জেসিকা র্যাডক্লিফ নামের একজন সামুদ্রিক প্রাণী প্রশিক্ষককে একটি পোষা ডলফিন আক্রমণ করে মেরে ফেলেছে- এমন দাবিতে কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো কোনো পোস্টে ডলফিনের বদলে ওর্কা বা কিলার হোয়েলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যমে জেসিকা র্যাডক্লিফ নামক কোনো জীবিত বা মৃত প্রাণী প্রশিক্ষককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তদুপরি, যেসকল ছবি বা ভিডিও দিয়ে জেসিকার মৃত্যু সংবাদ দেওয়া হয়েছে, সেসব বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই) ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সঙ্গত কারনে এ সকল পোস্টকে ফ্যাক্টওয়াচ ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।
“জেসিকা ছিলেন একজন অভিজ্ঞ সামুদ্রিক প্রাণী প্রশিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল সমুদ্রের প্রাণীদের সঙ্গে কাজ করা ও তাদের ভালোবাসা দেওয়া। সে এক অরকা বাচ্চাকে লালন-পালন শুরু করেন, যার নাম কাইরো। কাইরো তার ডাক শুনলে পানি থেকে উঠে আসত এবং শো-তে সবাইকে মুগ্ধ করত। কিন্তু ২০২৫ সালের একদিন, শো’র আগে কাইরোর আচরণ হঠাৎ বদলে যায়। সে ঘুরে বেড়াতে থাকে, নিজের নিয়ম ভাঙে এবং হঠাৎ জেসিকার ওপর হা’ম’’লা করে। জেসিকা গু’রু’তর আ’’হ’ত হন, আর প্রশিক্ষকরা তাকে রক্ষা করতে পারেননি। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, বন্য প্রাণী যতই প্রশিক্ষিত হোক না কেন, তাদের প্রকৃত স্বভাব পুরোপুরি বদলায় না।”
‘পুরান চাউল’ নামক এই পেজ থেকে শেয়ার করা পোস্টে বলা হয়েছে, “জেসিকা একটি অরকার বাচ্চাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ প্রাণী ভেবেই লালন-পালন করেছিল এবং তাকে নানা রকম কৌশল শিখিয়েছিল। কিন্তু একদিন সবকিছু পাল্টে যায়। প্রতিদিনের মতোই জেসিকা যখন জলের ট্যাঙ্কে নামে, অরকাটির আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। শান্ত থাকার বদলে সে হঠাৎই জেসিকার ওপর হিংস্রভাবে আক্রমণ করে। নিমেষেই ট্যাঙ্কের জল রক্তে লাল হয়ে গেল আর মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু শেষ।”
অনুসন্ধান
বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে অনুসন্ধান চালিয়েও মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যম থেকে সাম্প্রতিক সময়ে জেসিকা নামক কোনো সামুদ্রিক প্রাণী প্রশিক্ষকের দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর খবর পাওয়া গেল না।
তবে ফেসবুক বা ইউটিউবের মত সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খবরটা ব্যাপক আকারে ভাইরাল হতে দেখা গিয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি ২০২৫ এ ‘FactEx’ নামক ইউটিউব চ্যানেলে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও দেখা যায়। সম্ভবত এটাই জেসিকা সংক্রান্ত গুজবের মূল উৎস। এই ভিডিও থেকে জানা যাচ্ছে, জেসিকা sealland নামক একটি পার্কে এই কসরত দেখাতেন।
তবে কোনো সার্চ ইঞ্জিনেই এমন কোনো ওয়াটার পার্ক খুঁজে পাওয়া গেলনা।
‘Animal Quests’ নামক আরেকটি চ্যানেলে ১১ এপ্রিল ২০২৫ এ তারিখে আপলোড করা আরেকটি ভিডিও থেকেও জেসিকার মৃত্যুর খবরটি জানা যায়। এই ভিডিওর ডেসক্রিপশনের প্রথম লাইনে বলা হয়েছিল, ‘Last Moments of Orca Trainer Jessica Radcliffe | True Animal Attack Documentary’ (ওর্কা ট্রেইনার জেসিকার জীবনের শেষ মুহুর্তগুলি। প্রাণী আক্রমণের সত্য তথ্যচিত্র)
তবে ডেসক্রিপশনে এক প্যারাগ্রাফ পরেই বলা হয়েছে, ‘Jessica Radcliffe — a fictional trainer based on real-world events’ (জেসিকা র্যাডক্লিফ হল একটি কাল্পনিক চরিত্র, যাকে বাস্তব একটি ঘটনার ভিত্তিতে বানানো হয়েছে)
এসব ভিডিও থেকে বিভিন্ন খন্ডাংশ ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই) সনাক্ত করতে গিয়ে দেখা গেল, অনেক জায়গায়ই এ আই এর সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে।
গত জানুয়ারি থেকে অনলাইনে এই দাবিটা থাকলেও সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে জেসিকার মৃত্যুর গুজবটা ভাইরাল হয়েছে, যদিও বাস্তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
দেশ বিদেশের বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা এবং গণমাধ্যম এই ট্রেন্ডিং বিষয়টা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এমন কিছু প্রতিবেদন দেখুন এখানে- স্নোপস, এনডিটিভি, টাইমস অফ ইন্ডিয়া , রিউমর স্ক্যানার, যায়যায়দিন ইত্যাদি। তারা সবাই জানাচ্ছে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং সম্পূর্ন বিষয়টি গুজব।
সার্বিক বিবেচনায় ফ্যাক্টওয়াচ এ সকল পোস্টকে ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।
ডলফিন বা ওর্কা কি মানুষের জন্য নিরাপদ?
উভয় প্রাণীই মাংশাসী। মূলত সাগরের ছোট বা মাঝারি প্রজাতির মাছই তাদের প্রধান খাদ্য। ওর্কা কখনো কখনো বড় প্রাণীও আক্রমণ করে, তবে ডলফিন বেশ নিরীহ প্রাণী। ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের সমুদ্র উপকূলে টিয়াও নামের একটি ডলফিন পর্যটকদের ক্রমাগত খেপানোয় বিরক্ত হয়ে আক্রমণ করে, এবং একজন পর্যটক নিহত হয়। জানামতে ডলফিনের হামলায় নিহতের এটাই একমাত্র ঘটনা।
সেই তুলনায় ওর্কার আক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ১৯৯০ সালের পর থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪ জন মানুষ ওর্কার আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে।এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ‘টিলিকাম’ (Tilicum) নামের ওর্কাটি, যার আক্রমণে একে একে ৩ জন নিহত হয়েছেন। ১৯৯১ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি এই ওর্কাটি কানাডার সিল্যান্ড নামক ওয়াটার পার্কে তার ট্রেইনার, কেল্টি বায়ার্ন কে আক্রমন ও হত্যা করে।১৯৯৯ সালের ৬ জুলাই তার আক্রমণে ড্যানিয়েল ডিউক নামের আরেক ট্রেইনার মারা যায়।এবার ঘটনাস্থল ছিল অরলান্ডো, ফ্লোরিডা। ২০১০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ওই একই জায়গায় সি-ওয়ার্ল্ড অরল্যান্ডোর ৪০ বছর বয়সী সিনিয়র প্রশিক্ষক ডন ব্রানশো ‘টিলিকাম’ এর আক্রমণে নিহত হন। এছাড়া এলেক্সি মার্টিনেজ , যিনি ২০০৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর কেটো (Keto) নামের একটি ওর্কার আক্রমণে ক্যানারি দ্বীপের একটি ওয়াটার পার্কে মৃত্যবরণ করেছেন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন কোনো আক্রমণের নজির নেই।
Claim: জেসিকা র্যাডক্লিফ নামের একজন সামুদ্রিক প্রাণী প্রশিক্ষককে একটি পোষা ডলফিন আক্রমণ করে মেরে ফেলেছে- এমন দাবিতে কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো কোনো পোস্টে ডলফিনের বদলে ওর্কা বা কিলার হোয়েলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh