মাদ্রাসা ছাত্রদের কোরআন তিলাওয়াতের ভিডিওটি নেপালের নয়, কিরগিজস্তানের

79
মাদ্রাসা ছাত্রদের কোরআন তিলাওয়াতের ভিডিওটি নেপালের নয়, কিরগিজস্তানের
মাদ্রাসা ছাত্রদের কোরআন তিলাওয়াতের ভিডিওটি নেপালের নয়, কিরগিজস্তানের

নেপালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে কোরআন তিলাওয়াত করছেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা- এমন দাবিতে একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এটি কিরগিজস্তানের ভিন্ন একটি ঘটনা, যে ঘটনার ভিডিও কয়েক মাস আগে থেকেই অনলাইনে রয়েছে। পাহাড়ি নদীতে নিখোঁজ হওয়া একটি বালককে উদ্ধারের জন্য পেশাদার উদ্ধারকর্মীদের কাজের পাশাপাশি সেখানে স্থানীয় মাদ্রাসার ছাত্ররা কোরআন তিলাওয়াত করে দোয়া করছিল। এই ভিন্ন ঘটনার ভিডিওটাই নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার সাথে সম্পর্কিত দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।

ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে।


এই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি পাহাড়ি এলাকায় রাস্তার কিনারে কিছু বালক কোরআন শরীফ তিলাওয়াত করছে। রাস্তার উপরে কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষীকে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। একটু নিচে একটি পাহাড়ি নদী দেখা যাচ্ছে।


এখানে যে নিরাপত্তাকর্মীদের দেখা যায়, তাদের বুকের ব্যাজের সাথে নেপালের পুলিশের পোশাক বা ব্যাজের মিল দেখা যাচ্ছেনা।

এই পোশাক এবং লোগো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এটি ‘Center for Emergency Situations and DIsaster Risk Reduction (CESDRR)’ নামক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের পোশাক। এই প্রতিষ্ঠানটি কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান সরকারের যৌথ উদ্যোগে ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। ভূমিকম্প,বন্যা, অগ্নিকান্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে এই সংগঠনের সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করে।

অর্থাৎ এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ভিডিওটি নেপালের নয়, বরং কাজাখস্তান বা কিরগিসজস্তানের কোনো এলাকার দৃশ্য এটি।

এই ভিডিওর মূল উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, এই বছরের ২৫ জুন ইনস্টাগ্রামে এই ভিডিওটি আপলোড করা হয়েছিল। ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের নাম ‘sez1lllmka’ । ভিডিওতে কোনো ক্যাপশন না থাকলেও , একজন ব্যবহারকারীর কমেন্ট থেকে জানা যায় যে, ‘তারা কিরগিজস্তানের পাহাড়ি এলাকায় নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ একত্রিত হয়ে এই অনুসন্ধান অভিযানে অংশ নিয়েছেন। আর মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও কোরআন তিলাওয়াত করে এই অনুসন্ধান সফল হওয়ার জন্য দোয়া করতে সেখানে এসেছেন।’

এই ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের বায়োতে রুশ ভাষায় লেখা রয়েছে- ‘МЧС КР | Пресс-служба УМЧС по Чуйской области’ যার ইংরেজি অর্থ দাঁড়ায় ‘Ministry of Emergency Situations of the Kyrgyz Republic | Press Office of the Ministry of Emergency Situations of Chui Region’।

অর্থাৎ,কিরগিজস্তানের ‘চুই’ নামক অঞ্চলের জরুরী বিভাগের জনসংযোগ দপ্তরের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট এটা। 

ম্যাপ বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, কিরগিজস্তানে ‘চুই (Chui)’ নামে একটি প্রদেশ রয়েছে। দেশটির রাজধানী বিশকেক এই চুই প্রদেশেই অবস্থিত।

পরবর্তী ধাপে, কিরগিজস্থানের চুই অঞ্চলে বন্যা বা বিপর্যয় বা উদ্ধার অভিযান – এই কি ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালানো হয়। এই পর্যায়ে স্থানীয় গ্যালাক্সি নিউজ, চ্যানেল সেভেন এবং বিবিসি নিউজ কিরগিজ এর ২৬ জুন, ২০২৬ এর ৩ টা প্রতিবেদন পাওয়া যায়। কিরগিজ ভাষায় লেখা এসব খবর অনুবাদ করে জানা যাচ্ছে, কিরগিজস্তানের উসমান নামের এক বালক গত ২৩জুন, ২০২৬ এ একটি দুর্ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন । 

জানা যায়, সেদিন বাবা মা ও দুই সন্তান সহ চার সদস্যের একটি পরিবারকে নিয়ে তাদের গাড়িটি পাহাড়ের খাড়া ঢাল থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে নদীতে গিয়ে পড়ে।শিশু দুটির বাবা-মা নিজেরাই গাড়ি থেকে বের হতে সক্ষম হলেও প্রবল স্রোতে সন্তানরা কেগেতি নদীতে ভেসে যায়। পরে উদ্ধারকারীরা মেয়েশিশুটির মরদেহ খুঁজে পান। ছেলেশিশুটির সন্ধানে উদ্ধারকারীরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। পেশাদার উদ্ধারকারীদের কাজের পাশাপাশি কোরাআনের হাফেজরা (যারা সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করেছেন) নদীর তীরে এসে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, যাতে উসমানকে খুঁজে পাওয়া যায়।

এসব খবরের সাথে প্রচারিত ভিডিওতে নদীতীরে বিভিন্ন কিশোর-তরুণ বয়সী বালকদের কোরআন শরীফ পড়তে দেখা যায়। সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সাথে এসব ভিডিওর সম্পূর্ণ মিল না থাকলেও এসব ভিডিওতেও একই পোশাক পরিহিত উদ্ধারকর্মীদের কাজ করতে দেখা যাচ্ছে।

একই বালকের নিখোঁজের তথ্য পাওয়া যায় ‘চুই আঞ্চলিক প্রশাসন’ নামক ফেসবুক পেজের ২৩ জুনের পোস্ট থেকেও। এই পেজ থেকে এই ধরনের অনেক উদ্ধার অভিযানের নিয়মিত খবর এবং ভিডিও প্রকাশ করা হলেও উসমান নামের আলোচ্য ওই বালকের উদ্ধার অভিযানের কোনো ফলো-আপ আর দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, নেপালের বন্যার ঘটনা ঘটেছে ২৬ আগস্ট তারিখে। অর্থাৎ, কিরগিজস্থানের উসমান নিখোঁজ হওয়ার ২ মাসেরও বেশি সময় পরে। এই বন্যার ২ মাস আগে থেকেই অনলাইনে উক্ত ভিডিওটি রয়েছে। ফলে এটি কোনোভাবেই নেপালের বন্যার ভিডিও হতে পারে না।

এ বিষয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতভিত্তিক নিউজচেকার এবং লেবাননভিত্তিক আন নাহার। উভয়ে নিশ্চিত করেছে, এই ভিডিওটি নেপালের নয়,বরং কিরগিজস্তানের কয়েক মাস আগের ঘটনা।  

 সার্বিক বিবেচনায়, ফ্যাক্টওয়াচ এই পোস্টগুলোকে ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।

Claim:
নেপালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে কোরআন তিলাওয়াত করছেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা- এমন দাবিতে একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

Claimed By:
Facebook users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh