জাপানী যুবকের স্থায়ীভাবে কুকুরে রূপান্তরের ভিডিওটি এআই নির্মিত 

59
জাপানী যুবকের স্থায়ীভাবে কুকুরে রূপান্তরের ভিডিওটি এআই নির্মিত 
জাপানী যুবকের স্থায়ীভাবে কুকুরে রূপান্তরের ভিডিওটি এআই নির্মিত 

‘ছাব্বিশ বছরের জাপানি যুবক ৪০ দিনের চেষ্টায় কুকুরে রুপান্তরিত হয়েছেন’- এমন একটি খবর ও ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এখানে যে ভিডিওটি ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ( এআই) দিয়ে নির্মিত। জাপান সহ বিশ্বের অনেক দেশেই স্বল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে কুকুর বা অন্য প্রাণীর মতো জীবন যাপন করার একটা আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। এজন্য অনেকে কুকুরের উপযোগী কলার,চেইন বা পোশাক পরিধান করেন এবং কুকুরের মতই হাঁটা-চলার চেষ্টা করেন। তবে শরীরে প্লাস্টিক সার্জারি করে স্থায়ীভাবে কুকুরে রুপান্তরের চেষ্টার কোনো ঘটনা নির্ভরযোগ্য কোনো গণমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।

ছড়িয়ে পড়া এমন কয়েকটি পোস্ট দেখতে পাবেন  এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে । 

এসব পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, ‘২২০ কোটি টাকা খরচ করে প্লাস্টিক সার্জারি করে কুকুরে পরিণত  হলেন জাপানী এক যুবক ‘ (বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

তবে এই যুবকের নাম বা পরিচয়সূচক অন্য কোনো তথ্য এসব পোস্টে এবং ভিডিওতে পাওয়া যায়নি।

ভিডিওটিতে থাকা ‘প্রাণী’কে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, তার শরীরে কোনো লোম নেই। শরীর এবং মুখ জুড়ে প্রচুর উল্কি বা ট্যাটু রয়েছে, যা তার মূল চামড়াকে আড়াল করে দিচ্ছে। চোখ দুটি দেখে মনে হচ্ছে, মানুষেরই চোখ। তবে মুখমণ্ডলের দুই পাশে দীর্ঘ দু’টি কান রয়েছে এবং শক্ত সূচালো নাক রয়েছে। এছাড়া, চোয়ালের দুপাশে দাড়ি এবং নাকের নিচে গোঁফ না থাকলেও নাকের পাশ দিয়ে কয়েক গোছা করে দাড়ি দেখা যাচ্ছে। মুখের ভেতরে দুইটা দীর্ঘ পাটিতে কুকুরসুলভ দাঁতও দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া শরীরের পেছনে একটি লেজও দেখা যাচ্ছে।

এখানে মূল পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে মুখমণ্ডল এবং মাথার খুলিতে। মানুষের মুখ গোলাকার কিন্তু কুকুরের মুখ লম্বাটে যেখানে নাকটি বেশ দীর্ঘ। প্লাস্টিক সার্জারি করার মাধ্যমে মূলত  ত্বক এবং মাংসপেশীতে  পরিবর্তন করা হয়। অল্প কিছু ক্ষেত্রে নাক কিংবা চিবুকের হাড় কেটে বা হাড়ের অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে শল্যচিকিৎসকগণ (সার্জন) রোগীর চেহারা পুনর্নির্মাণ করেন।  কিন্তু মাথার খুলি এবং চোয়ালের হাড়ে ব্যাপক পরিবর্তন করে গোল মুখমন্ডলকে লম্বাটে বানানোর কোনো ঘটনা কখনো শোনা যায়নি। জাপানি যুবকের ক্ষেত্রে যদি এমনটা সম্ভব হতো, তাহলে এটাকে চিকিৎসাবিদ্যার একটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হত এবং এটা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচুর আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি। ছোট কিছু ফেসবুক ক্লিপের বাইরে এই ঘটনা সম্পর্কে আর কিছু জানা যাচ্ছে না।

ভিডিওটার বিভিন্ন ফ্রেম আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে। যেমন কখনো প্রাণীটির চিকন লেজ আবার কখনো তুলনামূলকভাবে লোমশ লেজ দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ সময় প্রাণীটির কুকুরের মত গোঁফ দেখা গেলেও একটা ফ্রেমে তার মুখে মানুষের মত দাড়ির রেখা দেখা যাচ্ছে। হাত এবং পায়ে অধিকাংশ সময় ৫ টি করে আঙুল (মানুষের মত) দেখা গেলেও কয়েকটা ফ্রেমে ৪ টি করে আঙুল (কুকুরের মত) দেখা যাচ্ছে। এসব দেখে ধারণা করা যায় যে এটি সম্ভবত কোনো বাস্তব ভিডিও নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্তকারী কিছু টুল এর সাহায্যে এই ভিডিওটি পরীক্ষা করা হলে তারা একে কৃত্রিমভাবে নির্মিত বলে রায় দিয়েছে। জিরোজিপিটি’র বিশ্লেষণে, এই ভিডিওটা এ আই নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা ৯৪%। ডিটেকটিভ এ আই এর বিশ্লেষণে, এটা এ আই দ্বারা নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা ৮৩%। 

আন্তর্জাতিক অন্য কয়েকটি ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা এবং গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, তারা এটিকে এআই নির্মিত ভিডিও হিসেবে শনাক্ত করেছেন। যেমন – বুমলাইভ, ফ্যাক্টক্রিসেন্ডো, দ্য কুইন্ট, টেকপানা ইত্যাদি। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিছু সংখ্যক মানুষের মাঝে মানুষ ব্যতীত অন্য কোনো প্রাণী হিসেবে স্বল্প সময় বা দীর্ঘ সময় ধরে অভিনয় করার প্রবণতা রয়েছে, যাকে সাধাণত ‘অ্যানিমাল রোলপ্লে’ বা ‘পেটপ্লে’ বলা হয়। অনেকে একে মানসিক অসুস্থতা ভাবলেও আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন এর Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders, Fifth Edition (DSM-5) অনুসারে একে মানসিক ব্যাধি হিসেবে শনাক্ত করা হয়নি

পেটপ্লেতে যেসব প্রাণীকে মানুষ বেশি অনুকরণ করার চেষ্টা করে, তাদের মধ্যে রয়েছে ঘোড়া, গরু, বেড়াল এবং কুকুর। অনেকে এসব চরিত্রের মধ্যে দীর্ঘদিন থাকে, এবং দিনের পর দিন এই চরিত্র হিসেবে বসবাস করে। টোকো নামের এক জাপানি যুবক এভাবে একটি লোমশ কুকুরের কস্টিউম পরে রাস্তায় এবং পার্কে ঘোরাঘুরি করতে পছন্দ করে। লন্ডনে টম এবং ডেভিডের কুকুর জীবনের কথা জানা যায় গার্ডিয়ানের এই প্রতিবেদনে। ডেইলি মিররের এই প্রবন্ধ থেকে জেমস নামক আরেকজন কুকুর-মানব সম্পর্কে জানা যায়। ঢাকার রাস্তাতেও ২০১৯ সালে এক তরুণকে প্রকাশ্য রাস্তায় গলায় চেইন নিয়ে চার হাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে কুকুরের মত করে হাটতে দেখা গিয়েছিল। তবে লক্ষণীয় যে এইসকল ক্ষেত্রেই এসব ব্যক্তিরা নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করেছেন (যেমন ২ পায়ে হাঁটার বদলে চার পায়ে হাঁটছেন), কিংবা আলাদা কস্টিউম পরছেন। কেউই প্লাস্টিক সার্জারি করে স্থায়ীভাবে নিজের শারীরিক পরিবর্তন করছেন না।

যেহেতু জাপানি কোনো যুবকের ‘প্লাস্টিক সার্জারি করে কুকুরে রূপান্তর’ এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছেনা, তাই সঙ্গত কারণে ফ্যাক্টওয়াচ এই সকল পোস্ট এবং ভিডিওকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে শনাক্ত করছে।

Claim:
ছাব্বিশ বছরের জাপানি যুবক ৪০ দিনের চেষ্টায় কুকুরে রুপান্তরিত হয়েছেন’- এমন একটি খবর ও ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh