বরিশালে এক নবজাতক শিশুর চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন। শিশুটির মা ফেসবুকে এক টাকার লাল কয়েন বিক্রির একটি ভিডিও দেখতে পান। দেখানো হচ্ছে কিভাবে অনেকেই এই লাল কয়েন লাখ টাকায় বিক্রি করছেন। ভিডিওটি দেখে তিনিও তার কাছে থাকা পুরোনো এই কয়েন বিক্রির উদ্যোগ নেন। বিক্রির জন্য ভিডিওতে থাকা নাম্বারে যোগাযোগ করেন। এরপর কয়েনের বিনিময়ে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে তার থেকে অগ্রিম প্রায় ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এভাবেই একটি প্রতারক চক্রের কথা ফ্যাক্টওয়াচকে জানাচ্ছিলেন বরিশালের ভুক্তভোগী লাবনী বিশ্বাস।
মূলত বিভিন্ন সেলিব্রেটি ও মূলধারার গণমাধ্যমের পরিচয় নকল করে এসব কয়েন বিক্রির তথ্যটি দেওয়া হয়ে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব ভিডিও তৈরি করা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। পরবর্তীতে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করতে ফরম পূরণ বাবদ ৭০০ থেকে ২০০০ টাকা চাওয়া হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে টাকার পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি ও ঠিকানা নিতেও দেখা যায়। এভাবে ফরম পূরণের পর বিভিন্ন অজুহাতে যার থেকে যত সম্ভব অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। টাকা নেওয়া হয়ে গেলে একসময় যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এই পদ্ধতিতেই ১ টাকার লাল কয়েন ২ লাখ টাকায় বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে আগাম টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।
উপরোল্লিখিত কয়েকটি পেজে মূলধারার গণমাধ্যমের পরিচয় নকল করে প্রকাশিত কিছু ভিডিও পাওয়া যায়। এমন কিছু ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে।
ভিডিওটিগুলোতে আরটিভির লোগো ব্যবহার করে বলা হচ্ছে, ১ টাকার লাল কয়েন ২ লাখ টাকায় বিক্রি করছে কিছু লোক। প্রতিবেদক ‘R CASH PE’ নামের একটি ওয়েবসাইটের কথা বলেন। ভিডিওগুলোতে দুইজন ব্যক্তি দাবি করেন, তারা এই ওয়েবসাইটে ২০০০ টাকায় ফরম পূরণ করেছেন এবং ১ টাকার কয়েন ২ লাখ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছেন।
ভাইরাল এই ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধান করা হলে, আরটিভির ইউটিউব চ্যানেলে এমন একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রচারিত এই প্রতিবেদনটির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওটির মিল রয়েছে। আরটিভির মূল প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি প্রতারক চক্র প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নামে চক্রান্ত করে কোটি টাকার প্রলোভন দেখিয়ে লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, লাখ টাকার প্রলোভন দেখালেও কয়েনগুলোর মূল্য একশ টাকারও কম। পুলিশ জনগণকে এ ধরনের কয়েন প্রতারণা থেকে সাবধান থাকার আহ্বান জানায়।
দুইটি ভিডিওতেই সংবাদ পাঠিকার পোশাক ও চেহারা একই। পেছনের ছবি, টেবিলসহ বেশ মিল পাওয়া যায়। ভিডিও দুইটিতে মিল থাকলেও বেশ কিছু অসামঞ্জস্যতাও চোখে পড়ে। যেমন,বক্তব্যরত ব্যক্তিদের মুখ ও ঠোঁটের অংশে অস্পষ্টতা, একই ব্যক্তির কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হওয়া, আরটিভির ভিডিওর দৃশ্য মিল রেখে মূল বক্তব্যের ভিন্নতা ইত্যাদি। এসব সাধারণত এআই দিয়ে তৈরি বা এডিট করা ভিডিওর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তাই পরবর্তীতে ভিডিওটি ডিপফেক শনাক্তকারী টুল ‘Deepfake-o-meter’ এর ‘AVSRDD (2025)’ মডেল ব্যবহার করে যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি প্রায় শতভাগ এআই জেনারেটেড।
একই প্রচারণায় যমুনা টিভির নামেও কিছু ভিডিও পাওয়া যায়। এমন কিছু ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে। মূলত, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির মৃত্যু নিয়ে প্রচারিত যমুনা টিভির একটি প্রতিবেদন এআই দিয়ে এডিট করে এগুলো তৈরি করা হয়েছে। SynthID টুলের বিশ্লেষণে ভিডিওটিগুলোতে এআই-নির্মিত ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে। একইভাবে DBC টিভির নামেও কিছু ভিডিও পাওয়া যায়। দেখুন এখনে, এখানে, এখানে।
গণমাধ্যমের পরিচয় নকলের পাশপাশি অভিনেতা জিয়াউল হক পলাশের নামেও একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। এমন কিছু ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে, এখানে।
সত্যতা অনুসন্ধানে জিয়াউল হক পলাশের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। এটি গত ৭ জানুয়ারি পোস্ট করা হয়েছিল। দুইটি ভিডিওতে থাকা তার পোশাক, টুপি ও পেছনের নীল দেয়ালের মধ্যে মিল রয়েছে। তবে মূল ভিডিওতে পলাশ একটি সেলুনের প্রচারণা নিয়ে কথা বলেছেন, কয়েন বিক্রি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। SynthID টুল দাবিকৃত ভিডিওটিকে এআই-নির্মিত বলে শনাক্ত করে।
একই পদ্ধতিতে আততায়ীর গুলিতে নিহত ওসমান হাদি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান এম. নাজমুল ইসলাম, টেক ইউটিউবার স্যামসহ কয়েকজন সেলিব্রিটির ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে একই দাবিতে এআই ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। দেখুন এখনে, এখানে, এখানে।
ছবিগুলোতে দেখা যায়, লোকজন দোকানে লাল কয়েন বিক্রি করছেন। তবে ছবিগুলোতে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। ফলে এগুলো বিভিন্ন এআই টুল দিয়ে যাচাই করে এআই জেনারেটেড বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
এ ছাড়া ভুয়া ভিডিও ব্যবহার করেও কয়েন প্রতারণা করা হচ্ছে। কিছু ভিডিওতে ডিজিটাল মাল্টিমিটার, যা সাধারণত বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হয়, তা দিয়ে কয়েন পরীক্ষা করা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, কয়েন যাচাই করে বেচাকেনার প্রক্রিয়া চলছে। এমন ভিডিওগুলো Trader Rahat Coin BD পেজ থেকে প্রচারিত হচ্ছে।
পুরো অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘রিশাত’ বা ‘Riasat Ki Ng’ নামে একজন ব্যক্তির নাম, ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। বিভিন্ন ভিডিওতে তাকে লাল কয়েন ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচারণা করতে দেখা যায়। রিশাতের এমন ভিডিও পাওয়া যায় এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে
রিশাত তার “Trader Rishat King” নামের ফেসবুক পেজ থেকে একটি ভিডিওতে দাবি করেন, তিনি আগেই বলেছেন লাল কয়েনের বিষয়টি ভুয়া এবং তার ভিডিও ব্যবহার করে প্রতারণা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে তিনি তার নিজের তৈরি লাল কয়েন সংক্রান্ত ভিডিওগুলোও ভুয়া বলে দাবি করে পোস্ট করেন এবং সতর্ক করেন, কেউ তার নামে টাকা চাইলে আইনের সহায়তা নিতে।
অনুসন্ধানে ১ টাকার লাল কয়েন ২ লাখ টাকায় কেনাবেচার পিছনে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও প্রতারণার অংশ। প্রতারক চক্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম ও সেলিব্রিটির পরিচয় বিকৃত করে মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে। এরপর বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ফরম পূরণের অজুহাতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। বাস্তবে বাংলাদেশে প্রচলিত ১ টাকার লাল কয়েনের কোনো অতিরিক্ত বাজারমূল্য নেই; এটি শুধুমাত্র এক টাকার বৈধ মুদ্রা।
তাই এ ধরনের প্রতারণামূলক ভিডিও, ছবি ও বিজ্ঞাপনকে ‘মিথ্যা’ বলে চিহ্নিত করছে ফ্যাক্টওয়াচ।
Claim: বরিশালে এক নবজাতক শিশুর চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন। শিশুটির মা ফেসবুকে এক টাকার লাল কয়েন বিক্রির একটি ভিডিও দেখতে পান। দেখানো হচ্ছে কিভাবে অনেকেই এই লাল কয়েন লাখ টাকায় বিক্রি করছেন। ভিডিওটি দেখে তিনিও তার কাছে থাকা পুরোনো এই কয়েন বিক্রির উদ্যোগ নেন। বিক্রির জন্য ভিডিওতে থাকা নাম্বারে যোগাযোগ করেন। এরপর কয়েনের বিনিময়ে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে তার থেকে অগ্রিম প্রায় ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এভাবেই একটি প্রতারক চক্রের কথা ফ্যাক্টওয়াচকে জানাচ্ছিলেন বরিশালের ভুক্তভোগী লাবনী বিশ্বাস।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh