‘চট্টগ্রাম জেলা শিবিরের সভাপতি কে কুপিয়ে হত্যা করেছে বিএনপি নেতারা’- এমন একটি খবর অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এই খবরের কোনো সত্যতা নেই। এছাড়া, এই খবরের সাথে অনেকে একটি ভিডিও শেয়ার করছেন, যেটি প্রকৃতপক্ষে ভিন্ন ঘটনার পুরোনো একটি ভিডিও। সঙ্গত কারণে ফ্যাক্টওয়াচ এ সকল পোস্টকে ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।
এসব পোস্টে দাবি করা হয়, চট্টগ্রাম জেলা শিবিরের সভাপতিকে বিএনপি নেতাকর্মীরা কুপিয়ে আহত করে এবং তাকে ঢামেকে (ঢাকা মেডিকেল কলেজে) নেওয়া হলে সেখানেই তিনি মারা যান।
গত কয়েকদিনে চট্টগ্রামে ছাত্র শিবিরের কোনো শাখার সভাপতি বা শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতার হত্যাকান্ডের খবর মূলধারার কোনো গণমাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ছাত্রশিবিরের ওয়েবসাইট কিংবা ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও এমন ধরনের কোনো খবর দেখা যাচ্ছে না।
তদুপরি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদকআজিজুর রহমান আজাদ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি স্ট্যাটাসে জানাচ্ছেন, ‘চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রশিবির সভাপতিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে এমন একটি নিউজ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি সত্য নয়, একটি চক্র পরিকল্পিত প্রোপাগাণ্ডার অংশ হিসেবে এমন খবর প্রচার করছে।’
চট্টগ্রামে শিবিরের সভাপতির নিহতের খবরের সাথে সাথে অনেকে ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। এই ভিডিওতে কোনো একটি হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনের ব্যস্ত কিছুটা সময় দেখানো হয়েছে। ৩৫ সেকেন্ডের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালের গেটে একটি ‘রেফ্রিজারেটেড স্টোরেজ ট্রাক’ দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই ট্রাক এর দরজা খোলা এবং কয়েকজন সেখান থেকে (সম্ভবত) মরদেহ নামানোর কাজ করছেন। ইতিমধ্যে ট্রাকের সামনে থেকে একজন আহত বা নিহত রোগীকে স্ট্রেচারে করে ৩ জন জরুরী বিভাগের গেট দিয়ে ভিতরে নিয়ে যাচ্ছেন। আর হাসপাতালের দিক থেকে আরেকটি এ্যাম্বুলেন্স বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় আনসার বাহিনীর সদস্যদের, এবং DMCH RRT লেখা ভেস্ট পরিহিত কর্মীদের জরুরী বিভাগের সামনে দেখা যাচ্ছে। ভিডিও ধারণকারীকে এই ভিডিওতে কোনো কথা বলতে শোনা যায়নি। উপস্থিত জনতার মধ্যে একজনকে অপেক্ষাকৃত উচ্চস্বরে মরদেহের গোসল করানোর কথা বলতে শোনা যায়।
রিভার্স ইমেজ সার্চের সাহায্যে এই ভিডিওটির মূল উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ভিডিওর কিছু উপাদানের মাধ্যমে মূল ঘটনার সময়কাল বের করা সম্ভব হয়েছে।
DMCH RRT – এই কি ওয়ার্ড ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেল, তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের র্যাপিড রেসপন্স টিম এর সদস্য। অগ্নিকান্ড,ঘূর্ণিঝড়, ভুমিকম্প বা কোনো বড় দুর্যোগের সময় এই র্যাপিড রেসপন্স টিমকে নিয়োজিত করা হয়। তারা আহত রোগীদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সঠিক জায়গায় (যেমন অপারেশন থিয়েটার, বা আইসিইউ) পাঠায়, এবং প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসাও দিয়ে থাকে। ডাক্তার, নার্স এবং ওয়ার্ডবয়দের সমন্বয়ে এই টিম গঠিত।
পরবর্তীতে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের গেট দেখানো হয়েছে এমন ভিডিওর সাথে আমাদের আলোচ্য ভিডিও মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেল যে এটি ঢাকা মেডিকেলের জরুরী বিভাগের (এমার্জেন্সি গেট) সামনের দৃশ্য।
ভিডিওর একটি ফ্রেমে উপরের দিকে ভবনের গায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত একটি হোর্ডিং দেখা যাচ্ছে। এই দৃশ্যে বোঝা যাচ্ছে যে দৃশ্যটি বর্তমান সরকারের শাসনামলের নয়, বরং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের কোনো এক সময়ের চিত্র এটি।
এই ফ্রেমটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করার মাধ্যমে অনুরূপ কয়েকটি ছবিযুক্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেল, যেখানে ‘মুজিব শতবর্ষ’ এর হোর্ডিং রয়েছে । যেমন দেখুন এখানে,এখানে। এসব ছবির সাথে ভিডিওর অন্যান্য উপকরণ (ভবনের সামনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর বড় আকারের একটি রেফ্রিজারেটেড ট্রাক, সামনে কয়েকজন আনসার সদস্য, রাতের পরিবেশ) মিলে যাচ্ছে।
এমনকি ,ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত ছবিতে রেফ্রিজারেটেড স্টোরেজ ট্রাকের সামনে দাঁড়ানো নীল শার্ট পরিহিত র্যাপিড রেসপন্স টিমের একজন কর্মীকে মূল ভিডিওতে সনাক্ত করা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট খবর থেকে জানা যাচ্ছে, এই ছবিগুলি ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখের রাতের দৃশ্য। সেই রাতে ঢাকার বেইলী রোডে অবস্থিত একটি রেস্তোরায় অগ্নিকান্ডের ফলে অনেকে অগ্নিদগ্ধ হন। আহতদের এসময় একে একে ঢাকা মেডিকেলের জরুরী বিভাগের সামনে আনা হতে থাকে।
‘বিডিনিউজ২৪ ডট কম’ এ ১ মার্চ ২০২৪ এ প্রকাশিত ‘ট্রাক ভর্তি লাশ, কান্নায় ভারি ঢাকা মেডিকেল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই রেফ্রিজারেটেড ফ্রিজিং ট্রাকের ছবি রয়েছে। ছবির ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ‘বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে আগুনে মৃতদের বিশাল এই ফ্রিজিং ট্রাকে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।’
এই প্রতিবেদনের ভিতরের অংশে লেখা হয়, ‘রাত একটার আগেই সাইরেন বাজিয়ে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স আসছিল ঢাকা মেডিকেল ও শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে।
সেসব অ্যাম্বুলেন্সকে ঘিরে মানুষরা ভিড় করছিলেন, জিজ্ঞেস করছিলেন ‘বাইচা আছে না লাশ’?উদ্ধারকর্মীদের মুখে কোন জবাব নেই।নিথর দেহগুলো তুলে ‘ঘর ঘ’র শব্দে ট্রলিগুলো নিয়ে চলে যান হাসপাতালের ভেতরে জরুরি বিভাগের মর্গে ………… এর মধ্যে রাত একটা ২৪ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল প্রাঙ্গণে আসে বিরাট এক কাভার্ড ভ্যান। ফায়ার সার্ভিসের এই রেফ্রিজারেটর স্টোরেজ ট্রাকটি দেখে স্বজনদের আর বুঝতে বাকি থাকে না এর ভেতরে রয়েছে কেবলই লাশ। ট্রাক থেকে নামানো হয় একে একে দশটি মরদেহ। ‘
এ সকল তথ্য-প্রমাণ দেখে বোঝা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত ১টা ২৪ মিনিটের পরে রেফ্রিজারেটেড ফ্রিজিং ট্রাক থেকে মরদেহ নামানোর সময়ের ভিডিও এটি। সাম্প্রতিক সসময়ের কোনো ভিডিও নয়।
সিদ্ধান্ত
যেহেতু, চট্টগ্রাম জেলার কোনো শিবির সভাপতি হত্যার কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছেনা, এবং ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও বলে প্রমাণিত হচ্ছে, তাই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এসকল পোস্টকে ফ্যাক্টওয়াচ ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।
Claim: চট্টগ্রাম জেলা শিবিরের সভাপতি কে কুপিয়ে হত্যা করেছে বিএনপি নেতারা’- এমন একটি খবর অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh