মুখে মাস্ক পরা কি করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে সাহায্য করে?

সময়ের সাথে মাস্কের সার্বজনীন ব্যবহারের দিকেই বিশেষজ্ঞদের মতৈক্য। অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে যেকোন ধরনের মাস্কের ব্যবহার সংক্রমণ কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর। সুতি কাপড়ের ঘরে তৈরী মাস্কেরও সীমিত হলেও কার্যকারিতা রয়েছে। পেশাদার মানের মাস্ক যেহেতু যারা সরাসরি রোগীদের সংস্পর্শে আসে তাদের জন্যই সবচেয়ে প্রয়োজন, কৃত্রিম সংকট এড়াতে অন্যান্য সবার ক্ষেত্রে কাপড়ের মাস্ক ব্যবহারই শ্রেয়।

Image credit: Indrajit Kumer Ghosh /New Age BD

ঢাকার রাজপথে করোনাভাইরাস মহামারীর যে প্রভাব সবচেয়ে আগে চোখে পড়েছে তা ছিল মানুষের মুখে মুখে নানা রং এর মাস্কের ব্যবহার। তখন থেকেই মাস্ক পরার কার্যকারিতা এবং ঠিক কোন ধরনের মাস্ক এ ক্ষেত্রে সুরক্ষা দিতে সক্ষম তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-র নির্দেশনায় শুধুমাত্র যাদের মধ্যে কভিড-১৯ এর উপসর্গ দেখা গেছে এবং তাদেরকে যারা সেবা দিচ্ছেন, তাদেরকে মাস্ক ব্যবহার করতে বলা হয়েছিল। অন্যদিকে, চীনের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন-এর প্রধান নির্বাহী জর্জ গাও বলেছেন এই পরামর্শ ভুল। এশিয়ার বিভিন্ন দেশেই নাগরিকদের মাস্ক সরকারিভাবে মাস্ক পরতে উত্সাহিত করা হয়েছে। চেক রিপাবলিক প্রথম তাদের জনগনের জন্য বাইরে নাক ও মুখ ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক করে। এতে সেখানে দেশব্যাপী ঘরে মাস্ক তৈরির হিড়িক পড়ে যায়।

শীর্ষস্থানীয় জার্নাল ‘সায়েন্স’ কে ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম-এর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কে কে চেং-বলেন যে আমাদের মুখের নিঃসরণ থেকে অন্যদের রক্ষা করাই মাস্কের মূল কাজ। সার্জিকাল মাস্ক এবং N95 মাস্ক হাসপাতালে যেহেতু কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, সাধারণ মানুষ তা ব্যবহার করলে কিছুটা হলেও উপকার হবে সেটা ভাবাটাই যৌক্তিক। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের মহামারিবিদ আর্নল্ড মনটোও বলেন যে অন্যান্য বিধিসমূহ মেনে চললে সেই সাথে যে কোন মাস্কের ব্যবহার করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর।

মাস্কের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল যাদের মধ্যে দৃশ্যত কোন উপসর্গ নেই, তাদের কাছ থেকে অন্যদেরকে রক্ষা করা। যাদেরকে চিন্হিত করা প্রায় অসম্ভব। কেননা অর্ধেকের বেশি সংক্রমণ ঘটে থাকে কোনো রকম উপসর্গ প্রকাশ পাবার আগেই। সাধারন মানুষের জন্য মাস্ক ব্যবহারের পক্ষে কোন র‌্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল ভিত্তিক প্রমাণ নেই, কিন্তু হাত ধোয়ার ক্ষেত্রেও তা নেই। তবে ২০০৩ সালের SARS মহামারীর সময়কার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে দিনে ১০ বারের বেশি হাত ধোয়া ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে ৫৫% এবং মাস্কের ব্যবহার তার চাইতেও বেশি, ৬৮% কার্যকর।

ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের পরিসংখ্যান ও রোগতত্ত্ববিদ ইলেইন শুও ফেং ল্যানসেট জার্নালে বিভিন্ন দেশের মাস্ক ব্যবহার নীতির একটি তুলনামূলক গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা যায় যে সীমিত সরবরাহ থাকার কারণেই কর্তৃপক্ষ মাস্কের ঢালাও ব্যবহারে উত্সাহ দিতে পারছে না। অতএব, মাস্ক পরতে জনগনকে সরাসরি উত্সাহিত না করার একটি বড় কারণ হল এতে চিকিত্সাকর্মীদের জন্য মাস্কের সংকট তৈরী এড়ানো। তাছাড়া মাস্কের সঠিক ব্যবহার না জানা থাকলে সাধারন মানুষ তার সুরক্ষা ঠিকমত পাবে না। আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি মাস্ক কিনবার সময় ঢাকার রাস্তায় ক্রেতাদের তা পরখ করে দেখার আত্মঘাতী প্রবনতার মধ্যে।

মোটের ওপর দেখা যাচ্ছে, সময়ের সাথে মাস্কের সার্বজনীন ব্যবহারের দিকেই বিশেষজ্ঞদের মতৈক্য। অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে যেকোন ধরনের মাস্কের ব্যবহার সংক্রমণ কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর। সুতি কাপড়ের ঘরে তৈরী মাস্কেরও সীমিত হলেও কার্যকারিতা রয়েছে। যেহেতু সার্জিকাল বা N95 মাস্ক যারা সরাসরি রোগীদের সংস্পর্শে আসে তাদের জন্যই সবচেয়ে প্রয়োজন, অন্যান্য সবার ক্ষেত্রে কাপড়ের মাস্ক ব্যবহারই শ্রেয়।

বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই ফার্মেসিগুলিতে সার্জিকাল মাস্ক কিনতে পাওয়া যাচ্ছে না বা গেলেও তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। রাস্তায় যে মাস্ক বিক্রি হচ্ছে তার পরিচ্ছন্নতা এবং কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমরাও কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করে দেখতে পারি। তবে কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করলেও তা পরিস্কার রাখতে হবে। হাত দিয়ে সেটা স্পর্শ করা যাবে না বা সেটার নিচে হাত ঢুকিয়ে নাকে মুখে আঙ্গুল দেয়া যাবে না। মাস্ক তৈরিতে কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করবেন এবং তা কীভাবে বানাবেন সেই বিষয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস এর নির্দেশাবলী দেখতে পারেন।

 

তথ্যসূত্র

ফেস মাস্ক ব্যবহারে মহামারি ধীর করতে কতটুকু সহায়তা করবে জানতে পড়ুন এখানে

জনসমক্ষে মাস্ক পরার বিষয়ে আরও জানুন এখানে

“কীভাবে একটি ফ্যাব্রিক ফেস মাস্ক সেলাই করবেন”

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন 

আপনি কি এমন কোন খবর দেখেছেন যার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন?
কোন বিভ্রান্তিকর ছবি/ভিডিও পেয়েছেন?
নেটে ছড়িয়ে পড়া কোন গুজব কি চোখে পড়েছে?

এসবের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে জানান।
আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ fb.com/search.ulab

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *