গেল সপ্তাহে গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচি ঘিরে ঘটা সহিংসতায় সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, জেলাটিতে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সহিংসতাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, এগুলো গোপালগঞ্জের সহিংসতা পরবর্তী ভিডিও। এসব ছবি, ভিডিওতে দেখা যায়, কোথাও মরদেহ দাফনের জন্য কবর খোড়া হচ্ছে, কোথাও হেলিকপ্টার থেকে জলাভূমিতে কিছু পড়ছে, এই ভিডিও দিয়ে দাবি করা হচ্ছে সেনাবাহিনী গোপালগঞ্জে মানুষ মেরে হেলিকপ্টার দিয়ে ফেলে দিচ্ছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন তরুণ কিছু নিথর দেহ সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আবার গোপালগঞ্জের দাবিতে ভাইরাল একটি ছবিতে দেখা যায়, হাসপাতালের স্ট্রেচারে তিনজন তরুণকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে ভিডিওগুলোর মধ্যে দুটি গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার। একটি ভিডিও পুরোনো ও অপ্রাসঙ্গিকভাবে গোপালগঞ্জের দাবিতে প্রচার হচ্ছে এবং ভাইরাল ছবিটিও জুলাই অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে নিহত তিন তরুণের।
ভিডিওটি থেকে কিছু কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চে মোল্লা রহমতুল্লাহ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এটি পাওয়া যায়।
ভিডিওটি গত ২৩ মার্চ অ্যাকাউন্টটিতে পোস্ট করা হয়। পোস্টটির ক্যাপশনে লেখা, ‘যখন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। #bangladesh2_0।’
ভিডিওতে কবর খোড়ার কাজে ব্যস্ত লোকদের কাউকে জিজ্ঞাসা করতে শোনা যায়, ‘মরদেহগুলো কোত্থেকে এসেছে? সোহরাওয়ার্দী?’
উত্তরে তারা জানান, এ বিষয়ে তারা জানেন না। মরদেহগুলো আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম নিয়ে আসছে এখানে।
পরবর্তীতে আরও খুঁজে জুলাই রেভ্যুলেশনারী অ্যালায়েন্স নামের একটি ফেসবুক পেজে একই ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটি গত ২৩ মার্চ পোস্ট করা হয়।
পোস্টটির ক্যাপশনে লেখা, ‘ভিডিও তে কথাগুলো শুনুন। ১৯ জুলাই ইন্টারনেটে বন্ধ করে হাসিনা চালিয়েছিলো স্বাধীন বাংলার সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সেই অপরাধ ঢাকতে লাশ দিয়েছিল গনকবর। একেক কবরে ৮জন ও শহীদ আছে। আক্ষেপের বিষয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এখনও ডিএনএ শনাক্তর মাধ্যমে পরিবার গুলোকে কবর বুঝিয়ে দিতে পারেনি।’
পোস্টটিতে এটি রায়ের বাজার বধ্যভূমির বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ গোপালগঞ্জের গণকবর দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি অন্তত আরও তিন মাস আগে থেকেই ইন্টারনেটে বিদ্যমান। ফেসবুকে প্রচারিত তথ্যানুযায়ী, এটি গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংগঠিত জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার।
এ ছাড়া সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে গত বছরের জুলাই-আগস্টে নিহত অনেকের মরদেহ বেওয়ারিশভাবে দাফনের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়।
ভিডিওটি থেকে কিছু কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চে ‘MDRiaz-j2b’ নামের একটি অ্যাকাউন্টে এটি পাওয়া যায়। ভিডিওটি গত ২ জুলাই চ্যানেলটিতে আপলোড করা হয়। এখানে ভিডিওটি সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে এটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, একটি উড়ন্ত সামরিক হেলিকপ্টার থেকে সৈন্য লাফিয়ে পানিতে পড়ছে এবং এদের। যার মাধ্যমে এটি আপাত সামরিক বাহিনীর কোনো প্রশিক্ষণের ভিডিও বলে প্রতীয়মান হয়।
পরবর্তীতে আরও খুঁজে টিকটকে ‘shohan_tgs0.2’ নামের একটি অ্যাকাউন্টে একই ভিডিও পাওয়া যায়। এখানে ভিডিওটি চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পোস্ট করা হয়। পোস্টের ক্যাপশন অনুযায়ী, এটি সামরিক বাহিনীর কমান্ডো ট্রেনিংয়ের ভিডিও।
ভিডিওটির প্রকৃত সময় ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা না গেলেও ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে এটি নিশ্চিত হওয়া যায়, গোপালগঞ্জের চলমান অস্থিরতার সঙ্গে এই ভিডিওর কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে এই দাবিটি মিথ্যা।
এ প্রতিবেদনটির ১ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের মাথায় দৃশ্যমান একটি ফুটেজের সঙ্গে গোপালগঞ্জের দাবিতে ভাইরাল ভিডিওটির মিল রয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনটি ছিল গত বছর জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে ৫ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে প্রাণহানির ঘটনা ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অডিও কল রেকর্ড সম্পর্কে।
অর্থাৎ গোপালগঞ্জের লাশের ভিডিও দাবিতে প্রচারিত ঘটনাটি রাজধানীর যাত্রাবাড়ির ২০২৪ সালের। তাই এ দাবিও মিথ্যা।
পোস্টের ক্যাপশন অনুযায়ী, স্ট্রেচারে পড়ে থাকা নিথর এই তিন তরুণ চট্টগ্রামে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলায় নিহত হন। ছবিটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তোলা।
সানবিডি২৪ নামে একটি নিউজ পোর্টালের ওয়েবসাইটে গত বছরের ১৬ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ছবিটি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, নিহত এই তিন তরুণ গত বছরের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের সময় নিহত হন।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময়ে ছবিটি ফেসবুকে প্রচার হতে দেখা যায়। এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে। যা নিশ্চিত করে ছবিটি গোপালগঞ্জের চলমান অস্থিরতার নয় এবং দাবিটি মিথ্যা।
সর্বোপরি, দাবি চারটিই যাচাইয়ে দেখা যায়, সবগুলোই পুরোনো ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে গোপালগঞ্জের ঘটনা দাবিতে প্রচার হচ্ছে। তাই ফ্যাক্টওয়াচ সবগুলো দাবিকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে।
Claim: ফেসবুকে বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, এগুলো গোপালগঞ্জের সহিংসতা পরবর্তী ভিডিও। এসব ছবি, ভিডিওতে দেখা যায়, কোথাও মরদেহ দাফনের জন্য কবর খোড়া হচ্ছে, কোথাও হেলিকপ্টার থেকে জলাভূমিতে কিছু পড়ছে, এই ভিডিও দিয়ে দাবি করা হচ্ছে সেনাবাহিনী গোপালগঞ্জে মানুষ মেরে হেলিকপ্টার দিয়ে ফেলে দিচ্ছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন তরুণ কিছু নিথর দেহ সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আবার গোপালগঞ্জের দাবিতে ভাইরাল একটি ছবিতে দেখা যায়, হাসপাতালের স্ট্রেচারে তিনজন তরুণকে শুইয়ে রাখা হয়েছে।
Claimed By: Facebook users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh