বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ নয়নের ফিরে আসার দাবিটি গুজব

308
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ নয়নের ফিরে আসার দাবিটি গুজব
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ নয়নের ফিরে আসার দাবিটি গুজব

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকার লালবাগে গুলিবিদ্ধ হন ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের নয়ন। পরে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৯ আগস্ট মারা যান। সম্প্রতি ফেসবুকে একটি যুগলের ছবি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ছাত্র আন্দোলনের শহীদ নয়ন ফিরে এসেছে। সে বোরহানউদ্দিন উপজেলার ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা।দাবিটি লিখিত আকারে কোনো ছবি ছাড়াও ফেসবুকে প্রচার হচ্ছে। তবে ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ হওয়া নয়নের ফেরত আসার দাবিটি মিথ্যা।

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে দৈনিক আজকের ভোলা নামের একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে নয়নের ফেরত আসার দাবিটি প্রসঙ্গে সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়।

গত বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) সংবাদমাধ্যমটিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবে শহীদ নয়ন ফিরে এসেছে এমন গুজব ছড়িয়ে ফেসবুকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের নুরুল ইসলামের পুত্র নয়ন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন ঢাকার লালবাগে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও পরে একটি প্রাইভেট হসপিটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৯ আগষ্ট মারা যান। নিহতের পরিবার তাঁর মরদেহ নিজ জন্মস্থান ভোলায় নিয়ে আসেন এবং তাঁকে বিএনপি নেতা হাফিজ ইব্রাহিমের প্রতিষ্ঠিত কলেজ প্রাঙ্গণের মসজিদের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

প্রতিবেদনটি থেকে আরও জানা যায়, একই এলাকায় নয়ন নামে আরেকজন প্রবাসী যুবক রয়েছেন।

ওই নয়নের মা সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, “নিহত নয়নের বাড়ি আর আমার বাড়ি একই হওয়াতে ভুলে নিহত নয়নের বাবার নামের পরিবর্তে আমার স্বামীর নাম চলে এসেছে, তবে কোন টাকা পয়সা আমরা পাইনি। কে বা কারা গুজব ছড়াচ্ছে যে নিহত নয়ন বেঁচে ফিরছে। যারা গুজব রটাইছে তাদের বিচার দাবি করছি।’’

টবগী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নেসারউদ্দিন বাহার মিয়া সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, নয়নের ফিরে আসার দাবিটি গুজব। তিনি নিজেই নয়নের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন।

এসব তথ্যের সূত্রে আরও খুঁজে ইউটিউবে ভোলাটিভি২৪ (bhola24.com) নামের একটি চ্যানেলে নয়নের ফিরে আসার দাবিটি নিয়ে একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটিতে নয়নের বাবা নুরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার রয়েছে।

নুরুল ইসলাম জানান, তাঁর ছেলের নাম মুহাম্মদ নয়ন। নয়ন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের একজন।

ভিডিওতে তাঁকে ভোলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি আমন্ত্রণপত্র দেখানো হয়। আমন্ত্রণপত্রটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত ও শহীদদের স্মরণে আয়োজিত একটি স্মরণ সভার। আমন্ত্রণপত্রে নয়নের বাবার নাম লেখা আনসার মিয়া ও মায়ের নাম লেখা রিজিয়া বেগম।

ভিডিওটি থেকেও জানা যায়, একই এলাকায় নয়ন নামে আরেকজন রয়েছে এবং তিনি প্রবাসী। এই নয়নের বাবার নাম আনসার মিয়া ও মায়ের নাম রিজিয়া। ভুল করে নিহত নয়নের বাবা-মায়ের জায়গায় প্রবাসী নয়নের  বাবা-মায়ের নাম চলে এসেছে।

বোরহানউদ্দীনের স্থানীয় সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম আকাশও নিশ্চিত করেছেন যে, শহীদ নয়ন ফিরে আসার দাবিটি গুজব। মূলত একই এলাকায় আরেকজন নয়ন থাকায় এই বিভ্রান্তি।

পরে দাবিটি সম্পর্কে বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ রায়হান-উজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্যাক্টওয়াচ।

তিনি ফ্যাক্টওয়াচকে জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নয়ন মারা গিয়েছেন এটি সত্য। সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই নয়নের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একই এলাকায় নয়ন নামে আরেকজন প্রবাসী রয়েছেন। শহীদ নয়নের বাবা-মায়ের স্থানে ভুলে প্রবাসী নয়নের নাম চলে আসে। পরে অবশ্য এ ভুল সংশোধনও করা হয়েছে।

সুতরাং এটি নিশ্চিত যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের বাসিন্দা নয়নের মারা যাওয়ার তথ্যটি সঠিক। একই এলাকায় ভিন্ন আরেক নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে শহীদ নয়নের নামে মিথ্যা প্রচার করা হচ্ছে।

শহীদ নয়ন ফিরে আসার দাবিতে ভাইরাল ছবিটি যাচাই

ফেসবুকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের বাসিন্দা নয়নের ফিরে আসার দাবিতে এক যুগলের ছবি প্রচার করা হচ্ছে।

তবে ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভাইরাল যুগলের ছবিটি শহীদ নয়নের নয়। এমন কি ছবিটি প্রবাসী নয়নেরও নয়।

ছবি দুটি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ফ্যাক্টওয়াচ বোরহান উদ্দিন উপজেলার স্থানীয় সাংবাদিক এইচ এ শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাঁকে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ছবি দুটি দেখানো হয়। তিনি ছবি দুটি দেখে নিশ্চিত করেন যে, এই ছবি শহীদ বা প্রবাসী নয়ন কারোরই নয়। তিনি ফ্যাক্টওয়াচের সঙ্গে শহীদ নয়ন ও প্রবাসী নয়ন দুজনের ছবিই শেয়ার করেন।

তাদের দুজনের সঙ্গে ভাইরাল যুগলের ছবির মিল নেই। তবে রিভার্স ইমেজ সার্চে যুগলটির ছবিটি সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সবদিক বিবেচনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের বাসিন্দা নয়নের ফিরে আসার দাবিটিকে মিথ্যা হিসেবে সাব্যস্ত করছে ফ্যাক্টওয়াচ।

ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে,এখানে, এখানেএখানে

No Factcheck schema data available.

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh