সান্ডা হল একটি চতুস্পদ প্রাণী, যা মেরুদন্ডী এবং সরীসৃপ শ্রেণীভুক্ত। ইংরেজিতে প্রাণিটি Uromastyx বা Spiny-tailed Lizard নামে পরিচিত। আকারে ২৫ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আমাদের দেশে এই সরীসৃপটি খুব একটা দেখা যায় না। মূলত আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতীয় উপমহাদেশের শুষ্ক এলাকায় এদের বসবাস।
সান্ডা কি কেবলমাত্র বাতাস খেয়ে বেঁচে থাকে?
অনেকের এমনই ধারনা রয়েছে। এমনকি ফেসবুকের কিছু সাধারনজ্ঞান ভিত্তিক পেজে এই তথ্যটাই জানানো হচ্ছে। (যেমন দেখুন এখানে,এখানে,এখানে,এখানে)।
তবে এই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। প্রতিটি প্রাণিকেই বেঁচে থাকার জন্য এমন জৈব যৌগ গ্রহণ করতে হয়, যা শরীরের কোষে গিয়ে ক্যালরি (শক্তি) তৈরি করে। বাতাসের মধ্যে যেহেতু এমন শক্তি তৈরির মত উপাদান নেই, তাই বাতাস খেয়ে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না।
সান্ডারা মূলত তৃণভোজী প্রাণী। ঘাস, সবজি এবং ফলমূলই তাদের খাদ্য। অপ্রাপ্তবয়স্ক সান্ডাদের মাঝে মাঝে ছোট পোকামাকড়ও খেতে দেখা যায়।
সান্ডাদের তৃণজাতীয় খাবার খাওয়ার কয়েকটি ভিডিও দেখতে পাবেন এখানে এবং এখানে।
সান্ডা এবং গুইসাপ কি এক?
উভয় প্রাণীই সরীসৃপ শ্রেণীভুক্ত। তবে আলাদা গণের অন্তর্ভুক্ত । সান্ডার বৈজ্ঞানিক নাম Uromastyx। এটি Agamidae পরিবারভুক্ত এবং Uromastycinae উপপরিবারের অন্তর্গত। সান্ডা শ্রেণিগতভাবে Reptilia বা সরীসৃপ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এবং Squamata বর্গের অধীনস্থ। Uromastyx গণের অধীনে প্রায় ১৮টি স্বীকৃত প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো আকার, রং ও আবাসস্থলের ভিন্নতার ভিত্তিতে আলাদা করা হয়।
যেমন, সৌদি আরবের সবচেয়ে সুলভ সান্ডার প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম – Uromastyx aegyptia । এদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পুরু ও কাঁটাযুক্ত লেজ, যা আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়। ইংরেজিতে একে Spiny-tailed Lizard বলা হয়। এর পুরো শ্রেণীবিন্যাস নিম্নরূপ-
Phylum (পর্ব) : Chordata
Class (শ্রেণী) : Reptilia
Order (বর্গ): Squamata
Suborder (উপবর্গ) : Iguania
Family (পরিবার) : Agamidae
Subfamily (উপপ্রিবার) : Uromasticinae
Genus (গণ) : Uromastyx
Species (প্রজাতি) : Uromastyx aegyptia
অন্যদিকে গুইসাপের বৈজ্ঞানিক নাম Varanus salvator, যা Varanidae পরিবারভুক্ত একটি বৃহৎ সরীসৃপ প্রজাতি। এটি Varanus গণের অন্তর্গত এবং শ্রেণিগতভাবে Reptilia (সরীসৃপ), বর্গ Squamata ও উপবর্গ Anguimorpha-এর অন্তর্ভুক্ত। Varanus গণের কমপক্ষে ৮০টি প্রজাতি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে।
বাংলাদেশে যে প্রজাতির গুইসাপ সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া যায়, তার বৈজ্ঞানিক নাম Varanus bengalensis। এর সম্পূর্ণ শ্রেণীবিন্যাস নিম্নরূপ-
Phylum (পর্ব): Chordata
Class (শ্রেণী) : Reptilia
Order(বর্গ) : Squamata
Family(পরিবার) : Varanidae
Genus(গণ) : Varanus
(প্রজাতি): Varanus bengalensis
অর্থাৎ, সান্ডা এবং গুইসাপ- এই দুইটি প্রাণী একই শ্রেণি (Reptilia) এবং বর্গ (Squamata)-র অন্তর্ভুক্ত হলেও পরিবার ও গণের পার্থক্য রয়েছে।
এ ছাড়া এদের আচার আচরণেও পার্থক্য রয়েছে। সান্ডা (Uromastyx) মূলত শুষ্ক, পাথুরে ও মরুভূমি অঞ্চলের প্রাণী, যেখানে গুইসাপ (Varanus) বাস করে জলাভূমি, নদীপাড় এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে। সান্ডা প্রধানত নিরীহ প্রকৃতির ও শাকাহারী, যার খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন গাছপালা ও শাকসবজি থাকে।
অন্যদিকে, গুইসাপ একটি মাংসাশী ও সর্বভুক প্রাণী, যা মাছ, ব্যাঙ, ইঁদুর থেকে শুরু করে মৃতদেহ পর্যন্ত খেতে সক্ষম। আকারের দিক থেকে গুইসাপ সান্ডার তুলনায় অনেক বড় ও ওজনদার; গুইসাপের দৈর্ঘ্য যেখানে ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে সান্ডার দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৫ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার হয়।
শারীরিক গঠনে দুই প্রাণীই ভিন্ন বৈশিষ্ট্য বহন করে—সান্ডার লেজ কাঁটাযুক্ত এবং প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হলেও গুইসাপের লেজ চ্যাপ্টা ও শক্তিশালী, যা সাঁতারে সহায়তা করে। আচরণগত দিক থেকেও তারা বিপরীত—সান্ডা দিনে চলাচল করে ও স্থলচর এবং গর্তে বাস করে, অন্যদিকে গুইসাপ পানিতে ও গাছে চলাফেরা করতে সক্ষম এবং প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক হতে পারে। প্রজননের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে; সান্ডা বছরে একবার ডিম পাড়ে এবং উদ্ভিদ হজমে সহায়ক ব্যাকটেরিয়া বংশানুক্রমে অর্জন করে, আর গুইসাপ একবারে অনেক ডিম পাড়ে এবং বাচ্চারা জন্মের পরপরই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে।
সান্ডা কিংবা গুইসাপের মাংস কি খাবার যোগ্য ? এগুলো খেলে কি স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা আছে ?
বিশ্বের অনেক জনপদেই সরীসৃপ ভক্ষণ করা হয়। সান্ডা কিংবা গুইসাপও খাওয়া হয়। সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সান্ডা বেশ জনপ্রিয় খাদ্য। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে ইগুয়ানা নামক অন্য আরেক প্রজাতির সরীসৃপ বেশ জনপ্রিয় খাবার। আবার মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গুইসাপ ও খাওয়া হয়।
বাংলাদেশের বান্দরবনে কয়েকটি রেস্টুরেন্টে গুইসাপের মাংস পরিবেশনের ভ্লগ অনলাইনে দেখা যাচ্ছে। সাধারনভাবে গুই সাপের মাংসের স্বাদকে মুরগির মাংসের সাথে, এবং সান্ডার মাংসকে সুস্বাদু মাছের সাথে তুলনা করা হয়। আরব নিউজে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে সান্ডাকে (আরবি -দব) মরুভূমির মাছ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইন্দোনেশিয়ার Sunan Kalijaga State Islamic University Yogyakarta থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষনাপত্রে সান্ডাকে হালাল (খাবার যোগ্য) এবং গুইসাপ কে হারাম (খাবার অযোগ্য) হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
সান্ডা ভেবে গুইসাপ খেয়ে যুবক অসুস্থ – এমন শিরোনামযুক্ত কিছু খবর এবং ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। এমন কিছু পোস্ট দেখতে পাবেন এখানে,এখানে,এখানে,এখানে,এখানে , এখানে ,এখানে ,এখানে ,এখানে ,এখানে ।
স্পষ্টত, স্যাটায়ার হিসেবে এসব ফটোকার্ড তৈরি করা হলেও, কোনো কোনো ফেসবুক ব্যবহারকারী একে সিরিয়াস ভেবে কমেন্টে নানা প্রশ্ন করছেন।
আবার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্বদের ছবি ব্যবহার করেও এই সান্ডা ইস্যুতে আক্রমণ করা হচ্ছে।
তথ্যগত বিভ্রান্তির দিকে তাকালে, এখানে কমপক্ষে দুইটি ভুল তথ্য রয়েছে।
প্রথমত, গুইসাপ পুকুরে বাস করেনা, বরং মাটির গর্তে বা শুষ্ক পাথুরে জায়গায় বাস করে। তবে এদের পানিতে সাতার কাটার সক্ষমতাও রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, গুইসাপের মাংস কোনো বিষাক্ত খাবার নয়। বাংলাদেশের বান্দরবন সহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশে স্থানীয় বাসিন্দারা গুইসাপ রান্না করে খাওয়া হয়। বানিজ্যিকভাবে সেখানকার স্থানীয় রেস্টুরেন্টগুলোতেও গুইসাপের মাংস বিক্রি হয়। এই মাংস খাওয়ার ফলে স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা হয় না।
সর্বোপরি, এখানে যমুনা টিভি ও প্রথম আলোর লোগোযুক্ত ফটোকার্ড এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু উক্ত দুই সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে এমন কোনো ফটোকার্ড দেখা যায়নি।
সান্ডার তেল এর কি যৌনশক্তিবর্ধক কোনো ক্ষমতা আছে?
না , এমন ক্ষমতার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে এই প্রাণীর চর্বি কিংবা শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গ সেবন করেন। এসবের কোনো কার্যকারিতা না থাকলেও, প্লাসিবো ইফেক্টের কারনে কেউ কেউ এর ফলে নিজেকে অধিকতর সুস্থ বা সক্ষম ভাবতে পারেন।
বাংলাদেশে যেহেতু সান্ডা বেশ দুর্লভ, তাহলে ‘সান্ডার তেল’ এর নামে কী বিক্রি হচ্ছে?
‘নিউজবাংলাটুয়েন্টিফোর ডট কম’ কয়েক বছর আগে সান্ডার তেল নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিল। প্রতিবেদক এখানে ক্রেতা সেজে ঢাকার কাওরান বাজারের একটি ‘হারবাল দাওয়াখানা’ নামক দোকানে গমন করেন। দোকানের বিক্রেতা প্রথমে দাবি করেছিলেন, তিনি সান্ডার তেল বিক্রি করেন। সৌদি আরব থেকে কিছু ব্যবসায়ীর মাধ্যমে তিনি এই সান্ডার তেল আমদানি করেন।
তবে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে দোকানী স্বীকার করেন, এগুলো সান্ডার তেল নয়। নারিকেল তেল আর পাম অয়েল একসঙ্গে করে দুই-একটা গাছের শেকড় দিয়ে আগুনে জ্বালিয়ে সেটাকে ছোট ছোট বোতলে ভর্তি করে ‘সান্ডার তেল’ দাবীতে বিক্রি করছেন তিনি।
এই প্রাণীটি নিয়ে আপনাদের আর কোনো প্রশ্ন আছে কি ? তাহলে আমাদের জানাতে পারেন আমাদের ফেসবুক পেজ বা ইমেইল (contact@fact-watch.org) এর মাধ্যমে।