মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও ছাড়াও মনগড়া মৃত্যুসংখ্যা এবং কনস্পিরেসি থিওরির ছড়াছড়ি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের পরপর বিমান বিধ্বস্তের ছবি, উৎসুক জনতার ভিড় এবং আকাশ থেকে বিমান পড়ার দৃশ্য এআই দিয়ে তৈরি করে শেয়ার করা হয়। ২১ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ৩৬ টি প্রকাশিত ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায় দুর্ঘটনাকে ঘিরে গুজব, উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা প্রচারণা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা সামাজিক যোগাযোগ মাধম্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ।
লাশ চুরি/সংখ্যা নিয়ে নানা গুজব শনাক্ত করে ফ্যাক্টওয়াচ, রিউমর স্ক্যানার ও ডিসমিস ল্যাব সাতটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি, হামলা, সংঘর্ষ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিপরীতে ডিসমিসল্যাব, রিউমার স্ক্যানার ১৩ টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, ভুয়া আইডেন্টিটি নিয়ে ছড়িয়ে পরা বহুল আলোচিত আটটি কন্সপিরেসি শনাক্ত করে ফ্যাক্টওয়াচ ও ডিসমিসল্যাব ।
সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকাজ চলাকালে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে জনমনে ধারণা তৈরি হয় যে লাশের সংখ্যা গোপন করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া কিছু শিক্ষার্থীর বক্তব্য এবং কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিহতের সংখ্যা প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় এই গুজব বিস্তার লাভ করে।
সামাজিক মাধ্যমে আহত ও নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। একটি ভাইরাল পোস্টে মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়, নিহতের সংখ্যা ২৪৭ এবং আহত ৫২২। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ এই দাবি সম্পূর্ণ ভুয়া বলে নিশ্চিত করে।
এছাড়া, নিহত শিক্ষার্থীদের তালিকা দাবি করে, একটি এআই-জেনারেটেড ছবি শেয়ার করা হয়, যাতে ২০ জন শিক্ষার্থীর ছবি দেখানো হয়। ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে প্রমাণিত হয়, ছবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং স্কুল কর্তৃপক্ষও এটিকে অস্বীকার করেছে।
লাশ গোপন করার দাবিতে আরেকটি ভুয়া ভিডিও ছড়ায়, যাতে দেখা যায় একজন ব্যক্তি কালো পলিথিনে মোড়া কিছু হাড়গোড় কবর দিচ্ছেন। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওটি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের একটি কবরস্থানের, যা মাইলস্টোনের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন।
নিহতের তালিকা প্রকাশের দাবিতে শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের চাপ বাড়তে থাকে। মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরা ৬ দফা দাবি নিয়ে সচিবালয়ে বিক্ষোভ করে, যেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ সময় সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলন নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক অপতথ্য ছড়ানো হয়।
গত বছর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যেভাবে সরকার পতন হয়েছিল সে ভাবে মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে ঘটনার পুনরাবৃত্তির করার একটি চেষ্টা করা হয় বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে হতাহতের সংখ্যা আতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করা হয়।
রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, “শাহবাগে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শিক্ষার্থীরা ইউনূসের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করেছে”-এই দাবিতে ২৩ জুলাই ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি আসলে ১৪ মে নার্সিং শিক্ষার্থীদের ডিপ্লোমাকে ডিগ্রির সমমান দেওয়ার দাবির আন্দোলনের দৃশ্য। এটিএন বাংলা ও বাংলা নিউজের রিপোর্টে এটি নিশ্চিত হয়েছে।
একইভাবে রিউমর স্ক্যানারের অন্য প্রতিবেদন অনুসন্ধানে দেখা যায়, “মাইলস্টোন কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে ৩ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছে”—এই দাবি করে ঢাকা ট্রিবিউনের নামে শেয়ার করা ফটোকার্ডটি ডিজিটালভাবে সম্পাদিত এবং গণমাধ্যমটির কোনো অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে এমন খবর পাওয়া যায়নি।
২১ জুলাই মাইলস্টোন কলেজে বিমান দুর্ঘটনার পর ফেসবুকে ‘অ্যানোনিমাস মেইন পেজ’ নামে একটি ভুয়া পেজ থেকে স্কুল ধ্বস ও শিশু মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করে পোস্ট ভাইরাল হয়, যা নাইজেরিয়াভিত্তিক একটি প্রতারক চক্রের কাজ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই নেটওয়ার্কটি আন্তর্জাতিক হ্যাকার গ্রুপ ‘অ্যানোনিমাস’-এর ছদ্মবেশে বিশ্বজুড়ে দুর্ঘটনার ভুয়া ভবিষ্যদ্বাণী ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে স্পোর্টস বেটিংয়ের টিকিট বিক্রি করে থাকে। ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ঘটনায় তাদের দাবি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা, কারণ পোস্টে বিমান দুর্ঘটনার কোনো উল্লেখ ছিল না এবং ফেসবুক ট্রান্সপারেন্সি টুলে পেজগুলোর নাইজেরিয়ান অ্যাডমিন লোকেশন ধরা পড়েছে।
এছাড়াও, নিজেকে এক্সপার্ট পরিচয় দিয়ে এই বিমান দুর্ঘটনাকে “সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র” বলে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, ভারতীয় তরুণীর ছবি ব্যবহার করে বানানো এই ফেসবুক আইডিটি ভুয়া। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুয়া এক্সপার্ট সেজে এই ঘটনা এই কন্সপিরেসি থিওরিটি ছড়ানো হয়েছিল।
রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে, ‘মাইলস্টোনে আহতদের চিকিৎসা দিতে আসা ভারতীয় ডাক্তার ডা. পূজা মুখার্জির হয়রানির শিকার হওয়ার’ দাবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া। ফ্যাক্ট-চেকে দেখা গেছে, ২৪ জুলাই ঢাকায় আসা ভারতীয় চিকিৎসক দলে ডা. পূজা মুখার্জি নামে কেউ ছিলেন না। ‘ডা. পূজা মুখার্জি’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ভিন্ন ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল এবং ‘৩০০ টাকায় পানি বিক্রি’ ও ‘হাসপাতালে হয়রানি’ সংক্রান্ত সব দাবিই মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে।
অন্যান্য অপতথ্যের মধ্যে রয়েছে পুরোনো বিমান দুর্ঘটনার ভিডিও, সম্পাদিত ছবি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বানোয়াট গল্প প্রচার। এসব অপতথ্য শিক্ষার্থী ও প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে বলে তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণটি লিখেছেন সিবলী সাদিক সিফাত, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ।