সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় পাহাড়িদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার

460
সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় পাহাড়িদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার
সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় পাহাড়িদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ এ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন কক্সবাজারের চকোরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া গ্রামে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে ডাকাতদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন। উক্ত ঘটনায় সেনাবাহিনী এই পর্যন্ত ছয়জনকে আটক করেছে। আটক ছয়জনই লেফটেন্যান্ট তানজিমকে হত্যার ঘটনার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল বলে প্রাথমিক স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে। সম্প্রতি পাহাড়ি এবং বাঙালিদের মাঝে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুটো জেলা খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডের সাথে পাহাড়ি আদিবাসীদের সম্পৃক্ততার ভুয়া দাবি করছেন! অথচ আটক আসামিরা সবাই বাঙালি এবং মুসলমান, এবং আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজারের চকোরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা ইউনিয়নের একটি গ্রামে, যেটি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অনেক দূরে। সঙ্গত কারণে এসব পোস্টগুলোকে ফ্যাক্টওয়াচ “বিভ্রান্তিকর” বলে সাব্যস্ত করছে।

সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন নিহত হওয়ার ঘটনার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সেখানে বসবাসরত পাহাড়িদের সম্পৃক্ততার কথা দাবি করে “Zakir’s BCS specials” নামক ফেসবুক পেইজ থেকে একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়। পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে পোস্টটি ডিলিট করে দেয় পেইজ কর্তৃপক্ষ। তবে, উক্ত পোস্টের একটি স্ক্রিনশট জোগাড় করতে সমর্থ হয়েছি আমরা। তাছাড়া, সামাজিক মাধ্যমে একাধিক পোস্ট পাওয়া গেছে যেখানে তানজিম ছারোয়ার নির্জন নিহত হওয়ার ঘটনার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং পাহাড়ি আদিবাসীদের সম্পৃক্ততার কথা দাবি করা হয়েছে। এমন কয়েকটি পোস্টের নমুনা দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে। 

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ এ রাত আনুমানিক তিনটায় কক্সবাজারের চকোরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া গ্রামে ডাকাতির খবর পেয়ে সেটি প্রতিরোধ করতে চকোরিয়া আর্মি ক্যাম্প হতে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল সেখানে যায়৷ টহল দলের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাত দল পালানোর সময় লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন ডাকাত দলের কয়েকজনকে তাড়া করেন। এসময় ডাকাত দলের সদস্যরা লেফটেন্যান্ট তানজিমের ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করলে তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্যগুলো জানানো হয়। সেখানে আরও বলা হয়, ঘটনাস্থল হতে তিনজন ডাকাত এবং ডাকাত সন্দেহে আরও তিনজনকে আটকসহ একটি দেশীয় বন্দুক ও ছয় রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। বেশকিছু সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রকাশ করা হলে সেখান থেকে প্রাথমিকভাবে চারজন ডাকাতের নাম-পরিচয় জানা যায়৷ এই চারজন হলেন – হেলাল, জিয়াবুল, বেলাল, এবং মোহাম্মদ হোসেন। দেখুন এখানে এবং এখানে। 

এরপর, গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ এ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানানো হয় যে, লেফটেন্যান্ট তানজিমকে হত্যার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছয়জনকে আটক করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। উক্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আটক ছয়জন ডাকাতের নাম-পরিচয় এবং ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। তারা হলেন – মোঃ বাবুল প্রকাশ, মোঃ হেলাল উদ্দিন, মোঃ আনোয়ার হাকিম, মোঃ আরিফ উল্লাহ, মোঃ জিয়াবুল করিম, এবং মোঃ হোসেন। এদের মধ্যে মোঃ বাবুল প্রকাশ এই ডাকাতির ঘটনার মূল অর্থ যোগানদাতা ছিলেন এবং তিনি লেফটেন্যান্ট তানজিমকে ছুরিকাঘাত করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে স্বীকারোক্তি  দিয়েছেন। এছাড়া, আটক অন্যান্য ডাকাতরাও এই ঘটনার সাথে নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কথা প্রাথমিক স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছেন। এই বিষয়ে বেশকিছু সংবাদমাধ্যমের খবর পড়ুন এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে। 

সম্প্রতি খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় একজন বাঙালি যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় সেখানে বসবাসরত পাহাড়ি এবং বাঙালিদের মাঝে সংঘর্ষ বাঁধে এবং এর উত্তাপ খাগড়াছড়ি ছাড়িয়ে রাঙামাটি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আনতে প্রশাসন ঐ দুটো জেলায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম নিহত হওয়ার ঘটনার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে মিলিয়ে ফেলেছেন। অথচ, লেফটেন্যান্ট তানজিম নিহত হয়েছেন কক্সবাজারের চকোরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া গ্রামে, যেটি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। 

আবার, অনেক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী লেফটেন্যান্ট তানজিম নিহত হওয়ার ঘটনার সাথে পাহাড়ি আদিবাসীদের সম্পৃক্ততার কথা দাবি করেছেন! আমরা উপরে এরকম কয়েকটি পোস্টের নমুনা যোগ করে দিয়েছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আটক ছয় ডাকাতের নাম-পরিচয় এবং ছবি প্রকাশ করায় জানা গেছে তারা সবাই বাঙালি এবং মুসলমান৷ এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন পাহাড়ি আদিবাসী আটক হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। ফলে, সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা লেফটেন্যান্ট তানজিম নিহত হওয়ার ঘটনার সাথে পাহাড়ি আদিবাসীদের যে সম্পৃক্ততার কথা দাবি করছেন সেটি পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর। 

উপরের আলোচনা থেকে বুঝা যাচ্ছে, লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আটক ডাকাতদের নাম-পরিচয় এবং ছবি প্রকাশ করলেও অনেকে এই ঘটনার সাথে পাহাড়ি আদিবাসীদের সম্পৃক্ত থাকার কথা দাবি করেছেন। অন্যদিকে, সেনাসদস্য তানজিম কক্সবাজারের চকোরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা ইউনিয়নের একটি গ্রামে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে সেখানে নিহত হলেও অনেকে এই ঘটনার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই জেলা খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মিলিয়ে ফেলেছেন৷ যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সর্বশেষ তথ্য সরবরাহ করে যাচ্ছে, সেখানে কিছু সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা ভুল তথ্য প্রচার করে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছেন। 

সঙ্গত কারণে ফ্যাক্টওয়াচ এইসব সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের পোস্টগুলোকে বিভ্রান্তিকর বলে সাব্যস্ত করছে।

No Factcheck schema data available.

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh