ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন না হওয়ার ভুয়া দাবি 

79
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন না হওয়ার ভুয়া দাবি 
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন না হওয়ার ভুয়া দাবি 

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২১ আগস্ট তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে উক্ত আসনটি শূন্য হয়েছে। বিধি অনুযায়ী উক্ত আসনে নতুনভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। তবে খরচ বাঁচানোর জন্য এখানে নতুন নির্বাচন না করে সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফলে দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকেই নতুন সংসদ সদস্য ঘোষণা করা হবে- নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের বরাতে এমন একটি বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশনার এমন কোনো বক্তব্য দেননি, বরং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে।

এসব পোস্টে নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এর উদ্ধৃতিমূলক একটি ফটোকার্ড শেয়ার করা হচ্ছে, যেখানে নির্বাচন কমিশনার বলছেন, ‘’নির্বাচনী খরচ বাঁচাতে ঠাকুরগাও-১ আসনে কোনো উপনির্বাচন হবে না। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে ২য় অবস্থানে থাকা জামায়াতের প্রার্থীই উক্ত আসনের এমপি বলে গণ্য হবেন।’

মূলত, ‘গুজব টিভি’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজ থেকে গত ২১ আগস্ট সকাল ৮টা ১০ মিনিটে প্রথমবারের মতো এই ফটোকার্ডটি দেখা যায়। এই ফটোকার্ডে গুজব টিভির লোগো যুক্ত করা ছিল। তবে পরবর্তীতে অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী গুজব টিভির লোগোটি সরিয়ে ফেলে এই ফটোকার্ডটি ফেসবুকে শেয়ার করতে থাকে, যা দেখে অনেকে বিভ্রান্ত হন। 

মহিলা জামাত প্রচার বিভাগ নামক একটি আনভেরিফায়েড প্রোফাইল থেকেও ২২ আগস্ট রাত ১২টা ১৩ মিনিটে এই ফটোকার্ডটি প্রকাশ করা হয়েছিল । এই প্রোফাইলটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ২৪মে এই আইডিটি ফেসবুকে সক্রিয় হয়। এই আইডির মালিক সলিমা সিরাজ মহিলা ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসা এবং জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছেন বলেও আইডিটির ‘ইনফো’ সেকশনে দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ এটি কোনো পেশাদার সাংগঠনিক পেজ নয়, বরং ব্যক্তিবিশেষের নিজ উদ্যোগে পরিচালিত একাউন্ট বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

পরবর্তীতে, ২২ আগস্ট রাত ১০টা ৪২ মিনিটে Bangladesh Jamaat-e-Islami, Women’s Wing নামক পেজ থেকে একটি বিবৃতিতে উক্ত আইডিটি ‘ফেইক পেজ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘’দীর্ঘদিন ধরে মহিলা বিভাগের নামে অসংখ্য ভূয়া পেজ থেকে জনগনকে বিভ্রান্ত করার জন্য অসত্য তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। যার সাথে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। যে বা যারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগের কর্মকান্ডকে বিতর্কিত করতে এধরনের হীন প্রচারণা চালাচ্ছেন আমরা তাদের ব্যাপারে নিন্দা জানাই। একইসাথে এধরনের অপতথ্য দ্বারা বিভ্রান্ত না হতে সর্বসাধারণের প্রতি আহবান জানাই। আমরা জানাতে চাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগের পক্ষ থেকে সকল প্রচারণা তাদের কেন্দ্রীয় ও শাখাসমুহের অফিশিয়াল পেজ থেকে করা হয়। এই সকল পেজ এর বাইরে সকল পেজ ও আইডির কোন পোস্ট বা প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। ‘’ (বানান অবিকৃত রাখা হয়েছে)


 



এই আসনে সর্বশেষ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখানে ২ লাখ ৩৮ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেন, যিনি ১ লাখ ৪১ হাজার ভোট পেয়েছিলেন।

গত ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হন। এরপর ২১ আগস্ট তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ফলে সংবিধানের ৫০(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের সাথে সাথেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয়ে যায়। এমতাবস্থায় সংবিধানের ১২৩(৪) ধারা অনুযায়ী, ৯০ দিনের মধ্যে উক্ত শূন্য আসনে পুনরায় নির্বাচন আয়োজন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

লক্ষণীয় যে, সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ বা অন্য কোনো অনুচ্ছেদে, কোনো সংসদীয় আসন শূন্য হলে সর্বশেষ নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করার বিধান নেই, বরং পুনরায় নির্বাচনের বিধান রয়েছে। ১২৩(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদের কোন সদস্যপদ শূন্য হইলে পদটি শূন্য হইবার নব্বই দিনের মধ্যে উক্ত শূন্যপদ পূর্ণ করিবার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতে, কোন দৈব-দূর্বিপাকের কারণে এই দফার নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয়, তাহা হইলে উক্ত মেয়াদের শেষ দিনের পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। ‘


২২ আগস্ট ঠাকুরগাঁও-১ আসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয় থেকে একটি চিঠি নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়। এছাড়া শূন্য হওয়া আসনটিতে উপ-নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে বলেও দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে।  নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ২২ আগস্ট সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এদিন তিনি জানান, ‘যেহেতু আসনটি শূন্য হয়ে গেছে, পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আমরা খুব বেশি সময় নেব না।’


তার এই বক্তব্য একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যেমন দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে )


অর্থাৎ এটা নিশ্চিত যে বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নতুন নির্বাচন ব্যতীত অন্য কোনো উপায় নেই। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও নতুন নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সর্বশেষ নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা সম্পর্কিত কোনো বক্তব্য দেননি। অর্থাৎ, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভুয়া উদ্ধৃতির কোনো সত্যতা নেই।

সঙ্গত কারণে, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া উদ্ধৃতিযুক্ত এই ফটোকার্ডকে ফ্যাক্টওয়াচ ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে। 

Claim:
Bangladesh Election Commission will not hold a by-election in the Thakurgaon-1 constituency; instead, the runner-up in the last election will be declared the winner.

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh