বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কুমিল্লায় নিহতদের ‘ফেরত আসা’র দাবিগুলো ভুয়া 

351
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কুমিল্লায় নিহতদের ‘ফেরত আসা’র দাবিগুলো ভুয়া 
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কুমিল্লায় নিহতদের ‘ফেরত আসা’র দাবিগুলো ভুয়া 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিব ফিরে এসেছেন -- এই দাবিতে প্রায় সাড়ে ৩ মিনিটের একটি ভিডিও সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকিব নামে কেউ মারা যাননি। ভাইরাল ভিডিওটিতে বক্তব্য দেওয়া তরুণের নাম রাশেদ। তিনি আন্দোলনের সময় সক্রিয় থাকলেও মারা যাননি। অন্যদিকে, কুমিল্লায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আবদুল্লাহ মাহাবুব নামে আরও এক নিহত ব্যক্তি ফিরে এসেছেন এমন একটি দাবিও ফেসবুকে ছড়িয়েছে। দুটি দাবিকেই মিথ্যা সাব্যস্ত করছে ফ্যাক্টওয়াচ।

 

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে ফ্যাক্টওয়াচ। ভিডিওটির ৩১ সেকেন্ডে এক তরুণকে বলতে শোনা যায়, “১১ জুলাই যখন আন্দোলন হয়, তখন সর্বপ্রথম আমিই পুলিশের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলাম গুলি করার জন্য। এটা আপনারা ভিডিওতে দেখেছেন। আমি যদি শহীদ হইতাম, তাহলে সমন্বয়করা আমার রক্তের ওপর দিয়ে এমন আয়োজন করতো।“ 

ভিডিওটির ১ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের মাথায় ওই তরুণ আরও বলেন, “অনেক নিউজ চ্যানেল দেখিয়েছে আমি মারা গেছি। কেন্দ্র থেকে শুরু করে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়করা কেউ কি আমার খবর নিয়েছে।“ 

তাঁর এই বক্তব্যের সূত্রে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের সংগঠন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ইমতিয়াজ হাসান রিফাতের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্যাক্টওয়াচ।

ভিডিওটি দেখে রিফাত জানান, ভাইরাল ভিডিওটিতে থাকা তরুণের নাম রাশেদ। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২তম ব্যাচের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। তাকে ঘিরে ফেসবুকে ছড়ানো দাবিটি গুজব। রাকিব নামের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ মারা যাননি। 

তিনি আরও জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে  কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবল একজন শিক্ষার্থীই মারা যান। আবদুল কাইয়ুম নামের ওই শিক্ষার্থী কুবির অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ফ্যাক্টওয়াচ রাশেদ নামের এই তরুণের সঙ্গেও কথা বলেছে। রাশেদ জানান, “জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আমি আহত হয়েছিলাম। ৪ আগস্ট রাবার বুলেটেও লেগেছিল আমার গায়ে। ওই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। আমি বক্তব্যে সেটাই বলছিলাম।”

অর্থাৎ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ রাকিব ফিরে এসেছেন দাবিতে ফেসবুকে ছড়ানো দাবিটি মিথ্যা। তাঁর দেওয়া বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে কুবি শিক্ষার্থী শহীদ রাকিব ফিরে এসেছেন দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে। 

এই দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে। 

এসব তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ফ্যাক্টওয়াচ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ রাকিব ফিরে আসার দাবিটিকে মিথ্যা হিসেবে সাব্যস্ত করছে। 

কুমিল্লায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আবদুল্লাহ মাহাবুব নামে আরও এক নিহত ফিরে এসেছেন এমন একটি দাবিও ফেসবুকে ছড়িয়েছে। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে এ দাবিরও সত্যতা পাওয়া যায়নি। 

এ দাবির সত্যতা যাচাইয়ে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া পোস্টগুলো যাচাই করে দেখা যায়, পোস্টগুলোতে এই আব্দুল্লাহ মাহাবুব কে, কখন শহীদ হয়েছেন বা তাঁর ফিরে আসার দাবির পক্ষে কোনো সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ আবদুল্লাহ মাহাবুবের ফেরত আসার দাবিটি কোনো সূত্র ছাড়াই ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে। 

পরে অধিকতর যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে এই নামে কুমিল্লায় কেউ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মারা গেছেন এবং পরে ফিরে এসেছেন এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। 

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তিবর্গের তালিকা থেকে আবদুল্লাহ মাহবুব নামের কেউ নিহতের হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরে আরও খুঁজে এই কুমিল্লার স্থানীয় দৈনিক কুমিল্লার কাগজে কুমিল্লা জেলায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কুমিল্লার মোট ৩৫ জন প্রাণ হারিয়েছে। জেলার ১১টি উপজেলা ঘুরে এসব শহীদের তালিকা করা হয়েছে। এই ৩৫ জন নিহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্বিক) পঙ্কজ বড়ুয়া। 

 

এই ৩৫ জনের নামের তালিকাতেও আবদুল্লাহ মাহাবুব নামে কোনো নিহতের নাম পাওয়া যায়নি। 

কুমিল্লায় কর্মরত স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকার একাধিক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেও দাবিকৃত ঘটনাটির সত্যতা পাওয়া যায়নি।  

ফলে এটি প্রতীয়মান হয়, কুমিল্লা জুলাই আন্দোলনে নিহত শহীদ আবদুল্লাহ মাহাবুব ফিরে আসার দাবিটিও মিথ্যা। 

এই দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে। 

প্রসঙ্গত, ইতিপূর্বে  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ভোলার বোরহান উদ্দিনের তরুণ নয়নের ফেরত আসার দাবি ফেসবুকে প্রচার করা হয়। তবে ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দাবিটি মিথ্যা বলে প্রতীয়মান হয়। এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত মুগ্ধকে নিয়েও ছড়ানো গুজব শনাক্ত করেছে ফ্যাক্টওয়াচ। 

No Factcheck schema data available.

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh