বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আগামী নভেম্বর মাস থেকে ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এই পটভূমিতে স্থানীয়ভাবে কোনো কোনো নেতাকর্মী-সমর্থকেরা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে অনলাইনে এবং অফলাইনে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। প্রচারণার অংশ হিসেবে, পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার বড়মাছুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, নাসির হোসেন হাওলাদারের পক্ষে বেশ কিছু ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে । এসব ফটোকার্ডে বিভিন্ন গণমাধ্যম যেমন আরটিভি, সময় টিভি, বিটিভি ইত্যাদির নাম এবং লোগো ব্যবহার করে নাসির হোসেন হাওলাদারের পক্ষে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তবে উক্ত গণমাধ্যম মারফত জানা যাচ্ছে, ফটোকার্ডগুলো এসব গণমাধ্যম থেকে প্রকাশ করা হয়নি। এগুলো এডিটেড ফটোকার্ড।
মূলত, পিরোজপুরের বড়মাছুয়া ইউনিয়ন কেন্দ্রিক কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকেই এসব কার্ড ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। যেমন- বড় মাছুয়া ইউনিয়ন নামক আইডি থেকেই এই ধরনের ৩ টি ফটোকার্ড দেখা যাচ্ছে। আরটিভির লোগোযুক্ত এই কার্ডে বলা হচ্ছে- ‘তৃতীয়বারের মতো চেয়ারম্যান পদে আলোচনার শীর্ষে নাসির হোসেন হাওলাদার।’
ভিন্ন আইডি থেকে প্রচারিত এই একই ফটোকার্ডযুক্ত কয়েকটি পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে,এখানে।
প্রিয় শহর নামক একটি আইডি থেকে গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে আরটিভির আদলে সাজানো কয়েকটি ফটোকার্ড প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। এসব ফটোকার্ডের শিরোনাম ‘নিরাপদ ও শান্তিতে বসবাসের জন্য নাসির হোসেন হাওলাদারকে তৃতীয়বারের মতো চেয়ারম্যান পদে দেখতে চায় এলাকাবাসী’।
এই একই শিরোনামে ৩ টি ভিন্ন ছবি যুক্ত করে আরটিভির আদলে ৩ টি ফটোকার্ড প্রচার করা হচ্ছে। (দেখুন এখানে,এখানে,এখানে)
অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে এই ‘প্রিয় শহর’ আইডি থেকে কমপক্ষে ২৩ টি স্থানে (প্রোফাইল বা গ্রুপ) এই ফটোকার্ডগুলো পোস্ট করা হয়েছে। যেমন দেখতে পাবেনএখানে,এখানে,এখানে,এখানে,এখানে,এখানে।
বড় মাছুয়া ইউনিয়ন -আইডি থেকেও এই কার্ডটি প্রচার করতে দেখা গিয়েছে।
সময় টিভির লোগোযুক্ত এই ফটোকার্ডে নাসির হোসেন হাওলাদারের ছবি যুক্ত করে শিরোনাম দেওয়া হয়েছে – ‘’৩য় বারের মতন চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চায়। বড় মাছুয়া ইউনিয়নের জনগণ’’(বানান ও বিরাম চিহ্ন অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)।
বড় মাছুয়া ইউনিয়ন নামক আইডি থেকে এই ফটোকার্ডটি কমপক্ষে ১৭টি ভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করা হয়েছে (যেমন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে)। এছাড়া ভোট ফর নাসির, এমডি কাওসার সহ আরও কয়েকটি প্রোফাইলকেও এই কার্ডটি প্রচার করতে দেখা গিয়েছে।
কয়েকটি ফটোকার্ডে বিটিভির লোগোও দেখা যাচ্ছে। যেমন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে। এসব ফটোকার্ডের শিরোনাম- ‘’৩য় বারের মতো চেয়ারম্যান পদে আলোচনার শীর্ষে নাসির হোসেন হাওলাদার’’।
কয়েকটি ফটোকার্ডের উপরের অংশে বিটিভির লোগো এবং নিচে আরটিভির ওয়েবলিংক দেখা যাচ্ছে। এমন কয়েকটি কার্ড দেখতে পাবেন এখানে, এখানে, এখানে । ‘বড় মাছুয়া ইউনিয়ন’ নামক প্রোফাইল থেকে কমপক্ষে ১১টি পাবলিক গ্রুপে এই একই ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছে। (যেমন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে,এখানে)
জনাব নাসির হোসেন হাওলাদারকে তার নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকেও এই ফটোকার্ডগুলো পোস্ট বা শেয়ার করতে দেখা গিয়েছে।
আরটিভি ইতিমধ্যে তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে পৃথক পোস্টের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে, এই ফটোকার্ডগুলো তাদের তৈরি নয় (দেখুন এখানে, এখানে)।
আরটিভির অন্যান্য ফটোকার্ডগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তারিখের উপস্থিতি, সংক্ষিপ্ত শিরোনাম, ফন্ট ইত্যাদি দিক দিয়ে এই ফটোকার্ডটি সম্পূর্ণ আলাদা।
সময় টিভি থেকে তাদের লোগোযুক্ত আলোচ্য ফটোকার্ডের বিষয়ে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো বিবৃতি আসেনি। তবে সময় টিভির অন্যান্য ফটোকার্ডের সাথে এই কার্ডের অমিল লক্ষণীয়। বাক্যের ভিতরে পূর্ণচ্ছেদ বা দাঁড়ির (।) ব্যবহার কোনো পেশাদার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়। তাদের ভেরিফায়েড পেজেও ৮ সেপ্টেম্বর তারিখে এই কার্ড দেখা যাচ্ছে না।
একই কথা প্রযোজ্য বাংলাদেশ টেলিভিশন-বিটিভির ক্ষেত্রেও। তাদের প্রচারিত ফটোকার্ডগুলোর সাথে আলোচ্য ফটোকার্ডের আঙ্গিক, ফন্ট, তারিখ ও ছবির ব্যবহারে কোনো মিল নেই। তাদের ভেরিফায়েড পেজেও এই ধরনের কোনো পোস্ট দেখা যাচ্ছে না।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিটিভি এবং সময় টিভির পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি না এলেও, আঙ্গিক তুলনা করে নিঃসন্দেহে বলা যায়, এগুলো ভুয়া ফটোকার্ড।
বড়মাছুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ওয়েবসাইট থেকে জানা যাচ্ছে, এখানে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই, বরং জনাব তরিকুল ইসলাম প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পালিয়ে যান। ফলে অনেক উপজেলায় স্বাভাবিক দাপ্তরিক ও সেবামূলক কাজে ব্যাঘাত ঘটছিল। এই পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত একটি পরিপত্রের মাধ্যমে উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে প্যানেল চেয়ারম্যান বা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তাকে ‘প্রশাসক’ হিসেবে নিয়োগ দান শুরু হয়।
২০১৬ এবং ২০২২ সালে সর্বশেষ ২টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি মঠবাড়িয়ার বড়মাছুয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, ১১ নং বড়মাছুয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী নাসির হোসেন হাওলাদার চশমা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। (দেখুন এখানে,এখানে)
নির্বাচন কমিশন ২০২৬ এর নভেম্বর এবং ২০২৭ এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায়। এই নির্বাচন উপলক্ষেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনেকে আগাম ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন।
সুতরাং, সঙ্গত কারণেই ফ্যাক্টওয়াচ এসব ফেসবুক পোস্টগুলোকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে।
Claim: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আগামী নভেম্বর মাস থেকে ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এই পটভূমিতে স্থানীয়ভাবে কোনো কোনো নেতাকর্মী-সমর্থকেরা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে অনলাইনে এবং অফলাইনে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। প্রচারণার অংশ হিসেবে, পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার বড়মাছুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, নাসির হোসেন হাওলাদারের পক্ষে বেশ কিছু ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে । এসব ফটোকার্ডে বিভিন্ন গণমাধ্যম যেমন আরটিভি, সময় টিভি, বিটিভি ইত্যাদির নাম এবং লোগো ব্যবহার করে নাসির হোসেন হাওলাদারের পক্ষে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh