোন করে বাঁশখালীর মুশফিকুর রহমান নামের এক ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। তিনি ফ্যাক্টওয়াচকে জানান, মেয়েটি তার পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। মেয়েটির পরিবারের সন্ধান চেয়ে তিনিই প্রথম এই পোস্ট করেন, পরে অনেকেই এটি শেয়ার করেন।
ভিন্ন শিশুর ছবি দিয়ে আছিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়াচ্ছে এখানে, এখানে।
পুরো পর্যালোচনার পরে ফ্যাক্টওয়াচ এই সবগুলো পোস্টকেই ‘মিথ্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করছে।
ডিসক্লেইমারঃ মাগুরার ধর্ষণের শিকার শিশু আছিয়া আজ ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। সংবাদমাধ্যমগুলো, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোষ্টের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। গত ১১ মার্চ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার সময় আছিয়া বেঁচে ছিল।
Claim: মাগুরায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়া ৮ বছরের শিশু আছিয়াকে নিয়ে ফেসবুকে কিছু মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে- ১। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে একজন কিশোরীর কথা বলার একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, আছিয়া এখন সুস্থ। ২। কিছু ছবি পোষ্ট করে বলা হচ্ছে, আছিয়া মারা গেছে। ৩। দুজন শিশুর ছবি দিয়ে আলাদা আলাদা পোস্টে দাবি করা হচ্ছে তারা আছিয়া এবং একই সঙ্গে বলা হচ্ছে তারা মারা গেছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh