রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুন দেওয়ার ঘটনার পর অনেকে দাবি করছেন, ৮০ এর দশকের হাইকোর্টের মাজারের প্রখ্যাত নূরা পাগলা-ই পরবর্তী জীবনে গোয়ালন্দে অবস্থান করছিলেন এবং সম্প্রতি তার মৃত্যুর পরে তার কবর থেকে মৃতদেহ বের করে উত্তেজিত জনতা আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে । তবে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এই দুই ব্যক্তি এক নন। তাদের ছবিতে এই পার্থক্য পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ঢাকার হাইকোর্টের মাজারের নূরা পাগলা ছিলেন শীর্ণদেহী । পক্ষান্তরে রাজবাড়ীর নুরাল পাগলা স্বাস্থ্যবান এবং মাথায় আংশিক টাক। ঢাকার নূরা পাগলা আনুমানিক ২০০৮ সালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, পক্ষান্তরে রাজবাড়ির নুরাল পাগলা ২০২৫ এ মৃত্যুবরণ করলেন।
গুজবের উৎস
মাহবুব মোর্শেদ মানিক লিখেছেন, “১৯৭৩ সালের ১০ আগস্ট তারিখের সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র প্রচ্ছদ!
হাইকোর্টের মাজারে এক সময় এই নুরা পাগলা বসতেন। পপ সম্রাট আজম খানের সাথে তাঁর ছিল গভীর আধ্যাত্মিক যোগাযোগ। তাঁকে কেন্দ্র করেই এই গান রচনা করেন আজম খান। অবশেষে সেই নুরা পাগলা কে কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতিকারীরা। যাদেরকে সাংবাদিক বলছে তৌহিদী জনতা! কি নির্মম পরিহাস!”
রাজবাড়ি মেইল এবং দ্য বিজনেস ডেইলি তে ২৩ আগস্ট এ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, “না ফেরার দেশে চলে গেলেন গোয়ালন্দ পাক দরবার শরীফের পীর মোঃ নুরুল হক (৮৫)। শনিবার ভোর সারে ছয়টায় ঢাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
তিনি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার পাচ নম্বর ওয়ার্ডের অধিবাসী হাতেম মোল্লার ছেলে। তিনি ছিলেন বাবা মায়ের তিন ভাই এক বোনের মধ্যে ছোট।
গোয়ালন্দ পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে গোয়ালন্দ পাক দরবার শরীফে বসবাস করতেন। কৈশোর থেকে মাটির বদনা বাজিয়ে গান বাজনা শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে তিনি শেষ ইমাম মেহেদী’ র (রাঃ) দ্বীন প্রচার করতেন বলে যানা গেছে। “
এ সকল প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, গোয়ালন্দের নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। সেই মোতাবেক তার জন্ম ১৯৪০ সালে।
অন্যদিকে, ১৯৭৩ সালের ১০ আগস্ট সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় প্রকাশিত নূরা পাগলা ও আজম : সঙ্গীতে আধ্যাত্মিক প্রেরণা শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, “নূরা পাগলার বয়স আশির ওপরে। অথচ পেশীবহুল পেটানো শরীর দেখে মনে হবে কোনোক্রমেই ষাট পেরোয়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি বৃটিশ আর্মিতে ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ করেছেন। বসরার কথা তার এখনো মনে আছে।”
বিচিত্রার এই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সাংবাদিক গৌতম কে শুভ লিখেছেন, “১৯৭৩ সালের প্রকাশিত ‘বিচিত্রা’য় নূরা পাগলায় বয়স লেখা হয়েছিল আশির ওপরে। তবে সত্তরের দশকে হাইকোর্টের মাজারে যাঁরা নূরা পাগলাকে দেখেছেন, তাঁদের মতে তখন তাঁর বয়স ছিল ৬০ বছরের আশেপাশে। বিচিত্রার ছবি ও বিদেশি এক ফটোগ্রাফারের তোলা নূরা পাগলার ছবিতে সেই বয়সের ছাপ পাওয়া যায়। “
অর্থাৎ, ১৯৭৩ সালে তার বয়স ৬০ বছর ধরে নিলে, তার জন্ম দাড়াচ্ছে ১৯১৩ সালে। আবার তখন তার বয়স ৮০ বছরে ধরে নিলে জন্মসন দাঁড়াচ্ছে ১৮৯৩। দুটি সালই রাজবাড়ীর নুরাল পাগলার জন্মসন থেকে অনেক পূর্বের।
সাংবাদিক আনোয়ার পারভেজ হালিম তার ফেসবুক একাউন্ট থেকে গত ৬ সেপ্টেম্বর একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “বিচিত্রার নূরা পাগলা এবং গোয়ালন্দের নূরাল পাগলা এক নয়
🔻 রাজবাড়ির গোয়ালন্দে নূরাল পাগলার মাজারে হামলা, কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলার পর অনেকেই দেখছি বিচিত্রার একটি পুরোনো প্রচ্ছদ পোস্ট করেছেন। বিচিত্রা নূরা পাগলা ও পপ গায়ক আজম খানকে নিয়ে ১৯৭৩ সালে একটি কাভার স্টোরি করেছিল। পোস্টদাতাদের দাবি, বিচিত্রার সেই নূরা পাগলা আর গোয়ালন্দের নূরাল পাগলা একই ব্যক্তি।
তাদের এই দাবি সঠিক নয়। মিথ্যা।
বিচিত্রার নূরা পাগলা ছিলেন শিক্ষিত। মুক্তিযোদ্ধা। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী (সূত্র: সৈয়দ তারিক)। যুদ্ধফেরত নূরা মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়াতেন। জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে হাইকোর্টের মাজারে। আধ্যাত্মিক গান করতেন। সেইসূত্রে তার সঙ্গে পপ গায়ক আজম খানের সাক্ষাৎ হয়। তাকে নিয়ে আজম খানের একটি বিখ্যাত গান আছে:
২০০৮ সালের দিকে সর্বশেষ জেনেছিলাম, নূরা পাগলা অসুস্থ। গুলশানের শাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সম্ভবত ওই সময়ে বা তার কিছু পরে তিনি মারা যান। তার ছোট ছেলে বাবার লাইনে আছেন বলে শুনেছি। নূরা পাগলাকে নিয়ে কিছু মিথ আছে।
আবারও বলি, নূরা পাগলা আর নূরাল পাগলা এক ব্যক্তি না।”
সাংবাদিক আনোয়ার পারভেজ হালিম এর সাথে সুর মিলিয়ে কবি সৈয়দ তারিকও জানাচ্ছেন, ঢাকার এই নূরা পাগলা মারা গিয়েছেন আনুমানিক ২০০৮ সালে। সাংবাদিক গৌতম কে শুভ কবি সৈয়দ তারিকের ২০১৮ সালের লেখা থেকে উদ্ধৃত করে জানাচ্ছেন, হাইকোর্ট পর্ব শেষে নূরা পাগলা থাকতেন ঢাকার রামপুরায়। রামপুরা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার ফেসবুক পোস্ট অনুসারে, রামপুরা টিভি সেন্টারের পেছনের দিকে নূরা পাগলার মাজার।
এই পরিবারের সাথে সম্পর্কযুক্ত জনৈক আশিকুর রহমান একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে দাবি করছেন, “২০০৭-৮ এর দিকে নুরা পাগলা এন্তেকাল করেন এন্তেকাল এর সময় ওনার বয়স ছিল ৯০-৯৫ বছর। ওনাকে ওনার কথা মতো ওনার বসত ঘরের ভিতরেই সমাধী করা হয়। কিন্তু বিদেশে যে ছেলে দুজন ছিলো তারা দেশে এসে ঘর থেকে তুলে কবরস্থানে নিয়ে আবার মাটি দেয়। একে একে ৬ মাস পর পর তাকে ৭ বার কবর থেকে তোলা হয়েছিলো। কিন্তু তার দেহ পুরো অক্ষত ছিলো। পরে তাকে আবার তার ঘরের ভিতর ই সমাধী করা হয়। ও পরে মাজার শরীফ করা হয়। ওনার মাজার শরীফ বর্তমান এ ঢাকা রামপুরা টিভি সেন্টারের পিছনে অবস্থীত। সেখানে তার বিসাল বাউন্ডারি করা বাড়ি ও মাজার শরীফ রয়েছে। প্রতি বছর ওখানে ওনার নামে ওরশ শরীফ হয় ও বৈশাখ মাসে একটি বাৎসরিক ওরশ শরীফ করেন। নুরা পাগলা মারা জাওয়ার আগে ওনার মেজো ছেলে খাজা নিজাম উদ্দিন ওরফে (খাজা পাগলা) কে ওনার গদিতে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। ওনার পরে ওনার ছেলে বহু বছর ওনার গদি চালিয়েছেন। ২০২০ সালে নুরা পাগলার মেজো ছেলে খাজা নিজাম উদ্দিন ওরফে (খাজা পাগলা) ও মারা জান।”
অর্থাৎ যে কয়েক বছর আগেই মারা গিয়েছেন এবং যার মাজার রয়েছে, তার নতুন করে মৃত্যুবরণ কিংবা তার জন্য মাজার নির্মাণ হবার কোনো যৌক্তিকতা নাই। ফলে, এটা নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়, গোয়ালন্দের নুরাল পাগলা ভিন্ন ব্যক্তি।
এছাড়া, গণমাধ্যমে এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই দুজনের ছবিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, গোয়ালন্দের নুরাল পাগলা স্বাস্থ্যবান।তার মুখভর্তি দাড়ি ,অপেক্ষাকৃত ছোট গোঁফ এবং মাথার সামনের দিকে টাক ছিল। ছবিগুলোতে তাকে সাদা গেঞ্জি ও সাদা লুঙ্গিতে দেখা গিয়েছে।
অপরদিকে ঢাকার হাইকোর্টের নূরা পাগলা কম কাপড়চোপড় পরিধান করতেন। ছবিগুলোতে তাকে কেবলমাত্র নেংটি জাতীয় পোশাকে দেখা গিয়েছে। এছাড়া তার শরীর শীর্ণ, মাথাভর্তি চুল,পাকানো গোঁফ এবং অপেক্ষাকৃত লম্বা দাড়ি দেখা যাচ্ছে।
অর্থাৎ, এটা নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে যে রাজবাড়ী এবং ঢাকার নুরাল পাগলা ও নূরা পাগলার মধ্যে নামের সাদৃশ্য থাকলেও দুজন ভিন্ন ব্যক্তি। যেসকল ফেসবুক পোস্টে এই দুজনকে একই ব্যক্তি দাবি করা হচ্ছে, ফ্যাক্টওয়াচ সে সকল পোস্টকে ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।
Claim: This rumor concerns the identity of two prominent Sufi influencers in Bangladesh with almost identical names. The first, Nura Pagla, was active in Dhaka during the 1970s and 1980s. The second, Nural Pagla, became known in Rajbari after the 1980s. Some people claim that they are the same individual. However, based on historical evidence, journalists’ opinions, and image analysis, it is clear that they are two different persons. Therefore, Factwatch has marked Facebook posts that falsely claim they are the same person as ‘False’.
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh