হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভ্রান্ত দাবিঃ গণমাধ্যম শুধু প্রচার করবে নাকি যাচাইও করবে?

29
হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভ্রান্ত দাবিঃ গণমাধ্যম শুধু প্রচার করবে নাকি যাচাইও করবে?
হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভ্রান্ত দাবিঃ গণমাধ্যম শুধু প্রচার করবে নাকি যাচাইও করবে?

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশ কিছু জেলায় হুট করেই শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিবিসি বাংলার তথ্যানুযায়ী, পুরো মার্চ মাস জুড়ে সারাদেশে হামের কারণে অন্তত ২০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল গতকাল রোববার (গত ২৯ মার্চ) বলেন, 'মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এরপর ভ্যাকসিন কোনো গভার্নমেন্ট দেয় নাই।' বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ওষুধ শিল্প মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এই মন্তব্য করেন। তার এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে দেখা যায়, দাবিটি সঠিক নয়। ৮ বছর হিসেবে ২০১৮ সাল থেকে হিসেব করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। ফ্যাক্টওয়াচ মনে করে, কোনো ভুল তথ্য শুধুমাত্র উদ্ধৃত করার মাধ্যমেই গণমাধ্যমের দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং তার সত্যতা যাচাই করে উল্লেখ করাও প্রয়োজন।

এই দাবিতে প্রচারিত বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি পোস্ট দেখুন এখানে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে দেশের অনেক মূলধারার গণমাধ্যম।

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে ইউনিসেফ বাংলাদেশের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ২০১৯ সালের একটি পোস্ট পাওয়া যায়। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল দেওয়া পোস্টটির ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন থেকে এক সপ্তাহব্যাপী টিকাদান সপ্তাহ শুরু হয়। পোস্টে শিশুদের হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার জন্য টিকা কেন্দ্রে নিয়ে আসতে অভিভাবকদের আহ্বান জানানো হয়। 

দৈনিক কালবেলায় আজ সোমবার (৩০ মার্চ) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে এমআর-১ (মিজেলস-রুবেলা/হাম-রুবেলা) ও এমআর-২ টিকার কাভারেজ ছিল ৮৮ দশমিক ১ ও ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টিকাদান সম্পর্কিত কর্মসূচি ইপিআইয়ের ডাটাবেজ থেকেও এই তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়। 

এই ডাটাবেজ থেকে আরও জানা যায়, ২০১৮ সালে এই কাভারেজ ছিল যথাক্রমে ৮৬ দশমিক ৪ ও ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২০ সালেও দেশে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছিল। ডিবিসি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলে ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওইদিন থেকে সারাদেশে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। প্রতিবেদনটিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনের তথ্য রয়েছে। এই কর্মসূচি ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলমান ছিল বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। 

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটেও ২০২০ সালে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের তথ্য পাওয়া যায়।

ইনডিপেন্ডেন্ট টিভির একটি প্রতিবেদন থেকে ২০২০ সালে হাম নির্মূল ও রুবেলা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সারাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে ১ ডোজ এমআর টিকা দেওয়ার কথা জানা যায়। 

দৈনিক ইত্তেফাকে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই সময় সারা দেশের সঙ্গে একযোগে বরিশালেও শিশুদের হাম-রুবেলার টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। নগরীর কাউনিয়াস্থ নগর মাতৃসদন কেন্দ্রে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) তৎকালীন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।

২০২১ সালের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পটিয়ায় পালিত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির ছবি দেখুন এখানে। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টিকাদান সম্পর্কিত কর্মসূচি ইপিআইয়ের ডাটাবেজ থেকে আরও জানা যায়, এই কর্মসূচি ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ সালেও চলমান ছিল। তবে ২০২৫ সালে এমআর-১ টিকার কভারেজ নেমে আসে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে এবং এমআর-২ টিকার কভারেজ ৫৭ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়। এর আগে  ২০২১ সালে এই হার ৯৭ দশমিক ৩ ও ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশে। ২০২২ সালে এমআর-১ শতভাগ এবং এমআর-২ ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৩ ও ২৪ সালেও এই হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে ছিল।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি অ্যাডভোকেসি ব্রিফ ফাইলে দেওয়া গ্রাফ থেকে দেশে ২০১৯ সালে হাম-রুবেলা টিকার এক ও সম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার একটি সামগ্রিক চিত্রও দেখা যায়। চিত্রটি দেখুন এখানে। 

ব্রিফ ফাইলটি থেকে আরও জানা যায়, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৫ সালে যেখানে মাত্র ৪টি প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, সেখানে ২০১৯ সালে তা বেড়ে ৮২টিতে পৌঁছায়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে হাম প্রায় নির্মূল পর্যায়ে পৌঁছেছিল—প্রতি মিলিয়নে মাত্র ১.৬টি সংক্রমণ ছিল। কিন্তু ২০২০ সালে এই হার বেড়ে প্রতি মিলিয়নে ১১.৭টি সংক্রমণে দাঁড়ায়।

অর্থাৎ হাম রোগের সংক্রমণ বিগত সময়ও বাংলাদেশে ঘটেছিল। তবে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাম্প্রতিক সংক্রমণের ঘটনায় হামের টিকা নিয়ে যেই দাবি করেছেন, সেটি সত্য নয়। বরং দেখা যাচ্ছে, বিগত ৮ বছরে হামের টিকা কার্যক্রম চলমান ছিল। তাই ফ্যাক্টওয়াচ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবিটিকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে।  

ফ্যাক্টওয়াচের যাচাইয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হামের টিকা সংক্রান্ত এই মন্তব্যটি দেশের অনেক সংবাদমাধ্যমেই প্রচার করেছে। কিন্তু তার এই বক্তব্য যে ত্রুটিপূর্ণ, সেবিষয়ে অধিকাংশ প্রতিবেদনেই কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষদের অনেকেই এই বিষয়টিকে নিছক একটি মন্তব্য হিসেবেই নিচ্ছেন না, বরং তথ্যটিকে সঠিক বলেই মনে করছেন। ফ্যাক্টওয়াচ মনে করে, কোনো ভুল তথ্য শুধুমাত্র উদ্ধৃত করার মাধ্যমেই গণমাধ্যমের দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং তার সত্যতা যাচাই করে উল্লেখ করাও প্রয়োজন। বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম সেটি করেছেও।

Claim:
গত ৮ বছর দেশে হামের টিকাই দেওয়া হয়নি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh