শের বাহাদুর দেউবা ছাত্র আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন 

42
শের বাহাদুর দেউবা ছাত্র আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন 
শের বাহাদুর দেউবা ছাত্র আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন 

সম্প্রতি নেপালে ফিরেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী  শের বাহাদুর দেউবা। তার এই দেশে ফেরা নিয়ে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম এবং ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, পেজ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তিনি নেপালের জেন জি আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, দাবিটি সঠিক নয়। নেপালের জেন জি আন্দোলনের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কেপি শর্মা ওলি। শের বাহাদুর সবশেষ নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন ২০২২ সালে। তার প্রধানমন্ত্রীত্বের অবসানও কোনো ছাত্র আন্দোলনে হয়নি। তবে জেনজি আন্দোলনের সময় তিনি ও তার স্ত্রী সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে। 

শের বাহাদুর সবশেষ নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন ২০২২ সালে

ফেসবুকে প্রচারিত দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে শের বাহাদুর দেউবার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ সূত্রে তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট পাওয়া যায়। এখান থেকে জানা যায়, শের বাহাদুর দেউবা পাঁচবার নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এই পাঁচবার হলো, ১৯৯৫–১৯৯৭, ২০০১–২০০২, ২০০৪–২০০৫, ২০১৭–২০১৮ এবং ২০২১–২০২২ সালে।

নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমুন্ডু পোস্টের ২০২২ সালের ২৬ ডিসেম্বরের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই সময় পুষ্প কমল দাহাল কাঠমান্ডুর মহারাজগঞ্জে রাষ্ট্রপতির বাসভবন শীতল নিবাসে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারি দাহালকে প্রধানমন্ত্রীর শপথ পাঠ করান।

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দাহালের পূর্বসূরি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শের বাহাদুর দেউবা।

এই প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটিই দেউবার শেষবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময়।

কাঠমুন্ডু পোস্টের একই বছরের ২৫ ডিসেম্বরের একটি প্রতিবেদনেও দেউবাকে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

দেউবার প্রধানমন্ত্রীত্ব কোনো ছাত্র আন্দোলনের কারণে যায়নি

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে শের বাহাদুর দেউবাকে ছাত্র আন্দোলন বা জেনজি আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত দাবি করা হয়েছে। 

কিন্তু তার প্রধানমন্ত্রীত্বের অবসান সম্পর্কে খোঁজ নিলে দ্য কাঠমুন্ডু পোস্টের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।  

জানা যায়, ২০২২ সালে দেশটিতে নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য জোটের শরিকদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন—এ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। এই বিরোধে নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ভেঙে পুষ্প কমল দাহাল ইউএমএল-এর (CPN-UML) সঙ্গে হাত মেলান। এর কারণ ছিল, কংগ্রেস সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা পাঁচ বছরের মেয়াদের প্রথমার্ধে দাহালকে প্রধানমন্ত্রী হতে দিতে অস্বীকৃতি জানান।

ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যম লা মুন্ডের ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বরের প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেউবা ১৯৯৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচবার নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তিনি নেপালি কংগ্রেসের একজন প্রবীণ নেতা। নেপালের জেন-জি আন্দোলনের সময় তিনি কোনো মন্ত্রিত্বের দায়িত্বে ছিলেন না; তখন তিনি সংসদ সদস্য (এমপি) এবং দলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে আন্দোলনের সময়  তিনি ও তার স্ত্রী সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন।

একই তথ্য জানা যায় দ্য হিন্দুর একটি প্রতিবেদন থেকেও। দেউবার ওয়েবসাইটেও একই তথ্য পাওয়া যায়। 

অর্থাৎ নেপালের জেন জি আন্দোলনের সময় শের বাহাদুর দেউবা দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তিনি সবশেষ নেপালের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ২০২২ সালে। তার প্রধানমন্ত্রীত্বের অবসান ঘটে নির্বাচনের মাধ্যমে।

নেপালের জেন জি আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কেপি শর্মা ওলি 

বিবিসি নিউজের ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নেপালে জেন জি আন্দোলন চলাকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কেপি শর্মা ওলি। তিনি আন্দোলনের মুখে ওই সময় পদত্যাগ করেছিলেন। 

একই তথ্য জানা যায় নেপালের সংবাদমাধ্যম সূত্রেও। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ছাড়ার পরও ওলি নেপালেই অবস্থান করছিলেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের গত মার্চের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নেপালে জেন জি আন্দোলনের পর গঠিত বালেন্দ্র শাহের সরকারের ক্ষমতা নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে  কে পি শর্মা ওলিকে কাঠমুন্ডুর তার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিজ বাসভবন থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। একই সঙ্গে তার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়। 

তবে সম্প্রতি কে পি শর্মা ওলিকে জামিন দিয়েছে দেশটির আদালত। নেপালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত ৯ এপ্রিল তিনি জামিনে মুক্তি পান। 

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, সম্প্রতি নেপালে ফেরা দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা জেনজি আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হননি। ওই সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কেপি শর্মা ওলি। তাই ফ্যাক্টওয়াচ ফেসবুকে প্রচারিত দাবিগুলোকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে। 

Claim:
সম্প্রতি নেপালে ফিরেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী  শের বাহাদুর দেউবা। তার এই দেশে ফেরা নিয়ে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম এবং ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, পেজ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তিনি নেপালের জেন জি আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh