সম্প্রতি ফেসবুকে পানির ওপর একটি গাছের ডালে বসে থাকা এক নারীর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, চট্টগ্রামের চলমান ভয়াবহ বন্যায় গর্ভে ৯ মাসের সন্তান নিয়ে নিজের ও অনাগত সন্তানের জীবন বাঁচাতে এই অসহায় গর্ভবতী মা গাছের ডালে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভাইরাল হওয়া এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মূলত, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকেই একই ধরণের বিভ্রান্তিকর ক্যাপশনে এই ভিডিওটি ফেসবুকে পাওয়া যাচ্ছিল। এটি মূলত সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে আনন্দের ছলে তোলা সাধারণ ভিডিও। এর একটি নির্দিষ্ট ফ্রেম বা স্ক্রিনশটকে পরবর্তীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে এডিট করা হয়েছে।
আলোচিত ভিডিওটি সম্পর্কে জানার জন্য শুরুতেই এর বিভিন্ন কি-ফ্রেম ব্যবহার করে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। এর ফলে ‘Sad‘ নামের একটি ফেসবুক পেজে ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট আপলোড করা ভাইরাল ভিডিওটির অনুরূপ একটি ভিডিওর সন্ধান পাওয়া যায়। সেই মূল ভিডিওটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে কোনো বিপদের চিহ্ন বা জীবন বাঁচানোর আকুতি ছিল না। ভিডিওতে থাকা নারীটি মূলত আনন্দের ছলে, ছবি তোলার উদ্দেশ্যে পানির মধ্যে থাকা একটি গাছের ডালে হেলান দিয়ে পোজ দিচ্ছিলেন। শুধু তাই নয়, ভিডিওতে তাকে ক্যামেরার পেছনের ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নিজের একটি সুন্দর ছবি তুলে দেওয়ার জন্য বলতেও শোনা যায়। কিন্তু চট্টগ্রামে বন্যার দৃশ্য দাবিতে ছড়ানো ভিডিওগুলোতে একটা গান যুক্ত করে দেওয়ায় আসল অডিও শুনতে পাওয়া যায়না। অর্থাৎ, এটি দুর্যোগের কোনো দৃশ্য নয়, বরং সম্পূর্ণ বিনোদনমূলক একটি ভিডিও ছিল।
ভিডিওটির চারপাশের পরিবেশের সাথে চট্টগ্রামের বন্যা কবলিত কোনো অঞ্চলের মিল পাওয়া যায়নি। ভিডিওটির কমেন্ট সেকশন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অনেকেই স্থানটিকে ‘টাঙ্গুয়ার হাওর’ বা ‘নিকলি হাওর’ বলে উল্লেখ করছিলেন। এই সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে স্থানটির সাথে সুনামগঞ্জের বিখ্যাত পর্যটন এলাকা টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারের আশেপাশের এলাকার মিল পাওয়া যায়। এরপরে Joynal Anjana Vlogs নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে ভাইরাল ভিডিওটির অনুরূপ একটি ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ করা হয় ভিডিওটি টাঙ্গুয়ার হাওরের।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া মূল ভিডিওটিতে সরাসরি কোনো এআই ব্যবহারের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে, ছবিটিতে পাওয়া গিয়েছে। ছবিটিতে নারীর হাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, গাছের ডালটি ধরে থাকা হাতটির আঙুল ও গঠনে এক ধরণের অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, যা সাধারণত এআই দিয়ে ছবি এডিট বা জেনারেট করার কারণে ঘটে থাকে। এছাড়া ছবিটিতে তার অন্য হাতটিও অদৃশ্য অবস্থায় দেখা যায়।
চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই ধরনের কোনো গর্ভবতী নারীর গাছে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক প্লাবন চলতি বছরের ৫ জুলাই থেকে শুরু হয়। সুতরাং, আলোচিত ছবি এবং ভিডিওগুলো চট্টগ্রামে বন্যা শুরু হওয়ার অনেক আগের ঘটনার। তাই সবকিছু বিবেচনা করে এই পোস্টগুলোকে ফ্যাক্টওয়াচ মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
Claim: গর্ভে ৯ মাসের বাচ্চা তবুও জীবন বাঁচানোর জন্য গাছে উঠছেন একজন মা
Claimed By: Facebook users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh