সুইডেনে রাস্তার পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে- এমন একটি দাবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এটি সত্য নয়। ২০২২ সালে শহরের কিছু সংখ্যক কাককে আবর্জনা সংগ্রহের প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি প্রকল্প বা ভাবনা এসেছিল ঠিকই, তবে এই প্রকল্পের কাজ আর অগ্রসর হয়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে নিকট অতীতে কখনো সুইডেনে কাকদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োগ করা হয়নি।
দারুস সাদাত সোহাগ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “সুইডেনে এমন কিছু স্মার্ট মেশিন তৈরি করা হয়েছে যা আবর্জনার বিনিময়ে কাকদের খাবার দিয়ে পুরস্কৃত করে। এই প্রখর বুদ্ধিমান পাখিরা খুব দ্রুত মেশিনের ভেতর ময়লা ফেলা শিখে নিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা আবর্জনাকে খাবারে রূপান্তরিত করছে।
এর ফলাফল ছিল অভাবনীয়। রাস্তাঘাট আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, বর্জ্যের পরিমাণ কমেছে এবং বন্যপ্রাণীর বুদ্ধিমত্তাকে একটি ইতিবাচক কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে না গিয়ে প্রকৃতির সাথে মিলে কাজ করার এই ধারণাটি চতুর কাকদের অপ্রত্যাশিত পরিচ্ছন্নতা কর্মীতে পরিণত করেছে।আমাদের এই সব নিয়ে কোনো স্ট্যাডি বা গবেষণা নেই।হয়তো সুইডেনের তুলনায় আমরাও এগিয়ে তবে অন্য সব বিষয়ে!” (বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)
এসব ফেসবুক পোস্টে ব্যবহৃত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ভেন্ডিং মেশিনের মতো দেখতে একটি মেশিনের এক প্রান্তে একটি কাক ঠোঁটে ধরে রাখা কোনো ময়লা ফেলার চেষ্টা করছে, যদিও সেখানে যথেষ্ট পরিমাণে ফাঁকা জায়গা নেই। মেশিনের অপর প্রান্তে ক্যাটফুডের মতো কিছু খাবারের কন্টেইনার দেখা যাচ্ছে। এক প্রান্তে আবার এটিএম মেশিনের কার্ড প্রবেশ করানোর মতো ব্যবস্থাও দেখা যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) শনাক্তকরণের কয়েকটি ওয়েবসাইটের সাহায্যে এই ছবিটি বিশ্লেষণ করে জানা গেল, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। শনাক্তকারী ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে ছিল সাইট ইঞ্জিন (sightengine), ডিকপি (Decopy), ইজজেন এআই (isgen.ai), জিরোজিপিটি (Zerogpt), নোটজিপিটি (notegpt), হাইভ মডারেশন (hivemoderation), মাই ডিটেক্টর (mydetector) , আনডিটেক্টবল (undetectable) ইত্যাদি।
এ বিষয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে জানা যাচ্ছে, ২০২২ সালে সুইডেনে ‘Corvid Cleaning’ নামক একটি স্টার্টআপের মাধ্যমে সুইডেনের সোদারতালিয়া (Södertälje) শহর পরিষ্কারের একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। ইংল্যান্ডভিত্তিক দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রতিবেদনে কর্ভিড ক্লিনিং এর প্রতিষ্ঠাতা ক্রিশ্চিয়ান গুন্থার হ্যান্সেন ( Christian Günther-Hanssen) জানিয়েছিলেন, সোদারতালিয়া শহরে বর্তমানে প্রতিটি সিগারেটের আধপোড়া টুকরা রাস্তা থেকে তোলার জন্য খরচ পড়ে ৮০ ওরে (সুইডিশ মুদ্রা)। যদি কাকদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে রাস্তা থেকে এই সিগারেটের টুকরা তোলার কাজ শুরু করা যায়, তাহলে প্রতিটি সিগারেটের টুকরা তোলার জন্য খরচ পড়বে ২০ ওরে। অর্থাৎ ময়ল খরচের প্রায় ৭৫% সাশ্রয় করা যাবে। নিউ ক্যালিডোনিয়ান ক্রোজ নামের এক প্রজাতির কাক দিয়ে এই পরিষ্কারের কাজটি করা যাবে। কাকদের মধ্যে এই প্রজাতির কাকটিই সবচেয়ে বুদ্ধিমান।
তবে এই পাইলট প্রকল্পের সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমে কোনো খবরাখবর দেখা যাচ্ছে না।
corvidcleaning.com -এই ডোমেইন নামে একটি ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তবে সাইটের মালিক ব্যতীত সাধারণ ব্যবহারকারীদের পক্ষে সেই সাইট ব্রাউজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
আমেরিকাভিত্তিক ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা স্নোপস এই গুজব নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ২০২৫ এর ডিসেম্বরে ক্রিশ্চিয়ান গুন্থার হ্যান্সেনের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হলেও তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি (গুন্থার) বর্তমানে কোনো সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন না।
একই বিষয়ে সোদারতালিয়া শহরের মিউনিসিপালিটি কর্তৃপক্ষের সাথে স্নোপস এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার এক কর্মকর্তা জানান, কর্ভিড ক্লিনিং এর পক্ষ থেকে ২০২২ এর বিজ্ঞান সপ্তাহে কাক দিয়ে ময়লা পরিষ্কারের একটি পাইলট প্রজেক্ট প্রদর্শন করা হয়েছিল। এই প্রদর্শনীর বাইরে, নগর কর্তৃপক্ষ এই পাইলট প্রজেক্ট নিয়ে পরবর্তীতে আর কোনো কর্মসূচীতে জড়িত হয়নি।
স্নোপস এর সম্পূর্ণ ফ্যাক্ট চেকিং প্রবন্ধ দেখতে পাবেন এখানে।
বাংলাদেশের নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যানেজমেন্ট এর জসীম উদ্দিন আহমেদ এবং সহলেখকরা এই কর্ভিড ক্লিনিং -স্টার্ট আপ এর ব্যাপারে Corvid Cleaning: Deploys Crows to Clean Up Cigarette Butts in Swedenশিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন, যেটি পরে ইমার্জিং ইকোনোমিক কেস জার্নাল এর ৭ম ভলিউমের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে কর্ভিড ক্লিনিং প্রকল্পের জন্য কিছু রেকমেন্ডেশন দেওয়া হলেও উক্ত প্রকল্পের সাফল্য কিংবা পরবর্তী অগ্রগতির কোনো তথ্য সংযুক্ত করা হয়নি।
ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাক্টস নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে ১ জানুয়ারি,২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে এই ‘Corvid Cleaning AB’ নামক স্টার্ট আপ কোম্পানিটি দেউলিয়া ঘোষিত হয়। সোদারতালিয়াতে এই স্টার্ট আপের পাইলট প্রকল্পের খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া ফেললেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী কাকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নৈতিকতার বিষয়টা প্রকল্পের পুরো সময় জুড়ে বিতর্কের বিষয় ছিল, যেহেতু নিকোটিনজাত পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে কাকদের স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
সোদারতালিয়া মিউনিসিপালিটির ওয়েবসাইট থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে Telge recycling নামক কোম্পানির সাহায্যে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বর্জ্য সংক্রান্ত নিয়মিত সেবাদানের পাশাপাশি কোনো অভিযোগ বা ইমার্জেন্সি অনুরোধের জন্য এই সংস্থার ওয়েবসাইট এবং হটলাইনে যোগাযোগের জন্য বলা হয়েছে। তবে এসব ওয়েবসাইট ঘেঁটে সোদারতালিয়াতে কর্ভিড ক্লিনিং প্রকল্প বা অনুরূপ কোনো প্রকল্পের উপস্থিতি জানা গেলো না।
তাই সার্বিক বিবেচনায় ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এসব পোস্টকে ফ্যাক্টওয়াচ ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।
Claim: সুইডেনে রাস্তার পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে- এমন একটি দাবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh