২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদ কর্মসূচির এক পর্যায়ে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে। উচ্ছৃঙ্খল জনতা ইসরায়েলি মালিকানাধীন দাবিতে কিছু দোকানপাট ভাঙচুর করে এবং লুটপাট চালায়। এরই অংশ হিসেবে জুতার ব্র্যান্ড ‘বাটা’র কয়েকটি শোরুমে লুটপাট চালায়। লুটপাটের ছবি ও ভিডিও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। আসল ছবির সঙ্গে দুটি ভিন্ন ধরনের ছবিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ছবি দুটির একটিতে দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন ব্যক্তি এলোমেলো জুতার দোকানে জুতার বাক্স হাতে বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছে। পোস্টগুলোর কমেন্টবক্সে লোকজন ছবি দেখে তাদের গ্রেফতারের দাবি জানান। আরেকটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে শীতের কাপড় পরা কয়েকজন ব্যক্তি জুতা হাতে 'বাটা'র সাইনবোর্ডের নীচ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভাইরাল ছবি দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো এবং ছবির ব্যক্তিরা বাস্তবের কেউ নয়।
ছবিটিতে ভালো করে লক্ষ্য করলে অসংগতিগুলো চোখে পড়ে। সামনের দিকের চার ব্যক্তির মুখ স্পষ্ট দেখা যায়। বাম থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তির হাতে সাদা, কালো ও লাল রঙের তিনটি বক্স দেখা যায়, বক্সগুলোতে কোন লোগো বা নাম দেখা যায় না। মেঝেতে এক ব্যক্তির হাত ও পায়ের নিচে তিনটি কমলা রঙের বক্স, এগুলোতেও কোন লোগো বা নাম নেই। ৭ এপ্রিলে জুতার ব্র্যান্ড ‘বাটা’র দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়। ‘বাটা’র জুতার বক্সে লোগোসহ নাম লেখা থাকে। সামনের বাম থেকে তৃতীয় ব্যক্তির হাত ও পায়ে অসংগতি দেখা যায়। তার দুটি হাত ছাড়া পেটের দিকে আরও একটি হাত দেখা যায় যা পাশের ব্যক্তির নয়। মনে হয় যেন এক ব্যক্তির তিনটি হাত। তার হাত ও পায়ের নিচের বক্সগুলো চাপ লাগার কারণে বেঁকে যায়নি। ছবির মাঝামাঝি এক ব্যক্তির হাতে কয়েকটি ফাইল দেখা যাচ্ছে, জুতার দোকান থেকে এ ধরনের ফাইল নিয়ে ছবি, কিছুটা অবাস্তব মনে হয়েছে। এছাড়া ছবির অবয়বগুলোর হাত খেয়াল করলে দেখা যায়, কনুই থেকে নিচের অংশ অস্বাভাবিক লম্বা। ছবিটি অনেক বেশি স্পষ্ট, সাধারণত এ ধরনের বিশৃঙ্খলার এত স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায় না। ছবিটির উৎস জানা যায় না, ফটোগ্রাফারের নামও নেই। এ ধরনের কয়েকটি অসংগতি চোখে পড়ার পর নিশ্চিত হওয়ার জন্য এআই শনাক্তকারী দুটি পৃথক টুল ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি।
কৃত্রিম ছবি শনাক্ত করার একাধিক টুল (sight engine, is it AI?) ব্যবহার করে ছবিটিকে ৯৯% এআই জেনারেটেড হিসেবে পাওয়া যায়।
ছবি-২
পেছনে দোকান রেখে ‘বাটা’র সাইনবোর্ডের পেরিয়ে ছুটে বেরিয়ে আসছে সাতটি অবয়ব। এদের প্রত্যেকের হাতেই জুতা এবং মুখে মাস্ক। ভাইরাল এই ছবিটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের পরনের কাপড় বাংলাদেশের গরমকালের উপযুক্ত নয়। প্রথম সারির একেবারের ডানের ব্যক্তির মুখ খানিকটা বিকৃত। এই ছবিটিরও উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না, ফটোগ্রাফারের নাম জানা যায় না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য একাধিক এআই শনাক্তকারী টুল (sight engine, is it AI?) ব্যবহার করে ৯৯% এআই জেনারেটেড হওয়ার সম্ভাব্যতা পাওয়া যায়।
৭ এপ্রিলের অরাজকতা নিয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে সিলেটের বিশৃঙ্খলার বিবরণের সঙ্গে ছবিও রয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ‘বাটা’র দোকানের শাটার নামানো এবং দোকানের সামনে অন্যান্য লোকজনের সঙ্গে পুলিশও রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে সিলেটে তৌহিদী জনতার মিছিল থেকে কেএফসি, ইউনিমার্ট, বাটা, ডমিনোজ পিজ্জাসহ বিভিন্ন শোরুমে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। ইসরায়েলি পণ্য রাখা ও বিক্রির অভিযোগ তুলে এসব প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়।
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে সোমবার (৭ এপ্রিল) সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের নাম সিয়াম খান (অনিক), শিমুল আহাম্মেদ শাওন, শাহীন ও জয়নাল আবেদীন উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনের সঙ্গে গ্রেফতারকৃতদের ছবিও প্রকাশিত হয়েছে।
৮ এপ্রিল প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গতকাল ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় মিছিল ও সমাবেশ হয়। এসব কর্মসূচি থেকে কয়েকটি জেলায় কেএফসি, পিৎজা হাট, বাটাসহ এক ডজনের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় দেশজুড়ে গ্রেফতারকৃতদের মোট সংখ্যা ৪৯ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গে যে-সব ছবি ব্যবহৃত হয়েছে, তার কোনটির সঙ্গে আলোচ্য ছবি দুটির মিল নেই।
মাছরাঙা টেলিভিশনের একটি ভিডিও প্রতিবেদনে ‘বাটা’র শোরুমের ভেতরের লুটপাটের একটি ভিডিও দেখা যায়, সেখানকার লোকজনের সঙ্গে আলোচ্য ছবি দুটির পরিবেশের কোনো মিল নেই।
ফলে ফ্যাক্টওয়াচের নিজস্ব পর্যালোচনা, এআই শনাক্তকরণ টুল ব্যবহার করে প্রাপ্ত ফলাফল এবং দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসন্ধান করে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, আলোচ্য ছবি দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য তৈরি করা হয়েছে। সঙ্গত কারণে, এই দুটি ছবিযুক্ত পোস্টগুলোকে বিকৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হলো।
Claim: ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে জুতার ব্র্যান্ড ‘বাটা’র কয়েকটি শোরুমে লুটপাট চালানো হয়। লুটপাটের আসল ছবির সঙ্গে দুটি কৃত্রিম ছবিকে আসল ছবি দাবি করে ছড়ানো হচ্ছে।
Claimed By: Facebook Users
Rating: False
এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের
নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে।
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।
কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh